,

উন্নয়ন প্রকল্প সময়ে শেষ করার নির্দেশ: কাছাড়ে প্রশাসনকে কড়া বার্তা দুই মন্ত্রীর

ওভারলোড বন্ধে টাস্ক ফোর্স, বন্যা মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি, শুক্রবার থেকেই রাঙ্গিরখাড়ি সড়ক মেরামতি বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন: সরকারি উন্নয়নমূলক প্রকল্পের সাফল্য কেবল পরিকল্পনা গ্রহণে নয়, তার কার্যকর ও সময়মতো বাস্তবায়নের মধ্যেই নিহিত। সরকারি পরিষেবার সুফল প্রতিটি মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে সমন্বয়, স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করার উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ…

ওভারলোড বন্ধে টাস্ক ফোর্স, বন্যা মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি, শুক্রবার থেকেই রাঙ্গিরখাড়ি সড়ক মেরামতি

বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন: সরকারি উন্নয়নমূলক প্রকল্পের সাফল্য কেবল পরিকল্পনা গ্রহণে নয়, তার কার্যকর ও সময়মতো বাস্তবায়নের মধ্যেই নিহিত। সরকারি পরিষেবার সুফল প্রতিটি মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে সমন্বয়, স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করার উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করলেন রাজ্যের জনস্বাস্থ্য কারিগরি, বরাক উপত্যকা উন্নয়ন ও পার্বত্য এলাকা উন্নয়ন বিভাগের মন্ত্রী তথা কাছাড় জেলার অভিভাবক মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু পাল এবং খাদ্য, গণবণ্টন ও ভোক্তা বিষয়ক, গৃহ ও নগর উন্নয়ন এবং সমবায় বিভাগের মন্ত্রী কৌশিক রায়।

বৃহস্পতিবার শিলচরের জেলা আয়ুক্তের নবনির্মিত সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত কাছাড় জেলা প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের দীর্ঘ উন্নয়ন পর্যালোচনা বৈঠকে জেলার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প, পরিকাঠামো নির্মাণ, পানীয় জল, স্যানিটেশন, বন্যা প্রতিরোধ, সড়ক যোগাযোগ, পরিবহণ ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। জেলার বিভিন্ন দফতরের ঊর্ধ্বতন আধিকারিকরা চলতি প্রকল্পগুলির অগ্রগতি, বিভিন্ন সমস্যার দিক এবং দ্রুত বাস্তবায়নের সম্ভাব্য কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপন করেন।

বৈঠকে বক্তব্য রাখতে গিয়ে অভিভাবক মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু পাল বলেন, “সরকারের একমাত্র লক্ষ্য হল উন্নয়নের সুফল যেন সমাজের প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। শুধুমাত্র পরিকল্পনা গ্রহণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। প্রকল্পগুলির বাস্তবায়নের মাধ্যমে মানুষের জীবনযাত্রার বাস্তব পরিবর্তন ঘটাতে হবে। প্রতিটি দফতরকে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে কাজ সম্পন্ন করতে হবে এবং প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।”

তিনি আরও বলেন, উন্নয়নের ক্ষেত্রে কোনও বিভাগ আলাদা হয়ে কাজ করলে চলবে না। বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে নিয়মিত সমন্বয়, তথ্য আদান-প্রদান এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে প্রকল্পগুলির বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করতে হবে। প্রশাসনিক জটিলতার কারণে কোনও উন্নয়নমূলক প্রকল্প যাতে বিলম্বিত না হয়, সে বিষয়েও সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের বিশেষ নির্দেশ দেন তিনি।

বৈঠকে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মন্ত্রী কৌশিক রায় বলেন, “কাছাড় জেলার সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে সমন্বিত প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। জনগণের প্রত্যাশা পূরণে প্রতিটি সরকারি প্রকল্প দ্রুত, কার্যকর এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হবে। উন্নয়নের প্রতিটি পদক্ষেপে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে এবং মানুষের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।”

তিনি আরও বলেন, “জেলার পরিকাঠামো উন্নয়ন, জনকল্যাণমূলক প্রকল্প এবং বিভিন্ন সরকারি পরিষেবা যাতে নির্ধারিত সময়ে মানুষের কাছে পৌঁছে যায়, সেজন্য সব বিভাগগুলিকে একযোগে কাজ করতে হবে। নিয়মিত পর্যালোচনা, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমেই সরকারের উন্নয়নমূলক উদ্যোগের প্রকৃত সাফল্য নিশ্চিত করা সম্ভব। আমরা কাছাড় জেলার সর্বাঙ্গীণ উন্নয়নে সম্পূর্ণ অঙ্গীকারবদ্ধ”।

ওভারলোড যানবাহন রুখতে টাস্ক ফোর্স গঠন
বৈঠকে জেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়নমূলক বিষয় নিয়ে একাধিক তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। তার মধ্যে অন্যতম ছিল কাছাড় জেলায় প্রবেশকারী ওভারলোড যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ। দীর্ঘদিন ধরেই অতিরিক্ত মালবোঝাই ট্রাক ও ভারী যানবাহনের কারণে জেলার বিভিন্ন সড়কের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠে আসছিল। এই পরিস্থিতিতে জেলা পরিবহণ দফতর, পুলিশ প্রশাসন, অতিরিক্ত জেলা আয়ুক্ত, সহকারী আয়ুক্ত এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দফতরের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি বিশেষ টাস্ক ফোর্স গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জেলার প্রতিটি প্রবেশপথে নিয়মিত নজরদারি চালিয়ে ওভারলোড যানবাহনের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে এই টাস্ক ফোর্স।

