বরাককণ্ঠের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে ব্যাপক সাড়া
আগামী বছর পয়লা বৈশাখ মানে বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন সারাদিন ব্যাপী ‘ষোলো আনা বাঙালিয়ানা’য় ঠাসা অনুষ্ঠান আয়োজনের ডাক উঠল বুধবার, বৈশাখে শিলচরের পত্রিকাগোষ্ঠী পয়লা ‘বরাককণ্ঠ’ অন্যতম আয়োজিত বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে। স্থানীয় গান্ধীভবনে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে অতিথি আইনজীবী রজত ঘোষ মূলত এই প্রস্তাব রাখেন। এদিন মঞ্চে অন্যতম অতিথি হিসেবে উপস্থিত প্রাক্তন বিজেপি সাংসদ ও সুপ্রতিষ্ঠিত চিকিৎসক ডাঃ রাজদীপ রায় সহ বর্ষীয়ান বিজেপি নেতা উদয়শংকর গোস্বামী, অভ্রজিৎ চক্রবর্তী (ঝলক),ডেভেলপমেন্ট অথরিটির প্রাক্তন চেয়ারম্যান মঞ্জুল দেব সহ বিশিষ্ট সমাজকর্মী সাধন পুরকায়স্থ এতে সায় দেন। বরাককণ্ঠের সত্ত্বাধিকারী ও সম্পাদক সন্তোষ চন্দকে পাশে রেখে ডাঃ রাজদীপ রায় বলেন, আগামী বছর কেন্দ্রীয় ভাবে যাতে সারাদিন ধরে পয়লা বৈশাখ উদযাপন করা হয় তা নিয়ে তিনি উদ্যোগী হবেন।বাকি বিশিষ্টদের গলাতেও ছিল একই সুর। প্রতিবারের মত এবারও বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বরাককণ্ঠ। এদিন সন্ধ্যায় গুটি-গুটি পায়ে ২২ বছরে পা রাখা এই পত্রিকাগোষ্ঠীর এবারের আয়োজনের প্রদীপ জ্বেলে সূচনা করেন বিশিষ্টরা। প্রত্যেক অতিথিই আয়োজকদের এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন। বিশেষ করে সন্তোষ চন্দকে কুর্নিশ জানিয়ে তাঁরা বলেন, এত বছর ধরে একটি পত্রিকা চালিয়ে নেওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। বিশেষ করে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের প্রসঙ্গ টেনে তাঁরা বলেন, খাঁটি বাঙালিয়ানাকেই তুলে ধরতে চাইছেন আয়োজকরা। তাই এ অনুষ্ঠানে ধুতি ও শাড়িকে আলাদা করে গুরুত্ব দেওয়া হয় প্রত্যেকবার। তাই মঞ্চে শিল্পী ও অতিথিদের ধুতি এবং শাড়ি পরেই উঠতেই হয়। আগামী বছর গোটা দিন জুড়ে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করলে আয়োজকদের এই প্রচেষ্ঠা অন্য এক মাত্রায় পৌঁছবে বলে অতিথিরা মনে করেন। এদিন অতিথিদের হাত ধরে বরাককণ্ঠের ডিজিটাল পোর্টালেরও উদ্বোধন হয়। দ্বিতীয় পর্বে ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। শুরুতে উদ্বোধনী সঙ্গীত পরিবেশন করেন শিলচর ইয়ুথ কয়্যারের শিল্পীরা। দ্বৈত সঙ্গীত পরিবেশন করেন মনোপ্রিয়া দেব এবং কমলিকা নাথ। একক সঙ্গীত পরিবেশন করেন বিশিষ্ট শিক্ষিকা এবং সঙ্গীত শিল্পী বাপি রায়, বিশ্বরাজ ভট্টাচার্য। সমবেত সঙ্গীত পরিবেশন করেন সুরমল্লার সাংস্কৃতিক সংস্থার শিল্পীরা। এবার বর্ষসেরা শিল্পী পুরস্কার পান বিশিষ্ট নৃত্য শিল্পী সৌমিত্রশঙ্কর চৌধুরী (জয়)। শিল্পীর হাতে পুরস্কার তুলে দেন সন্তোষ চন্দ, রজত ঘোষ, সোনালি দে, বিশ্বতোষ দেব এবং মনোপ্রিয়া দেব। সমবেত নৃত্য পরিবেশন করেন শিলচর ইয়ুথ কয়্যার, নৃত্যাঞ্জলি সাংস্কৃতিক সংস্থা, ছন্দকলা, নৃতাকলি ড্যান্স অ্যাকাডেমি, ছন্দেছন্দে মিউজিক কলেজ, গৌড়ীয় নৃত্যকলা ভারতী, নিক্কণ সঙ্গীত বিদ্যালয়, বংশীতা কলা নিকেতনের শিল্পীরা। অনুষ্ঠানের ফাঁকে বর্ষীয়ান কবি কস্তুরি হোম চৌধুরীকে তাঁর অবদানের জন্য সম্মান জানানো হয়। সম্মান তুলে দেন উদয়শঙ্কর গোস্বামী। