বিশেষ প্রতিবেদন। কলকাতা: তৃণমূল বিধায়কদের সই জালিয়াতির অভিযোগের তদন্ত এবার পৌঁছল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসভবনের চৌকাঠে। মে মাসের শেষে রাজ্য গোয়েন্দা শাখা যে মামলা শুরু করে, তার সূত্র ধরেই মঙ্গলবার ৩০-বি হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের দলীয় কার্যালয়ে হানা দিল গোয়েন্দা পুলিশের দল। ঠিকানাটি একই সঙ্গে মমতার বাসভবন এবং তৃণমূলের মূল কার্যালয় হিসেবে নথিভুক্ত। মমতার ঘরে নয়, তল্লাশি চলে লাগোয়া দলীয় দফতরে। প্রায় জনা দশেক আধিকারিকের দল নিয়ে বিকেল সওয়া তিনটে নাগাদ সেখানে পৌঁছন গোয়েন্দারা। দলে ছিলেন মহিলা পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী। কিন্তু শুরুতেই বাধা। নিরাপত্তারক্ষীদের বক্তব্য, মমতা ও অভিষেক দুজনেই দিল্লিতে। তাঁদের অনুপস্থিতিতে দলীয় কোষাধ্যক্ষ শুভাশিস চক্রবর্তী কার্যালয় দেখছেন। তাঁর সাফ কথা, মালিকরা বাইরে থাকতে তিনি গোয়েন্দা পুলিশকে ঢুকতে দিতে পারবেন না। গোয়েন্দা পুলিশের যুক্তি ছিল উল্টো তদন্তের কাজে কারও উপস্থিতি জরুরি নয়, কারও অনুমতিও লাগবে না। সঙ্গে ছিল অভিষেককে পাঠানো নতুন সমন ও নোটিস। গোয়েন্দাদের দাবি, তাঁরা খুঁজছেন ৬ও ১৯ মে-র বিধায়ক বৈঠকের ‘সিদ্ধান্ত বই’। অভিষেককে আগেই ওই বই নিয়ে আসতে বলা হয়েছিল। শুভাশিসের নাছোড় মনোভাবের জেরে এলাকায় কিছুক্ষণ উত্তেজনা তৈরি হয়। খবর পৌঁছয় দিল্লিতে মমতার কাছে। তখন তিনি সোনিয়া গান্ধীর ১০ জনপথের বাড়িতে ‘ইন্ডিয়া’ মঞ্চের বৈঠকে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন। সোনিয়ার কাছেই অভিযোগ জানান তিনি। এদিকে কলকাতায় নেমেই মমতার নির্দেশে কালীঘাটে ছোটেন দলের আইনজীবী সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। গোয়েন্দা পুলিশের জবাব ছিল, সই জালিয়াতির ঘটনাটি এই দফতরেই ঘটেছে বলে তাঁদের কাছে তথ্য আছে। ঘটনাস্থল পরীক্ষা করতেই এই অভিযান। প্রায় ঘণ্টাখানেক টানাপোড়েনের পর বাধা টপকে মমতার বাড়ির উঠোনে ঢোকেন গোয়েন্দারা। কেন্দ্রীয় বাহিনী তখন গোটা বাড়ি ঘিরে রেখেছে। কল্যাণও জোর করে ভিতরে ঢোকেন। তল্লাশি চলে প্রথমে মমতার ঘরের পাশের ঘরে, পরে যে ঘরে বিধায়কদের নিয়ে মমতা বৈঠক করেছিলেন সেখানেই। পুরো সময়টা ভিডিয়োয় ধরে রাখে গোয়েন্দা পুলিশ। অভিযান চলে প্রায় দু’ঘণ্টা। কিন্তু শেষে দলীয় কোষাধ্যক্ষ শুভাশিস জানান, কার্যালয় থেকে কোনও কাগজ বা সামগ্রী ‘বাজেয়াপ্ত’ করা হয়নি। অভিষেকের চিঠিতে ক্যামাক স্ট্রিটের ঠিকানাও থাকায় সেখানেও যায় গোয়েন্দা দল। প্রথমে বাধা পেলেও পরে তাঁরা ভিতরে ঢোকেন। কালীঘাটে পরে আসেন মদন মিত্র ও কুণাল ঘোষ, কিন্তু বাহিনীর বাধায় তাঁরা কার্যালয়ে ঢুকতে পারেননি। কল্যাণের পাল্টা অভিযোগ, গোয়েন্দা পুলিশের দলে ভারতীয় জনতা পার্টির দুই কর্মী ছিলেন, যাঁদের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে দেখা যায়। তাঁর কথায়, ‘মুখ্যমন্ত্রীকে খুশি করতেই এই নাটক’। তৃণমূলের তরফে গোটা অভিযানকে ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ বলা হয়েছে। মমতার অনুপস্থিতিতে তিনবারের মুখ্যমন্ত্রীর বাড়িতে তল্লাশি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন মদন মিত্র ও কুণাল ঘোষ। পাল্টা রাজ্যের মন্ত্রী তাপস রায় বলেন, ‘প্রতিহিংসার রাজনীতির জনক মমতা নিজেই। টুম্পা-মৌসুমী, বিচারপতি অশোক গঙ্গোপাধ্যায়, রাজ্যপাল কেউ ছাড় পাননি।’ ঘটনার সূত্রপাত ভোটের পরে পরিষদীয় দলের বৈঠক থেকে। কালীঘাটের দফতরে মমতার উপস্থিতিতে বৈঠক হলেও বিরোধী দলনেতার নাম চূড়ান্ত হয়নি। পরে বিধানসভার সচিবকে চিঠি দিয়ে অভিষেক জানান, শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় বিরোধী দলনেতা, অসীমা পাত্র ও নয়না বন্দ্যোপাধ্যায় উপনেতা, ফিরহাদ হাকিম সচেতক। ওই প্রস্তাবের সঙ্গেই বিধায়কদের সই জাল হয়েছে বলে অভিযোগ করেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহা। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই তদন্তের ভার যায় গোয়েন্দা পুলিশের হাতে। মঙ্গলবার দুই উপ-পুলিশ সুপার-সহ ৪০ জন গোয়েন্দা ও বহু মহিলা পুলিশ নিয়ে অভিযান চলে। এদিন তৃতীয়বারের মতো অভিষেককে সমন করে গোয়েন্দা পুলিশ। ক্যামাক স্ট্রিটের কার্যালয়েও হানা দেয় তারা। কিন্তু আগের দু’বারের মতো এবারও অভিষেক হাজিরা এড়ান। সূত্রের খবর, বুধবার আদালতে মামলার শুনানি থাকায় তিনি সময় চেয়েছেন। গোয়েন্দা পুলিশের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে আধিকারিকরা মুখ খোলেননি।













