,

সবুজের শপথে শিলচর — গাছ লাগিয়ে বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালন করল বরাকভ্যালি নিউজ পেপার ওনার অ্যাসোসিয়েশন

‘আজকের একটি চারা, আগামীর নিঃশ্বাস’ প্রেস ক্লাব থেকে সার্কিট হাউস, সবুজে মুড়ল শহর বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন: আজ বিশ্ব পরিবেশ দিবস। প্রকৃতি মায়ের ডাকে সাড়া দিয়ে শিলচরও জেগে উঠল সবুজের মন্ত্রে। যথাযোগ্য মর্যাদা আর আবেগ নিয়ে দিনটি পালন করল বরাকভ্যালি নিউজ পেপার ওনার অ্যাসোসিয়েশন। স্লোগান ছিল একটাই — “আজকের একটি চারা, আগামীর নিঃশ্বাস”। শুক্রবার সকাল থেকেই শিলচর…

‘আজকের একটি চারা, আগামীর নিঃশ্বাস’ প্রেস ক্লাব থেকে সার্কিট হাউস, সবুজে মুড়ল শহর

বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন: আজ বিশ্ব পরিবেশ দিবস। প্রকৃতি মায়ের ডাকে সাড়া দিয়ে শিলচরও জেগে উঠল সবুজের মন্ত্রে। যথাযোগ্য মর্যাদা আর আবেগ নিয়ে দিনটি পালন করল বরাকভ্যালি নিউজ পেপার ওনার অ্যাসোসিয়েশন। স্লোগান ছিল একটাই — “আজকের একটি চারা, আগামীর নিঃশ্বাস”।

শুক্রবার সকাল থেকেই শিলচর প্রেস ক্লাব প্রাঙ্গন যেন মিলনমেলা। কলম যাঁদের অস্ত্র, সেই সংবাদপত্রের কর্ণধাররা আজ হাতে তুলে নিলেন কোদাল আর জলের বালতি। প্রেস ক্লাবের আঙিনায় প্রথম চারাগাছটি রোপণ করে কর্মসূচির সূচনা হয়। মাটি খুঁড়ে, জল ঢেলে, গাছের গোড়া বেঁধে দিতে দিতে সবার চোখে ছিল একটাই স্বপ্ন — বরাক উপত্যকাকে আরও সবুজ, আরও বাসযোগ্য করে তোলা।

বিশ্ব পরিবেশ দিবসের তাৎপর্য নিয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন সংস্থার সভাপতি মনোতোষ ধর। তিনি বলেন, “আমরা প্রতিদিন খবর লিখি। আজ খবরের বাইরে গিয়ে একটা কাজ করলাম যা আগামী প্রজন্ম পড়বে। আমাদের সন্তানরা যেন বলে — আমার বাবা-কাকারা শুধু খবর ছাপেননি, গাছও লাগিয়েছেন। গরম বাড়ছে, বন্যা হচ্ছে, বৃষ্টি অনিয়মিত হচ্ছে। এর প্রতিকার একটাই — গাছ। একটি গাছ কাটলে দশটি গাছ লাগানো আমাদের শপথ হোক।”

কার্যকরী সভাপতি সন্তোষ চন্দ বলেন, “বরাক উপত্যকার মাটি উর্বর। এখানকার মানুষও প্রাণবন্ত। কিন্তু গাছ কমলে প্রাণও কমে যায়। আজ আমরা যে চারাগুলো মাটিতে বসালাম, ২০ বছর পর এগুলোই শিলচরের ফুসফুস হবে। রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে ছায়া দেবে। পাখিরা বাসা বাঁধবে। শিশুরা এই গাছের নিচে খেলবে।”

এরপর শহর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে সবুজের বার্তা। শিলচর টাউন ক্লাব, কাছাড়ের ভূমি বন্দোবস্ত কার্যালয়, দূরদর্শন কেন্দ্র, তথ্য ও জনসংযোগ উপ-অধিকর্তার কার্যালয়, সার্কিট হাউস, আদালত প্রাঙ্গনের উপ-নিবন্ধক কার্যালয়, সংস্থার ঘনিয়ালার কেন্দ্রীয় কার্যালয় সহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি স্থানে চারা বসানো হয়। প্রতিটি গাছ লাগানোর সময় সদস্যরা মনে করিয়ে দিলেন, গাছ শুধু কাঠ দেয় না, দেয় প্রাণ। দেয় ছায়া। দেয় বাঁচার অক্সিজেন।

সাধারণ সম্পাদক বিজয় দেবনাথ আবেগ নিয়ে বলেন, “সংবাদপত্র শুধু সমাজের আয়না নয়, সমাজের বিবেকও। পরিবেশ নিয়ে মানুষকে সচেতন করাই আমাদের দায়িত্ব। আজ নিজেরা গাছ রোপণ করে সেই দায়িত্বের প্রথম ধাপ পালন করলাম। খবর ছাপি মানুষের জন্য, আজ গাছ লাগালাম মানুষের ভবিষ্যতের জন্য।”

