প্রতিবেদক: পরম ভট্টাচার্য ও সায়ন রায় কুটন
# সোমবার রাতে শিলচর শ্মশান ঘাট স্বর্গদ্বারে
নীলতন্ত্র সাধনার ব্রত করলেন চড়ক পূজার সন্ন্যাসীরা । এ দিন নীল তন্ত্রের পূজা দেখতে
শ্মশান ঘাটে ভিড় উপচে পড়ে।
## মনে রাখা জরুরি এটি বৃহৎ বাঙালি সমাজের গহন মাতৃতান্ত্রিক ধারার অন্তর্গত।
## নীলতন্ত্র সাধনা দশমহাবিদ্যার অন্যতম দেবী তারা বা নীলসরস্বতীর আরাধনা। তান্ত্রিক মতে এই আরাধনা উচ্চ জ্ঞান, বাগ্মীতা এবং আধ্যাত্মিক শক্তি লাভের জন্য করা হয়। বামাচার তান্ত্রিক ধারার এই পুজোয় দেবী তারা “উগ্রতারা” বা ত্রাতা হিসেবে পূজিত হন। কারণ তিনি জ্ঞান ও মুক্তি দান করেন নীলতন্ত্র সাধনার মূল দিক:দেবী তারা নীলসরস্বতী , যিনি দেবী কালীরই এক রূপ। উচ্চ প্রাচীন রুচির মাতৃতান্ত্রিক ঐতিহ্য ও চর্চায় এই দেবী মাতা দেবগুরু বৃহস্পতিকেও জ্ঞান প্রদান করেছিলেন । এই সাধনা সাধারণত শ্মশান বা নির্জন স্থানে করা হয়, যেখানে দেবীর প্রত্যক্ষ দর্শনের জন্য গভীর ধ্যানের প্রয়োজন হয় ।
কালক্রমে নীল তন্ত্র সাধনা ও নীল ষষ্ঠী বিভিন্ন রূপ নেয় ।
## নীলতন্ত্রে পূজিতা দেবী তারা নীল সরস্বতী ।
## নীল ষষ্ঠী পুজোয় পূজিত মহাদেব।
## কালক্রমে বিভিন্ন সামাজিক নিদানে প্রভাবে-প্রতাপে দেব দেবী মিলেমিশেও যান ।
## চৈত্র সংক্রান্তির আগের দিন কিন্তু তারিখ, শাস্ত্র বা প্রথাগত কোনোভাবেই ষষ্ঠী তিথি নয়। তাহলে কেন এই দিনটিকে নীলষষ্ঠী হিসেবে পালন করা হয় ?
## নামে ষষ্ঠী হলেও নীল ষষ্ঠী পুজোয় পূজিত হন মহাদেব।
নীলষষ্ঠীর পরের দিন চৈত্র সংক্রান্তি এবং তার পরের দিনই পয়লা বৈশাখ।
## এই দিন শিবের পুজো করার নেপথ্যে রয়েছে একটি পৌরাণিক কাহিনি। মহাদেবের অপমান সইতে না পেরে প্রাণত্যাগ করেন সতী দেবী। এর পর তিনি রাজা নীলধ্বজের কন্যা নীলাবতী হিসাবে পুনর্জন্ম নেন । বিয়ে হয় মহাদেবের সঙ্গে। প্রচলিত বিশ্বাস, দেবী নীলচণ্ডী বা নীলাবতী এবং নীলকণ্ঠ শিবের পরিণয় সম্পন্ন হয়েছিল চৈত্র সংক্রান্তির আগের দিন। তাই বিশেষ এই তিথিতে নীলপুজো করা হয়ে থাকে। শিবের গাজনেরও অঙ্গ এটি।
## সন্তানের মঙ্গলকামনায় এই বিশেষ তিথিতে পুজো করার কারণ হিসাবে জানা যায় গ্রামবাংলায় প্রচলিত এক লোককাহিনি। এক অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ ব্রাহ্মণ দম্পতির সকল সন্তান একে একে মৃত্যু হতে থাকে । সেই কষ্ট সহ্য করতে না পেরে ওই পরিবারটি বাড়ি ছেড়ে কাশীতে বাস করা শুরু করে। একদিন গঙ্গাস্নানের পর পুত্র শোকে ব্রাহ্মণী ঘাটে বসে চোখের জল ফেলছিলেন। এক বৃদ্ধা তাঁকে কান্নার কারণ জিজ্ঞাসা করলে ব্রাহ্মণী সন্তানদের অকালমৃত্যু সম্পর্কে জানান। এত পুজোআচ্চা, বারব্রত পালনের পরেও তাঁর এই দুর্দশার কথা বলে দুঃখ করতে থাকেন জনৈকা বৃদ্ধার কাছে।
## কথিত যে আসলে সেই বৃদ্ধা ছিলেন ছদ্মবেশী মা ষষ্ঠী। দেবী তখন তাঁকে চৈত্র সংক্রান্তির আগের দিন উপোস করে শিবপুজো করতে বলেন এবং সে ব্রতের অন্যান্য নিয়মও শিখিয়ে দেন। সেইমতো ব্রতপালনের ফলে ব্রাহ্মণীর কোলে আবার সন্তান আসে এবং সুস্থ ভাবে বেঁচে থাকে। যেহেতু মা ষষ্ঠী নীলকণ্ঠ শিবকে পুজো করার কথা বলেছিলেন সেই কারণেই এই ব্রতের নাম নীলষষ্ঠী।
## কাহিনি আছে এই নীলষষ্ঠীর দিনেই আবার নীলকণ্ঠ শিবের সঙ্গে নীলচণ্ডিকা বা নীলাবতীর বিয়ে হয়েছিল। মহাদেব নিজে নীলকণ্ঠ , তাঁর সঙ্গে বিয়ে হল নীলাবতীর । দিনটি এই কারণেও নীলষষ্ঠী । এই পুজোকে নীলপুজোও বলা হয়।
### চৈত্রের শেষ সপ্তাহের শিব উপাসনা বা শিবের গাজন চৈত্র সংক্রান্তির দিনে চড়ক পুজোর মধ্য দিয়ে শেষ হয়। এমন দিনে শ্মশান ঘাটে গেলে সমস্ত দেখে অনুমান ও অনুভব করা যায় যে নীল তন্ত্রের দেবী সাধনা , নীল ষষ্ঠীর শিব সাধনা আর চড়ক পুজোর চরম পরিণতি কোনো একটা জায়গায় এসে রূপ নিয়েছে।
## তথাকথিত ভদ্র শিক্ষিত মধ্য বা উচ্চ বিত্ত এইসব লোক উৎসবের ধারক বা পালক নন। কোনো কোনো প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যেই এ চর্চা বা প্রচলন। সামাজিক পালাবদলে সময় সময় বিত্ত শালী ও প্রতাপীরা বিশেষ কোনো লক্ষ্যপূরণে প্রান্তিক গোষ্ঠীর জনপ্রিয় উৎসবকে আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে সাজিয়ে গুছিয়ে তোলার রেওয়াজও রয়েছে।