বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন: ১৯৬১ সালের রক্তাক্ত ১৯ মে-র ৬৫তম বর্ষপূর্তি এবার গভীর শ্রদ্ধা ও আবেগে পালন করতে চলেছে বরাক উপত্যকা। ভাষা শহিদদের স্মরণে শিলচরে আয়োজিত হচ্ছে ঐতিহাসিক ‘উনিশের মহামিছিল, ভাষা শহিদদের শ্রদ্ধাঞ্জলি’। মিছিলের ডাক দিয়েছেন আহ্বায়ক সুব্রত ভট্টাচার্য।
মহামিছিলের সময় ও পথ
আগামী ১৯ মে, ২০২৬, মঙ্গলবার সকাল ৭টায় শিলচর ভাষা শহিদ স্টেশনের সামনে জমায়েত শুরু হবে। সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে মহামিছিলের আনুষ্ঠানিক পথচলা শুরু হবে। মিছিল গিয়ে শেষ হবে শিলচর শ্মশান ঘাটে। সেখানে ভাষা শহিদ স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন, প্রদীপ প্রজ্বালন ও এক মিনিট নীরবতা পালনের মাধ্যমে শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হবে।
আহ্বায়কের আবেদন
আহ্বায়ক সুব্রত ভট্টাচার্য এক বিবৃতিতে বলেন, “১৯৬১ সালের ১৯ মে আমাদের ইতিহাসে এক গৌরবময় অথচ বেদনাবিধুর অধ্যায়। প্রিয় মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষার জন্য সেদিন কমলা ভট্টাচার্য সহ ১১ জন ভাষা সেনানী পুলিশের গুলিতে প্রাণ উৎসর্গ করেছিলেন। তাঁদের সেই আত্মত্যাগ বরাকের রক্তে মিশে আছে। বর্তমান প্রজন্মের কাছে এই ইতিহাস পৌঁছে দেওয়া এবং ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা জাগ্রত করাই আমাদের সকলের দায়িত্ব।”
তিনি স্পষ্ট করেন, “এটি সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচি। ভাষার জন্য আত্মবলিদানকারী শহিদদের প্রতি বরাকবাসীর সম্মিলিত শ্রদ্ধাঞ্জলি। তাই কোনও দলীয় পতাকা নয়, নিজ নিজ সংগঠন, প্রতিষ্ঠান, ক্লাব ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যানার নিয়ে সকলকে মিছিলে সামিল হওয়ার অনুরোধ করছি। আপনাদের উপস্থিতিই হবে শহিদদের প্রতি প্রকৃত সম্মান।”
কাদের আহ্বান জানানো হয়েছে
বরাক উপত্যকার সকল সাংস্কৃতিক সংগঠন, ক্রীড়া সংগঠন, সামাজিক সংগঠন, ক্লাব, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, ছাত্র-যুব সংগঠন, বিভিন্ন ভাষিক ও জনগোষ্ঠী সংগঠন এবং সর্বস্তরের নাগরিকবৃন্দকে মহামিছিলে অংশ নিতে আন্তরিক আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশেষ করে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের মিছিলে যোগ দিয়ে ইতিহাসকে জানার জন্য আবেদন করা হয়েছে।
কেন ১৯ মে এত গুরুত্বপূর্ণ
১৯৬০ সালে অসম সরকার অসমিয়াকে রাজ্যের একমাত্র সরকারি ভাষা ঘোষণা করলে বরাক উপত্যকায় তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়। বাংলাভাষী অধ্যুষিত কাছাড় জেলায় বাংলাকে অন্যতম সরকারি ভাষার মর্যাদা দেওয়ার দাবিতে গড়ে ওঠে গণআন্দোলন। ১৯৬১ সালের ১৯ মে শিলচর রেল স্টেশনে সত্যাগ্রহ চলাকালে পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর গুলিতে শহিদ হন ১১ জন। তাঁরা হলেন: কমলা ভট্টাচার্য, শচীন্দ্র চন্দ্র পাল, বীরেন্দ্র সূত্রধর, কানাইলাল নিয়োগী, চণ্ডীচরণ সূত্রধর, সত্যেন্দ্র কুমার দেব, কুমুদরঞ্জন দাস, তরণী দেবনাথ, হিতেশ বিশ্বাস, সুনীল সরকার ও সুকোমল পুরকায়স্থ। এরপরই অসম সরকার বরাক উপত্যকায় বাংলাকে দ্বিতীয় সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। এই আন্দোলন বিশ্বের ইতিহাসে ভাষার জন্য আত্মত্যাগের অন্যতম উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
প্রস্তুতি তুঙ্গে
মহামিছিলকে সফল করতে ইতিমধ্যে বিভিন্ন উপ-কমিটি গঠন করা হয়েছে। পোস্টার, ব্যানার ও মাইকিংয়ের মাধ্যমে প্রচার চলছে। শিলচর পুরসভা, জেলা প্রশাসন ও পুলিশ বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। স্বেচ্ছাসেবকরা মিছিলের শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকবেন।
নতুন প্রজন্মের কাছে বার্তা
আয়োজকদের বক্তব্য, শুধু স্মরণসভা নয়, উনিশের চেতনাকে ধারণ করাই আসল শ্রদ্ধাঞ্জলি। বিশ্বায়নের যুগে নিজের ভাষা, সংস্কৃতি ও ইতিহাস বিস্মৃত হলে অস্তিত্ব সংকটে পড়তে হয়। তাই ১৯ মে-র তাৎপর্য নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতেই এই মহামিছিল। শহরের বিশিষ্ট নাগরিক, শিক্ষাবিদ ও ভাষা সংগ্রামীরাও মিছিলে পা মেলাবেন বলে জানা গেছে।
১৯ মে সকালে শহিদ স্টেশন চত্বর থেকে শ্মশান ঘাট পর্যন্ত জনস্রোতই বলে দেবে, উনিশের চেতনা বরাকে আজও অম্লান।