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের শেষে স্মারক দেওয়া সুপ্রভা রাজকুমারী, বিশ্বরাজ ভট্টাচার্য, শান্তিকুমার ভট্টাচার্য, মনোপ্রিয়া দেব, বাপি রায়, কমলিকা নাথ,অপর্ণা বৈদ্য, গায়ত্রী দেব, দেবাশিস পুরকায়স্থ, লুইতেশ দাস, দিবাকর দাস অভিজিৎ দেব, দীপশিখা চন্দ, সুজিতচন্দ্র পালএবং বিপ্লব দে-কে। এদিন প্রত্যেকটি সাংস্কৃতিক সংস্থার দলনেতার হাতে সম্মাননা স্মারক এবং অংশগ্রহণকারী শিল্পীদের হাতেও শংসাপত্র তুলে দেওয়া হয়। বিশ্বতোষ দেব। সবশেষে আশা ভোঁসলের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। এদিন যন্ত্রসঙ্গীতে সহযোগিতা করেন তবলায় সন্তোষ চন্দ, বিপ্লব দে, কি-বোর্ডে দিবাকর দাস, অক্টোপ্যাডে লুইতেশ দাস। সঞ্চালনায় ছিলেন দেবাশিস পুরকায়স্থ ও বিপ্লব দে। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বিশ্বতোষ দেব। অনুষ্ঠান পরিচালনায় ছিলেন সন্তোষ চন্দ এবং সোনালি দে। সন্তোষ চন্দ বলেন, অনুষ্ঠানে অনেক দর্শক-শ্রোতা এবং শিল্পী বসার আসন না পাওয়ায় তাঁদের দাঁড়িয়ে অনুষ্ঠান উপভোগ করতে হয়েছে। এতে তিনি দুঃখিত। তিনি জানান, বঙ্গভবনে অনুষ্ঠান করার কথা ছিল কিন্তু অনুরোধ করার পরও সময়মত কর্তৃপক্ষ প্রেক্ষাগৃহ না দেওয়ায় তড়িঘড়ি গান্ধীভবনে অনুষ্ঠান করতে হয়েছে। তাই এই সমস্যা তৈরি হয়েছে। প্রসঙ্গত, ২০০৪ সালের প্রজাতন্ত্র দিবসে গান্ধীভবেনই সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘বরাককণ্ঠ’র পথ চলা শুরু হয়। ২০০৮ সালে প্রথম বরাককণ্ঠ বাংলা নববর্ষ উদযাপন করতে শুরু করে। এ অঞ্চলের বাঙালির বাঙালি কৃষ্টি ও সংস্কৃতি চর্চাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রতি বছর নববর্ষ উদযাপন করে এ পত্রিকাগোষ্ঠী। ঐতিহ্যবাহী পোশাক ধুতি ও শাড়িকে এই উদযাপনের অঙ্গ করে নেওয়া হয়েছে গত কয়েকবছর থেকে। এবারের আয়োজনে পত্রিকার সূচনা লগ্ন থেকে এখন পর্যন্ত যাঁরা জড়িত আছেন তাঁদের কথাও এদিন তুলে ধরেন আয়োজকরা। জানান ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা। এদিন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গায়ত্রী দেবের পরিচালনায় গাজনের নাচ এবং প্রিয়াঙ্কা চন্দের পরিচালনায় সমবেত নৃত্য দর্শকের প্রশংসা অর্জন করে। বিশ্বরাজ ভট্টাচার্যের একক সঙ্গীত ছিল অনবদ্য। বর্ষীয়ান সঙ্গীত শিল্পী বাপি রায়ের একক সঙ্গীত ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। এদিন অনুষ্ঠানের বাড়তি পাওনা ছিল সৌমিত্র শংকর চৌধুরীর একক নৃত্য। সব মিলিয়ে এদিনের অনুষ্ঠান সার্থক হয়ে উঠে সবার সহযোগিতায়। অনুষ্ঠানের শুরুতে বরাককণ্ঠের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন সঞ্চালক দেবাশিস পুরকায়স্থ। উদ্বোধনী বক্তব্যে উদয় শঙ্কর গোস্বামী অনুষ্ঠানের নান্দনিক পরিবেশ ও পোশাক রীতির প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ‘ভাষিক ব্যবধান থাকলেও এই মাটির সন্তান হিসেবে আমি মনে-প্রাণে একজন বাঙালি। ‘আজ বাংলা যা ভাবে, ভারত ভাবে পরদিন’-এই প্রবাদটি আজও আমাদের অনুপ্রাণিত করে।’ আইনজীবী রজত কুমার ঘোষ বরাককণ্ঠের উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি কামনা করে এক তাৎপর্যপূর্ণ প্রস্তাব রাখেন। তিনি বলেন, আগামীতে বরাককণ্ঠের এই উদ্যোগকে আরও বৃহত্তর রূপ দিতে শিলচরের সকল জনপ্রতিনিধি ও সংগঠনকে এক মঞ্চে এসে ঐক্যবদ্ধভাবে নববর্ষ উদযাপনের পরিকল্পনা করা উচিত। এই প্রস্তাবকে সমর্থন জানিয়ে ডা. রাজদীপ রায় বলেন, কেন্দ্রীয়ভাবে নববর্ষ উদযাপনের এমন উদ্যোগ নেওয়া হলে তাঁর পক্ষ থেকে পূর্ণ সহযোগিতা থাকবে। বিজেপির জেলা সহসভাপতি অভ্রজিৎ চক্রবর্তী তাঁর বক্তব্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘১৪০০ সাল’ কবিতার প্রাসঙ্গিকতা স্মরণ করেন। সমাজসেবী সাধন পুরকায়স্থ উপত্যকার ক্রমবর্ধমান সংস্কৃতি চর্চার প্রসারে সন্তোষ প্রকাশ করেন। মঞ্জুল দেব নববর্ষ পালনের বিবর্তন এবং বর্তমান প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনা করেন। অনুষ্ঠানের প্রাসঙ্গিকতা ও ভবিষ্যতের পরিকল্পনা নিয়ে বক্তব্য রাখেন বরাককণ্ঠের সম্পাদক সন্তোষ চন্দ।