শিলচর দূরদর্শন কেন্দ্রে কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কেন্দ্র অধিকর্তা সমরজিৎ সিংহ, আবর্ত ভবনে কাছাড়ের অতিরিক্ত জেলাশাসক এম. কুটুম, আদালত প্রাঙ্গনের উপ-নিবন্ধক কার্যালয়ের উপ-নিবন্ধক যুগল সিং, জ্যেষ্ঠ উপ-নিবন্ধক রাজীব কান্তি দাস, টাউন ক্লাবের উপসভাপতি নন্দদুলাল রায় সহ অন্যান্য আধিকারিকরা সংস্থার সদস্যদের সঙ্গে বৃক্ষরোপণে অংশ নেন। এই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন বিশিষ্ট ব্যক্তি সুজিত চন্দ্র পাল।

বৃক্ষরোপণ শেষে শিলচর দূরদর্শন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কেন্দ্র অধিকর্তা সমরজিৎ সিংহ বলেন, “গণমাধ্যমের মানুষরা যখন কলমের পাশাপাশি কোদাল হাতে নেন, তখন সমাজে একটা বার্তা যায়। আজ বরাকভ্যালি নিউজ পেপার ওনার অ্যাসোসিয়েশন যে উদ্যোগ নিল, তা শুধু প্রতীকী নয়। দূরদর্শন কেন্দ্রও এই সবুজ আন্দোলনের সঙ্গে আছে। আমরা চাই প্রতিটি মানুষ নিজের বাড়ির আঙিনায় অন্তত একটি গাছ লাগাক।”

অতিরিক্ত জেলাশাসক এম. কুটুম বলেন, “পরিবেশ রক্ষা কোনো একক সংস্থা বা সরকারের কাজ নয়। এটা সমাজের প্রতিটি মানুষের দায়িত্ব। বরাকভ্যালি নিউজ পেপার ওনার অ্যাসোসিয়েশন আজ যে উদাহরণ তৈরি করল, তা সত্যিই অনুকরণীয়। সংবাদপত্রের মানুষরা কলমের পাশাপাশি কোদালও ধরতে জানে, এটা দেখে গর্ব হয়। আমরা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই সবুজ উদ্যোগের পাশে আছি।”

আদালত প্রাঙ্গনে নিজে হাতে চারা বসিয়ে জ্যেষ্ঠ উপ-নিবন্ধক রাজীব কান্তি দাস বলেন, “আইন-কানুনের কাগজের পাশাপাশি আজ মাটি ছুঁলাম। খুব ভালো লাগছে। এই গাছগুলো শুধু অক্সিজেন দেবে না, আগামী প্রজন্মকে শিক্ষা দেবে — প্রকৃতিকে ভালোবাসতে হয়। বিচারালয়ের আঙিনা সবুজ হলে মনও শান্ত থাকে।”

উপ-নিবন্ধক যুগল সিংহও এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, “আদালত প্রাঙ্গনে লাগানো এই গাছগুলো আগামী দিনে ন্যায়ের ছায়া হয়ে দাঁড়াবে।”

অনুষ্ঠানে বিশেষ ভাবে সহযোগিতা করেন দূরদর্শন কেন্দ্রের কর্মী এবং অভিনেতা বলরাম দে। চারা সংগ্রহ থেকে শুরু করে গর্ত খোঁড়া, জল দেওয়া — সব কাজে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।

সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়, দুই মাসব্যাপী বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক অনুষ্ঠান ও ১ জুলাই কলকাতা থেকে বিশ্ববঙ্গের ১২ জন শিল্পীকে নিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে। পরিবেশ দিবসের মধ্য দিয়ে সেই কর্মসূচির সূচনা হলো। গত বছরও সংস্থা প্রয়াত চার সদস্যের স্মৃতির উদ্দেশে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল।

অনুষ্ঠান শেষে সংস্থা সিদ্ধান্ত নেয়, আজ লাগানো প্রতিটি গাছের দায়িত্ব নেবেন সংস্থার সদস্যরা। নিয়মিত জল দেওয়া, পরিচর্যা করা — সবই করবেন তাঁরা। কারণ গাছ লাগানোই শেষ কথা নয়, গাছ বাঁচিয়ে রাখাই আসল সেবা। গাছ বাঁচলে মানুষ বাঁচবে।

কর্মসূচি সফল করতে কাছাড় বন বিভাগ ও দূরদর্শন কেন্দ্র অগ্রণী ভূমিকা নেওয়ায় সংস্থা তাদের আন্তরিক ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানিয়েছে।

এই বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন সংস্থার সমন্বয়ক অনুপম দে। কর্মসূচির শেষে তিনি সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বলেন, “আজ আমরা শুধু গাছ লাগালাম না, একটা দায়িত্ব নিলাম। প্রতিটি চার পেছনে আমাদের ভালোবাসা থাকবে, পরিচর্যা থাকবে। পরিবেশ বাঁচলে আমরাই বাঁচব। এই বার্তা শহরের প্রতিটি ঘরে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।”

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *