এই প্রাণ প্রকৃতির প্রতিটি অস্তিত্বের একটা শুরু থাকে। শুরু থেকেই তার জার্নি বা অভিযাত্রা শুরু হয়। নানা ওঠানামার মধ্য দিয়ে সেই অভিযাত্রার নীরব এবং সরব ইতিহাস ও আখ্যান রচিত হতে থাকে। কোনো কোনো অভিযাত্রা কোনো বাঁকে এসে ইতিহাস ও অভিজ্ঞতার পাতায় গভীর ছাপ রাখে। কখনও বহতা ধারার মত বয়ে চলে নীরবে। ২২ বছর আগে ২০০৪ সালের পবিত্র প্রজাতন্ত্র দিবসে , অর্থাৎ ২৬ জানুয়ারি বরাক উপত্যকার প্রথম সংস্কৃতি চর্চা বিষয়ক সাপ্তাহিক পত্রিকা বরাককণ্ঠের পথ চলার শুরুর দিন। এই গান্ধীভবনেই বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ঠাসা একটি দিনে সাপ্তাহিক বরাককণ্ঠ তার অভিযাত্রা শুরু করে। দিনটি দেশের সাধারণ নাগরিকের অধিকার, সম্মান ও অস্তিত্বকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি প্রদানের পবিত্র দিন। বরাককন্ঠ সাধারণ নাগরিক অর্থাৎ পাঠক সাধারণের সংবিধান-স্বীকৃত অধিকার , মর্যাদা রক্ষা ও ইতিবাচক আবেগের প্রতিনিধিত্ব করার লক্ষ্য নিয়ে চলতে চায় বলেই এই বিশেষ দিনটি সাপ্তাহিক বরাককন্ঠের প্রতিষ্ঠা দিবস। প্রথম বছর পূর্ণ হওয়ার পর থেকেই এই মহান দিনকে প্রতিষ্ঠা দিবস হিসেবে পালন করা হয়। বরাককণ্ঠ গোড়া থেকেই শিলচর ও বরাকের বিভিন্ন বিশিষ্টজনকে শুভানুধ্যায়ী, পরামর্শদাতা ও অভিভাবক হিসেবে সংগে পেয়েছে। প্রসূনকান্তি দেব, অতন্দ্র যুগের কবি শিক্ষক বিমল চৌধুরী থেকে শুরু করে সংগীত শিল্পী ও তাত্ত্বিক শংকর প্রসাদ ঘোষ, নৃত্যগুরু মুকুন্দদাস ভট্টাচার্য অনেকেই আজ যেমন প্রয়াত তেমনি যখনই প্রয়োজন স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে হোক বা আহ্বানে সাড়া দিয়ে হোক বরাককণ্ঠের প্রতি স্নেহভরা,বন্দুত্বপূর্ণ হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসেন বিশ্বজিৎ রায় চৌধুরী , রাজা রায়চৌধুরী, হারাণ দে, স্বর্ণালি চৌধুরী, রজত ঘোষ, প্রদীপ দত্ত রায়, বাপি দত্ত রায় প্রমুখ । বরাককণ্ঠের কঠিনতম দিনগুলিতে পিনাকী দাস ও মুদ্রণ সহযোগী দেবজিৎ করের প্রসারিত হাত অক্সিজেন জুগিয়েছিল। এক সময় করিমগঞ্জের সুব্রত কুমার দাস এর ভূমিকা বরাককণ্ঠ ভুলতে পারে না। ভুলতে চায় না। কবি লেখক সৌমিত্র বৈশ্য, প্রদীপ কুমার পাল , সুরনন্দন ভারতীর ঋতীশ চক্রবর্তী, সুজিৎ দাস মূল্যবান লেখা দিয়ে বরাককণ্ঠকে সমৃদ্ধ করেছেন।
