,

সংস্কৃতির নামে ব্যবসা: ছাত্র ঠকিয়ে গুরু বানাচ্ছেন অট্টালিকা

নিজস্ব প্রতিবেদক, কলকাতা : নৃত্য-সঙ্গীত-যন্ত্রশিল্প এখন আর সাধনার নাম নয়, পুরোদস্তুর ব্যবসা। সংস্কৃতির নামে চলছে রমরমা কারবার। কয়েকটা ছাত্রছাত্রী জুটিয়ে ব্যাঙের ছাতার মতো স্কুল খুলে নিজের নামের আগে ‘নৃত্যগুরু’, ‘সঙ্গীতগুরু’, ‘যন্ত্রগুরু’ জুড়ে দিচ্ছে। অথচ গুরু হতে গেলে যে একটা বয়স পেরোতে হয়, ৩০-৪০ বছরের সাধনা লাগে, ঘরানার দীক্ষা লাগে— সেই জ্ঞানটুকুও নেই। ছাত্রছাত্রীদের ঠকিয়ে গুরু…

নিজস্ব প্রতিবেদক, কলকাতা : নৃত্য-সঙ্গীত-যন্ত্রশিল্প এখন আর সাধনার নাম নয়, পুরোদস্তুর ব্যবসা। সংস্কৃতির নামে চলছে রমরমা কারবার। কয়েকটা ছাত্রছাত্রী জুটিয়ে ব্যাঙের ছাতার মতো স্কুল খুলে নিজের নামের আগে ‘নৃত্যগুরু’, ‘সঙ্গীতগুরু’, ‘যন্ত্রগুরু’ জুড়ে দিচ্ছে। অথচ গুরু হতে গেলে যে একটা বয়স পেরোতে হয়, ৩০-৪০ বছরের সাধনা লাগে, ঘরানার দীক্ষা লাগে— সেই জ্ঞানটুকুও নেই। ছাত্রছাত্রীদের ঠকিয়ে গুরু অট্টালিকা বাড়ি বানাচ্ছেন, রাজার মতো জীবনযাপন করছেন। কর্পোরেট শো, পুজোর অনুদান, সরকারি প্রোগ্রাম— সব জায়গায় ছাত্রদের দিয়ে দল বেঁধে পারফর্ম করিয়ে আয়োজকের কাছ থেকে টাকা নিচ্ছেন গুরু। ছাত্রদের দেওয়া হয় শুধু ‘এক্সপোজার’ আর ‘সার্টিফিকেট’। বাকি সব নিজের খরচে। টাকা চাইতে গেলে শুনতে হয়, “গুরুদক্ষিণা দিচ্ছিস।” এই টাকাতেই অনেকে অট্টালিকা বাড়ি বানাচ্ছেন, দামি গাড়ি চড়ছেন, রাজার হালে থাকছেন। অথচ গুরুর কাছে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা খরচ করে তালিম নিয়ে ছাত্রছাত্রীরা শূন্য হাতে ফিরছে।

গুরু না ব্যবসায়ী?
প্রকৃত গুরুর পাঁচটি গুণ থাকা চাই: শিল্পে দক্ষতা, শাস্ত্রজ্ঞান, ধৈর্য, বিনয় ও সাধনা। বিরজু মহারাজ, রবিশঙ্কর, আলী আকবর খাঁ, কেলুচরণ মহাপাত্ররা আজীবন নিজেকে ছাত্র ভেবেছেন। গুরু নাম জুড়তে একটা বয়স পেরোতে হয়, চুলে পাক ধরতে হয়, সাধনায় হাত পাকতে হয়। কারণ গুরুর কাজ শুধু শেখানো নয়, মানুষ গড়া। কিন্তু এখন ২৫ বছর বয়সে ৫টা ছাত্র জুটিয়ে নামের আগে ‘গুরু’ বসিয়ে দিচ্ছে। ঘরানার দীক্ষা নেই, তালিম নেই, তবু ‘গুরুজি’। এরা শিল্প শেখায় না, সংস্কৃতির নামে ব্যবসা করছে।

