পোস্ট-হারভেস্ট প্রযুক্তি ও রপ্তানি বাড়াতে শিলচরে বায়ার-সেলার মিট
বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন: বরাক উপত্যকার অন্যতম সেরা কৃষিপণ্য কাছাড়ের আনারসকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে আরও সুপ্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিল অ্যাগ্রিকালচারাল অ্যান্ড প্রসেসড ফুড প্রোডাক্টস এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি। বৃহস্পতিবার শিলচরে অনুষ্ঠিত “পোস্ট হারভেস্ট ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম অ্যান্ড বায়ার-সেলার মিট অন কাছাড় পাইনএপাল, অসম”-এ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত ক্রেতা, রপ্তানিকারক, কৃষি-উদ্যোক্তা, কৃষক প্রতিনিধি এবং সরকারি আধিকারিকদের উপস্থিতিতে কাছাড়ের আনারসের বিপণন ও রপ্তানি সম্ভাবনাকে নতুন মাত্রা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রকের অধীনস্থ এপেডার উদ্যোগে এবং অসম সরকারের কাছাড় জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় এই কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন খাদ্য, গণবণ্টন ও উপভোক্তা বিষয়ক, গৃহনির্মাণ ও নগর বিষয়ক এবং সমবায় বিভাগের মন্ত্রী কৌশিক রায়। তিনি বলেন, বরাক উপত্যকার অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি কৃষি এবং সেই কৃষির গর্বের অন্যতম পরিচয় কাছাড়ের প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত আনারস। এর স্বাদ, গুণমান এবং স্বকীয়তার জন্য এই আনারস ইতিমধ্যেই বিশেষ পরিচিতি লাভ করেছে। তিনি বলেন, এখন সময় এসেছে এই কৃষিপণ্যকে আরও বৃহত্তর দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে দেওয়ার।
মন্ত্রী আরও বলেন, ফসল কাটার পরবর্তী বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা, আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা, মূল্য সংযোজন এবং উৎপাদকদের সঙ্গে বাজারের সরাসরি সংযোগ গড়ে তুলতে পারলে কৃষকদের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে ফসল কাটার পর যে ক্ষয়ক্ষতি হয়, তা অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে। কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে সরকার এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলি সমন্বিতভাবে কাজ করে চলেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কাছাড়ের জেলা আয়ুক্ত রাহুল কুমার গুপ্ত, আইএএস, অতিরিক্ত জেলা আয়ুক্ত রক্তিম বরুয়া, এসিএস, অতিরিক্ত জেলা আয়ুক্ত (কৃষি) ধ্রুবজ্যোতি পাঠক, সিডিসি, লক্ষিপুর পীযূষ রাজ, কাছাড়ের সহকারী আয়ুক্ত, জেলা কৃষি আধিকারিক ডাঃ রাহুল চক্রবর্তী, নাবার্ড-এর উপ-মহাপ্রবন্ধক ইভান টি. মুংসং, সমাজকর্মী সঞ্জয় ঠাকুর, এপেডা, গৌহাটি বিজনেস ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার সাজু অধিকারী, অসম গৌরব মন্থন মার, লক্ষিপুর পৌরসভার প্রতিনিধি মিনাল কান্তি দাস, বিভিন্ন ফার্মার প্রোডিউসার কোম্পানির (এফপিসি) প্রতিনিধিরা, রপ্তানিকারক, প্রসেসর, অগ্রণী কৃষক এবং দেশের বিভিন্ন রাজ্য থেকে আগত ক্রেতারা।
উপস্থিত অতিথিরা একবাক্যে বলেন, উর্বর জমি, অনুকূল আবহাওয়া এবং প্রাকৃতিক চাষপদ্ধতির কারণে কাছাড় কৃষিক্ষেত্রে এক বিশেষ সম্ভাবনাময় জেলা। এখানকার আনারস ইতিমধ্যেই তার নিজস্ব স্বাদ ও গুণমানের জন্য বাজারে আলাদা পরিচিতি গড়ে তুলেছে। উন্নত পোস্ট-হারভেস্ট ব্যবস্থাপনা, বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়াকরণ, সংগঠিত বিপণন এবং মূল্য সংযোজনভিত্তিক শিল্প গড়ে উঠলে কৃষকদের জন্য নতুন ব্যবসায়িক সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিও আরও শক্তিশালী হবে বলে তাঁরা মত প্রকাশ করেন।
কৃষক-ক্রেতার সরাসরি মতবিনিময়
এই কর্মসূচির অন্যতম আকর্ষণ ছিল কৃষক এবং প্রাতিষ্ঠানিক ক্রেতাদের সরাসরি মতবিনিময়ের সুযোগ। কাছাড়ের কৃষকেরা তাঁদের উৎপাদিত তাজা আনারসের পাশাপাশি উন্নত মানের বিভিন্ন মসলা ও অন্যান্য কৃষিজ পণ্য প্রদর্শন করেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত ক্রেতারা পণ্যের গুণমান পর্যবেক্ষণ করেন, সংগ্রহ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করেন এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্রয়-বিপণনের সম্ভাবনা নিয়ে মতবিনিময় করেন অংশগ্রহণকারীদের মতে, এই ধরনের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কৃষকদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্থানীয় কৃষিপণ্যের জন্য নতুন বাজারের দুয়ার খুলে দিতে পারে।
কারিগরি অধিবেশনে বিশেষজ্ঞ বক্তৃতা
অনুষ্ঠানের কারিগরি অধিবেশনে এপেডার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় আঞ্চলিক কার্যালয়ের বিজনেস ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার ডাঃ সাজু অধিকারী বৈজ্ঞানিক পোস্ট-হারভেস্ট ব্যবস্থাপনা, গ্রেডিং, প্যাকেজিং, সংরক্ষণ এবং বাজারজাতকরণের প্রস্তুতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। পাশাপাশি হরিয়ানার সোনিপতের কুন্ডলিতে অবস্থিত ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ফুড টেকনোলজি, এন্টারপ্রেনারশিপ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট (নিফটেম)-এর হর্টিকালচার (পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি)-এর অধ্যাপক এবং স্নাতকোত্তর অধ্যয়নের ডিন ডাঃ সুনীল পারেখ “পোস্ট হারভেস্ট ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভ্যালু অ্যাডিশন অব পাইন্যাপল” বিষয়ের ওপর বিশেষজ্ঞ বক্তৃতা প্রদান করেন। তিনি ফসল কাটার পর ক্ষয়ক্ষতি কমানো, সংরক্ষণকাল বৃদ্ধি, আনারস থেকে মূল্য সংযোজিত বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের গুণগত মান পূরণের কার্যকর পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোকপাত করেন।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বাজার সম্প্রসারণ এবং উন্নত বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তোলা। সেই দিক থেকে এ ধরনের বায়ার-সেলার মিট কৃষকদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে। উৎপাদক, ক্রেতা এবং সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে কাছাড়ের আনারস শুধু অসম নয়, দেশের অন্যতম জনপ্রিয় কৃষিপণ্য হিসেবে আরও সুদৃঢ় অবস্থান তৈরি করবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।












