বিশেষ প্রতিবেদন: “ভোট এলে শিল্পীর কদর বাড়ে, ভোট গেলেই জঞ্জাল। মিছিলে ঢোল বাজাতে শিল্পী চাই, অথচ শিল্পীর পেটে ভাত নেই, মাথার উপর ছাদ নেই, মঞ্চ নেই।” — পরিকাঠামোর অভাবে বরাক উপত্যকার শিল্প-সাহিত্য আজ মৃত্যুশয্যায়। শিল্পী সমাজের আবেদন, সংস্কৃতি বাঁচান, বরাক বাঁচান। শিলচরের প্রধান প্রেক্ষাগৃহ গান্ধীভবনে কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেই। জুনের ৪২ ডিগ্রিতে ৩০০ দর্শকের দমবন্ধ অবস্থা হয়। মঞ্চের পর্দা ছেঁড়া, সাজঘরের ছাদ দিয়ে জল পড়ে, শৌচাগার ব্যবহারের অযোগ্য। বাইরে থেকে আসা শিল্পীরা হলের অবস্থা দেখে ফিরে যান। ৪০ বছর ধরে সংস্কারের ফাইল ঘুরছে, কাজ হয়নি। শিলচর ও আশপাশের ১৫ লক্ষের বেশি মানুষের জন্য অনুষ্ঠানের হল মাত্র তিনটি — গান্ধীভবন, রাজীব ভবন ও বঙ্গভবন। সব হলে লাইট, মাইক, জেনারেটর আছে, তবে মানসম্মত অনুষ্ঠানের জন্য তা পর্যাপ্ত নয়। তারিখ পেতে চার মাস আগে আবেদন করতে হয়। পরীক্ষা, বিয়ে, সরকারি সভায় হল আটকে থাকে। ছোটো দলগুলো বছরে একটাও মঞ্চ পায় না। সরকারি হল না পেয়ে বাধ্য হয়ে বেসরকারি হলে যেতে হয়। ৩ ঘণ্টার ভাড়া ৬০ হাজার টাকা। একটা অনুষ্ঠানে মোট খরচ দেড় থেকে দুই লাখ। বাকি দেনা আয়োজক সংস্থার সদস্যদের ঘাড়ে চাপে। ফলে গত ৫ বছরে অনেক সংগঠন বন্ধ হয়ে গেছে। সংস্থা রেজিস্ট্রেশন করতে কয়েক হাজার খরচ। কিন্তু এই টাকা ব্যবস্থা করতে অনেক সংগঠনের কর্মকর্তারা হিমশিম খাচ্ছে। ফলে বহু সংগঠন রিনিউ করতে পারছে না। রেজিস্ট্রেশন বাতিল হয়ে যাচ্ছে। সরকার একটু সাহায্য করলে এইসব ছোটোখাটো সংগঠন বেঁচে যাবে। “বিশ্বমানের জেলা গ্রন্থাগার” ঘোষণার অনেক বছর পরও নির্মাণ শেষ হয়নি। ছাত্র, গবেষক, সাধারণ মানুষ একটা পাঠকক্ষের জন্য অপেক্ষায়। লক্ষাধিক মানুষের নিউ শিলচর, রাঙ্গিরখাড়ি, সোনাই রোড এলাকায় একটা সরকারি খেলার মাঠ, শিশুপার্ক বা মিলনায়তন নেই। বাচ্চারা রাস্তায় খেলতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে, নয়তো ঘরে বসে মোবাইলে আসক্ত হচ্ছে। করোনার আগে মাসে ১০-১২টা অনুষ্ঠান হতো। এখন মাসে একটাও জোটে না। পারিশ্রমিক ১০০০ টাকা, তাও মাসের পর মাস বাকি। সরকারের পক্ষ থেকে কোনো অনুদান পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে নামকরা তবলিয়া টোটো চালাচ্ছেন, নাট্যকার রাজমিস্ত্রির জোগাড়ে খাটছেন, লোক শিল্পী ভিক্ষা করছেন, কেউ সবজি বিক্রি করছেন আবার কেউ অন্য ব্যবসা করে সংসার চালাচ্ছেন। বরাকে সাংস্কৃতিক দপ্তরের কার্যালয়ে কর্মী মাত্র একজন। চেয়ার ভাঙা, কম্পিউটার নেই। শিল্পীরা অনুদান-পেনশনের খোঁজে রোদে-জলে দাঁড়িয়ে থাকেন। প্রতি বছর শত কোটি টাকার সাংস্কৃতিক বাজেট হলেও বরাক বঞ্চিত — অভিযোগ শিল্পীদের। শিল্পীদের মতে, সংস্কৃতি মরলে ১০ বছর পর ধামাইল, ঝুমুর, বরাকের লোকনাট্য জাদুঘরে চলে যাবে। মাঠ-মঞ্চ না পেয়ে যুবক নেশা-চুরি-ছিনতাইয়ে জড়াবে। একজন শিল্পীর সঙ্গে ২০টা পেট জড়িত। সাংস্কৃতিক পর্যটন বন্ধ হলে হাজারো পরিবার পথে বসবে। গান-নাটক-খেলা বন্ধ হলে সমাজে হিংসা, অবসাদ, আত্মহত্যা বাড়বে। তাই আগামী বাজেটেই সংস্কৃতি রক্ষায় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছে শিল্পী সমাজ। দাবিগুলো হলো: গান্ধীভবনে কেন্দ্রীয় এসি, ৫০০টি নতুন চেয়ার, আধুনিক সাজঘর, পরিষ্কার শৌচাগার চালু করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। শিলচর, শ্রীভূমি ও হাইলাকান্দিতে ৫০০ আসনের আন্তর্জাতিক মানের সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স ও ডিজিটাল গ্রন্থাগারের কাজ শুরু করার অনুরোধ রয়েছে। এই অর্থবছরেই নিউ শিলচরে খেলার মাঠ, শিশুপার্ক ও ৩০০ আসনের মিনি হল তৈরির অনুরোধ করা হয়েছে। ছোটোখাটো সংস্থার জন্য সরকারি হলে ভাড়া ৫০০০ টাকা করার অনুরোধ করা হয়েছে। সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর রেজিস্ট্রেশন ও রিনিউ ফি মওকুফ বা সরকারি সহায়তার ব্যবস্থা করার অনুরোধ করা হয়েছে। রাজ্যের সাংস্কৃতিক বাজেটের ৩০% বরাকের তিন জেলার জন্য বরাদ্দ করার আর্জি জানানো হয়েছে। ৬০ বছরের বেশি বয়সী শিল্পীদের মাসিক ১৫০০০ টাকা পেনশন ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করার অনুরোধ রেখেছেন শিল্পী সমাজ। শিল্পীদের সরকারি আইকার্ডের ব্যবস্থা করার অনুরোধ রেখেছেন। শিল্পীদের বক্তব্য, “গান্ধীভবনের এসি মানে শুধু হল ঠান্ডা করা নয়, ৭০ বছরের বঞ্চনার আগুন নেভানো। সংস্কৃতি বাঁচলেই বরাক বাঁচবে। সরকারের কাছে অনুরোধ, আগামী বাজেটেই সংস্কৃতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া।”
পরিকাঠামোর অভাবে ধুঁকছে শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতি বাঁচাতে সরকারের কাছে আবেদন
বিশেষ প্রতিবেদন: “ভোট এলে শিল্পীর কদর বাড়ে, ভোট গেলেই জঞ্জাল। মিছিলে ঢোল বাজাতে শিল্পী চাই, অথচ শিল্পীর পেটে ভাত নেই, মাথার উপর ছাদ নেই, মঞ্চ নেই।” — পরিকাঠামোর অভাবে বরাক উপত্যকার শিল্প-সাহিত্য আজ মৃত্যুশয্যায়। শিল্পী সমাজের আবেদন, সংস্কৃতি বাঁচান, বরাক বাঁচান। শিলচরের প্রধান প্রেক্ষাগৃহ গান্ধীভবনে কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেই। জুনের ৪২ ডিগ্রিতে ৩০০ দর্শকের…
Previous Post
Next Post
Leave a Reply
Latest News