প্রথম চার বছরে বরাককণ্ঠ নিয়মিত প্রকাশিত হয়েছে। নিয়মের মধ্যে থেকেই বিভিন্ন বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ হয়ে পাঠক মহলে প্রভূত সাড়া ফেলতে সক্ষম হয়েছে।মাতৃভাষা শহিদ সংখ্যা, পরিবেশ দিবস সংখ্যা, দ্বাদশ মাতৃভাষা শহিদ সংখ্যা, একুশে জুলাই ভাষা শহিদ দিবস সংখ্যা, বাংলা নববর্ষ সংখ্যা, পুজো সংখ্যা, বিশিষ্ট সমাজতাত্ত্বিক সুজিৎ চৌধুরী সংখ্যা, রবীন্দ্র জয়ন্তী সংখ্যা , বরাক উৎসব সংখ্যা। কোনো কোনো সংখ্যা হাতে হাতে ঘুরেছে। কোনো সংখ্যা ঝড় তুলেছে। তুলেছে বিতর্ক। হয়েছে বিতর্কিত। কোনো সংখ্যা সমালোচিত হয়েছে, কোনো সংখ্যা হয়েছে প্রশংসিত। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আলোচনা বা রিভিউ করে ভূয়সী প্রশংসা বা নির্মম সমালোচনা অর্জন করেছে বরাককণ্ঠ। শুরু থেকে অল্প কয়েকদিন সত্যজিৎ বসু জয়, তারপর ৬ বছর পরম ভট্টাচার্য ও তারপর থেকে গত ১৮ বছর সত্ত্বাধিকারী সন্তোষ চন্দই বরাককণ্ঠের মূল সম্পাদনায় যুক্ত। বরাক উপত্যকার ওপর রাজ্যের বিভিন্ন শাসক গোষ্ঠীর ভাষা সংস্কৃতিক সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের স্বরূপ যত ষ্পষ্ট হয়ে আসতে শুরু করে , হিন্দি ও ইংরেজির ভাষিক ও সাংস্কৃতিক দাপট যত বেশি চেপে বসতে থাকে নতুন প্রজন্ম , অভিভাবক ও বিভিন্ন বয়সী বাঙালি মধ্যবিত্তের ওপর , তত বেশি বিভিন্ন পর্যায়ের মাতৃভাষা সংস্কৃতির প্রচার ও প্রসারের প্রয়োজনীয়তা সম্পাদকীয় চিন্তাভাবনায় প্রাধান্য পেতে শুরু করে। রাজ্যের ও আমাদের উপত্যকার বহুভাষিক ভাষা সংস্কৃতি ও কৃষ্টির প্রতি শ্রদ্ধা অক্ষুণ্ন রেখে সমাজ প্রগতির প্রতিনিধিত্বকারী আপন ভাষা সংস্কৃতি কৃষ্টির চর্চা করে যাওয়াই বরাককণ্ঠের লক্ষ্য। ২০০৯ সাল থেকে একাংশ পাঠকের অনুরোধে বরাককণ্ঠ হয়ে ওঠে সমাজ সংস্কৃতির সংগে রাজনীতি বিষয়ক সাপ্তাহিক । কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের অনুমোদন ও পঞ্জিয়নভুক্ত এই সাপ্তাহিক সর্বদাই বিভিন্ন ভাবন চিন্তা ও মত প্রকাশে আগ্রহী। শুরুর বছরের চার বছরে পর বিবিধ অভিজ্ঞতার ফল স্বরূপ ২০০৮ সালে প্রথম বরাককণ্ঠ বাংলা নববর্ষ উদযাপন করতে শুরু করে । এ অঞ্চলের বাঙালি কৃষ্টি ও সংস্কৃতি চর্চাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে প্রতি বছর নববর্ষ উদযাপন শুরু হয়। বিভিন্ন বয়সীদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নৃত্য গীতে মুখর হয়ে ওঠে একেকটি নববর্ষ উদযাপন অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী পরিধেয়কে প্রাধান্য দিয়ে বিনোদনের আনন্দে ধূতি শাড়িকে তার অঙ্গ করে নেওয়া হয়েছে গত কয়েকবছর থেকে। নতুন বাংলা বছরকে নিবিড় বাঙালিয়ানা দিয়ে বরণ করতে পঞ্চদশ মাতৃভাষা শহিদ উপত্যকার পবিত্র উঠোনকে আজকের পবিত্র দিনে আজ আবার সাজিয়ে তোলা হয়েছে। আসুন সকলে মিলে একসাথে বলি, এসো হে বৈশাখ এসো এসো।