কীভাবে ঠকাচ্ছে ছাত্রছাত্রীদের? ৭টি ফাঁদ

১) ব্যাঙের ছাতার মতো স্কুল: পাড়ায় পাড়ায় ঘর ভাড়া নিয়ে ‘ মিউজিক একাডেমি’। বোর্ড আছে, ঘুঙুর নেই। গুরুর নিজেরই তালিম নেই। ১০টা ছাত্র জোগাড় করেই ‘গুরুজি’।
২) বিজ্ঞাপনের ফাঁদ: ‘১০০% স্টেজ গ্যারান্টি’, ‘টিভি রিয়েলিটিতে চান্স’, ‘দুবাই শো’— ফেসবুক আর পত্রিকায় চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে ভর্তি। ভর্তির পর বোঝা যায়, সবটাই ভাঁওতা।
৩) ক্র্যাশ কোর্সে ক্লাসিক্যাল: ভরতনাট্যম, রাগসঙ্গীত, সেতার, লোকনৃত্য, রবীন্দ্রনৃত্য, গৌড়ীয়নৃত্য সহ সব বিভাগের কোর্স শিখতে ১০-১২ বছর লাগে। অথচ প্রতিশ্রুতি ‘৬ মাসে মঞ্চে তুলব, ১ বছরে অরঙ্গেত্রম’। ভুল বেস নিয়ে আজীবন বেসুরো গাইছে, বেতালা নাচছে ছাত্র।
৪) অ্যাওয়ার্ড কেনা: ‘ইন্টারন্যাশনাল নৃত্য-সঙ্গীত সম্মান ২০২৬’ নামে টাকা দিয়ে অ্যাওয়ার্ড কেনা হয়। সেই ট্রফি হাতে ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট।
৫) শো করিয়ে টাকা কামানো: এটাই সবচেয়ে বড় লুট। ছাত্রদের দিয়ে শো করিয়ে সব টাকা পকেটে পুরছেন গুরু। ছাত্র পাচ্ছে শুধু সেলফি।
৬) ইউটিউব গুরু: নিজে কোনো গুরুর কাছে তালিম নেননি। রিয়েলিটি শো আর ইউটিউব দেখে শেখান। ফলে গানের স্কেল ধরতে পারে না, তবলার বোল ভুল।
৭) লজ্জার সুযোগ নেওয়া: গুরু-শিষ্য সম্পর্ককে ভয় আর ভক্তির জালে আটকে রাখা হয়। ছাত্র জানে সে ঠকছে, তবু মুখ খোলে না। পাছে গুরু অভিশাপ দেন। এই লজ্জা আর ভয়কে পুঁজি করেই চলছে শোষণ।

আসল গুরু ব্রাত্য
কিছু কিছু শিক্ষক-শিক্ষিকা আছেন যাঁরা সঠিক তালিম দিচ্ছেন। তাঁরা ছাত্রছাত্রীদের ঠকিয়ে সংস্কৃতি করছেন না। তবে তাঁদের সংখ্যা খুব কম। বর্তমান বাজারে তাঁরা নিজেকে প্রচারের আলোয় আনতে চান না। বিজ্ঞাপন দেন না, ‘৬ মাসে স্টার’ বানানোর গ্যারান্টি দেন না, শো বাবদ ছাত্রের টাকা মারেন না। তাঁরা বলেন, “আগে ৫ বছর সা-রে-গা-মা করো, আদাভু করো, তারপর মঞ্চ ভাবব।” এই কথা শুনে অভিভাবক অন্য ‘ফাস্ট-ট্র্যাক’ গুরুর কাছে চলে যান। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ধ্রুপদী সঙ্গীতগুরু বললেন, “আমার কাছে ৬ জন ছাত্র। পাশের ‘গ্ল্যামার সুর-তাল একাডেমি’তে ২০০ জন। আমি স্টেজে তুলতে চাই না বলে আমায় বলে ‘ব্যাকডেটেড’। ওরা ছাত্র দিয়ে শো করিয়ে অট্টালিকা বানাচ্ছে।”

ফল কী হচ্ছে?
তৈরি হচ্ছে ‘আধা শিল্পী’র জেনারেশন। যারা না শাস্ত্র জানে, না তাল বোঝে। দু’টো রিল বানিয়ে নিজেই স্কুল খুলছে। নৃত্য, সঙ্গীত, যন্ত্র— সব শিল্পেরই মৃত্যু হচ্ছে। সংস্কৃতির নামে টিকে থাকছে শুধু ব্যবসা। কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা খরচ করে ছাত্রছাত্রীরা শূন্য, আর ভণ্ড গুরুরা রাজার হালে।

বাঁচার পথ: ভর্তির আগে গুরুর পারফরম্যান্স দেখুন, তাঁর গুরুর নাম জানুন, কত বছর সাধনা করেছেন খোঁজ নিন। ফেসবুকের লাইক নয়, মঞ্চের প্রেজেন্টেশন দেখুন। আর সরকারের উচিত নৃত্য-সঙ্গীত-যন্ত্রের স্কুলের জন্য ন্যূনতম যোগ্যতা বেঁধে দেওয়া। না হলে ‘গুরু’ শব্দটাই একদিন প্রতারণার সমার্থক হয়ে যাবে। মনে রাখবেন, ঘুঙুরের, তানপুরার, তবলার দাম টাকায় হয় না, তপস্যায় হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *