বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন, নয়াদিল্লি : টানা জল্পনা, দরকষাকষি এবং রাজনৈতিক লবিংয়ের পর অবশেষে কেরলের ১৩তম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ভি ডি সতীশনের নাম ঘোষণা করল কংগ্রেস হাইকমান্ড। দলের অন্দরে এই সিদ্ধান্তকে কেরল রাজনীতিতে নতুন প্রজন্মের, আক্রমণাত্মক এবং মিডিয়া-সচেতন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দিল্লিতে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা
বৃহস্পতিবার দিল্লিতে সাংবাদিক বৈঠক করে সতীশনের নাম ঘোষণা করেন কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক তথা কেরলের দায়িত্বপ্রাপ্ত দীপা দাশমুন্সি। তাঁর সঙ্গে ছিলেন কংগ্রেস নেতা অজয় মাকেন, মুকুল ওয়াসনিক এবং জয়রাম রমেশ। কেরল বিধানসভায় ১০২টি আসনে জয়ী হয়েছে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন জোট ইউডিএফ। অথচ ভোটগণনার পর ১০ দিন কেটে গেলেও মুখ্যমন্ত্রী কে হবেন, তা স্থির করতে পারছিল না কংগ্রেস।
শেষ মুহূর্তের লবিং, পিছিয়ে পড়লেন বেণুগোপাল-চেন্নিতালা
দলীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচন নিয়ে জোরদার আলোচনা চলেছে। কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক কে সি বেণুগোপালকে চূড়ান্ত বৈঠকের জন্য ডেকে পাঠান রাহুল গান্ধী। অন্যদিকে প্রবীণ কংগ্রেস নেতা রমেশ চেন্নিতালাকে ফোন করে জানিয়ে দেওয়া হয়, মুখ্যমন্ত্রীর দৌড়ে সতীশনই এগিয়ে গিয়েছেন। এর আগে কংগ্রেস সূত্রে জানা গিয়েছিল, পরিষদীয় দল মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে বেণুগোপালের নাম প্রস্তাব করেছে। কিন্তু বিধায়কদের একাংশ সতীশনকে মুখ্যমন্ত্রী করার দাবি জানান। তাঁদের যুক্তি ছিল, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ইউডিএফ এবং কংগ্রেসের শোচনীয় পরাজয়ের পর দলকে জয়ের রাস্তায় ফিরিয়েছেন সতীশনই। বুধবার মল্লিকার্জুন খড়্গের বাড়িতে রাহুল গান্ধী-সহ শীর্ষ নেতাদের প্রায় ৪০ মিনিট বৈঠকের পরই চূড়ান্ত হয় সিদ্ধান্ত। জয়রাম রমেশ জানান, বৃহস্পতিবারই নাম ঘোষণা হবে।
কে এই ভি ডি সতীশন?
কোচি জেলায় জন্মগ্রহণকারী সতীশন এই মাসের শেষেই ৬২ বছরে পা দেবেন। পেশায় আইনজীবী সতীশন ২০০১ সালে এর্নাকুলাম জেলার পারাভুর কেন্দ্র থেকে প্রথম বিধায়ক নির্বাচিত হন। বিধানসভায় তাঁর তীক্ষ্ণ বক্তৃতা, তথ্যভিত্তিক আক্রমণ এবং রাজনৈতিক কৌশলের জন্য তিনি দ্রুত পরিচিতি লাভ করেন। দলের নিচুতলার কর্মীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ইউডিএফের বড় পরাজয়ের পর তাঁকে বিরোধী দলনেতা করা হয়। প্রথমে তাঁকে আপসের প্রার্থী বলে মনে করা হলেও পরবর্তীতে তিনি সেই পদকে নিজের রাজনৈতিক উত্থানের মঞ্চে পরিণত করেন। স্বর্ণ পাচার কাণ্ড, এআই ক্যামেরা বিতর্ক এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন সরকারের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আক্রমণের মাধ্যমে তিনি কেরলে বামবিরোধী রাজনীতির অন্যতম মুখ হয়ে ওঠেন।
গোষ্ঠীর বাইরে থেকেও গ্রহণযোগ্য
কেরল কংগ্রেসে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী ‘এ’ এবং ‘আই’ গোষ্ঠীর বাইরে থেকেও তিনি নিজের রাজনৈতিক অবস্থান বজায় রেখেছিলেন। সেই কারণেই তরুণ বিধায়ক ও তৃণমূল কর্মীদের মধ্যে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে। যদিও দলের একাংশের অভিযোগ, তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণে অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণের প্রবণতা দেখান। তবে সমালোচকরাও মানছেন, বর্তমানে কেরল কংগ্রেসে জনসংযোগের দিক থেকে সতীশনের জনপ্রিয়তা অনেকটাই এগিয়ে।
নীরবে বাসভবনে প্রবেশ
বৃহস্পতিবার সকালে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তিনি তিরুবনন্তপুরমে নিজের সরকারি বাসভবনে পৌঁছন। কিছুক্ষণের মধ্যেই অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটি আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করে। সমর্থকদের ভিড়ের মধ্য দিয়ে নীরবে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করেন তিনি। রাজনৈতিক মহলের মতে, বিরোধী শিবির থেকে মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে সতীশনের উত্থান কেরলে কংগ্রেসের নতুন যুগের সূচনা। তিনি কবে শপথ নেবেন, তা অবশ্য এখনও জানানো হয়নি।