শুক্রবার থেকেই ক্যাপিটাল পয়েন্ট-রাঙ্গিরখাড়ি সড়ক মেরামতি
সড়ক পরিকাঠামো নিয়েও বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়। জাতীয় সড়কের ক্যাপিটাল পয়েন্ট থেকে রাঙ্গিরখাড়ি পর্যন্ত দীর্ঘদিন ধরে ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে পর্যালোচনা করা হয়। বৈঠকে জানানো হয়, জাতীয় সড়ক ও পরিকাঠামো উন্নয়ন নিগম-এর পক্ষ থেকে শুক্রবার থেকেই ওই অংশে মেরামতির কাজ শুরু করা হবে। দুই মন্ত্রীই সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গুণগত মান বজায় রেখে কাজ সম্পন্ন করার নির্দেশ দেন, যাতে সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান ঘটে।

বন্যা মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতির নির্দেশ
বর্ষাকালে সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে জলসম্পদ বিভাগের প্রস্তুতি নিয়েও বৈঠকে বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হয়। জেলার বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ দ্রুত মেরামত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি সমস্ত পাম্পসেট সর্বদা সচল রাখা, ডাবল-শাটার স্লুইস গেটগুলি সম্পূর্ণ কার্যকর অবস্থায় রাখা এবং জলনিকাশ ব্যবস্থাকে নিরবচ্ছিন্ন রাখতে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন দুই মন্ত্রী। অভিভাবক মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু পাল বলেন, “বর্ষাকালে সামান্য গাফিলতিও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই আগাম প্রস্তুতি, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলির মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে, যাতে যে কোনও জরুরি পরিস্থিতি দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করা যায়।”

মন্ত্রী কৌশিক রায়ও বলেন, “প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতির কোনও বিকল্প নেই। বন্যা-প্রবণ এলাকাগুলিতে আগাম ব্যবস্থা গ্রহণ, দ্রুত ত্রাণ ও উদ্ধার ব্যবস্থার প্রস্তুতি এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনকে সর্বদা সতর্ক থাকতে হবে। মানুষের জীবন ও সম্পদের সুরক্ষাই আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।”

সড়ক, পানীয় জল, স্যানিটেশন নিয়ে আলোচনা
এ ছাড়াও জেলার বিভিন্ন মহাসড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ সড়ক দ্রুত মোটরযান চলাচলের উপযোগী করে তোলার নির্দেশ দেওয়া হয়। বিশেষ করে বর্ষাকালে যাতে সাধারণ মানুষ, স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রী, রোগী, কৃষক, ব্যবসায়ী এবং নিত্যযাত্রীদের যাতায়াতে কোনও সমস্যা না হয়, সেদিকে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়। ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলির দ্রুত সংস্কার এবং নির্মীয়মাণ প্রকল্পগুলির কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ করার নির্দেশও দেওয়া হয়।

বৈঠকে জেলার পানীয় জল সরবরাহ ব্যবস্থা, স্যানিটেশন, গ্রামীণ ও শহুরে পরিকাঠামো উন্নয়ন, স্বাস্থ্যকর পরিবেশ গড়ে তোলা, প্রশাসনিক সমন্বয়, বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের উন্নয়নমূলক প্রকল্পের অগ্রগতি এবং জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির বাস্তবায়ন নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। সংশ্লিষ্ট বিভাগের ঊর্ধ্বতন আধিকারিকরা প্রকল্পগুলির বর্তমান অগ্রগতি তুলে ধরেন এবং দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ সম্পর্কে অবহিত করেন।

সমাপনী বক্তব্যে অভিভাবক মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু পাল বলেন, “সরকারি প্রকল্পের প্রকৃত সাফল্য তখনই, যখন সাধারণ মানুষ তার সুফল প্রত্যক্ষভাবে অনুভব করবেন। মানুষের প্রত্যাশা পূরণে প্রশাসনকে আরও দ্রুত, আরও দায়িত্বশীল এবং আরও জনমুখী হয়ে কাজ করতে হবে।”

মন্ত্রী কৌশিক রায় বলেন, “কাছাড় জেলার সর্বাঙ্গীণ উন্নয়নের লক্ষ্যে আমরা নিরন্তর কাজ করে চলেছি। সমন্বিত পরিকল্পনা, সময়মতো বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার মাধ্যমে উন্নয়নের প্রতিটি প্রকল্প সফলভাবে সম্পন্ন করা হবে। সরকারের লক্ষ্য মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা এবং সেই লক্ষ্য পূরণে প্রশাসনের প্রতিটি স্তরকে আরও সক্রিয় ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।”

এ দিনের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন শিলচরের সাংসদ পরিমল শুক্লবৈদ্য, বিধায়ক ড. রাজদীপ রায়, রাজদীপ গোয়ালা, কিশোর নাথ, কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থ, অমিয় কান্তি দাস এবং আমিনুল হক লস্কর।

এ ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন কাছাড়ের জেলা আয়ুক্ত রাহুল কুমার গুপ্ত, আইএএস, জেলা উন্নয়ন আয়ুক্ত রাজীব রায়, এসিএস, অতিরিক্ত জেলা আয়ুক্ত মনজ্যোতি কুটুম, এসিএস, জাগৃতি কালোয়ার, এসিএস, ধ্রুবজ্যোতি পাঠক, এসিএস, কাছাড় জেলা পরিষদের মুখ্য কার্যবাহী আধিকারিক ডরোথি সুচিয়াং, এসিএস, কাছাড়ের সিনিয়র পুলিশ সুপার সঞ্জীব কুমার শইকীয়া, এপিএস, জনস্বাস্থ্য বিভাগের মুখ্য বাস্তুকার ভাস্কর জ্যোতি শর্মা সহ বিভিন্ন সরকারি বিভাগের ঊর্ধ্বতন আধিকারিকরা।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *