শিলচরে সারাদিনব্যাপী অনুষ্ঠান, প্রকাশিত হল ‘মাতৃভাষা’ সাময়িকী
‘শহিদ স্বীকৃতি নেই, অর্থ বরাদ্দ সত্ত্বেও স্মারক হয়নি’: সভাপতি সুনীল রায়
বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন: প্রতি বছরের মতো এবারও যথাযোগ্য মর্যাদায় ভাষা শহিদ দিবস তথা মাতৃভাষা সুরক্ষা দিবস পালন করল বরাক উপত্যকা মাতৃভাষা সুরক্ষা সমিতি, কাছাড় জেলা। মঙ্গলবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শিলচরের বিভিন্ন স্থানে সারাদিনব্যাপী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ১৯৬১ সালের ১৯ মে-র ভাষা শহিদদের স্মরণ করা হয়।
সকাল থেকে শ্রদ্ধাঞ্জলি
সমিতির সদস্যরা সকাল ৭টায় শিলচর রেলস্টেশনে ভাষা শহিদ স্মারকে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর শিলচর শ্মশানঘাটে দ্বাদশ ভাষা শহিদদের শহিদবেদিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করা হয়।

কৃষ্ণচূড়া মঞ্চে দিনভর অনুষ্ঠান
সকাল ১১টা থেকে শিলচর গান্ধীবাগ সংলগ্ন অস্থায়ী কৃষ্ণচূড়া মঞ্চে মূল অনুষ্ঠান শুরু হয়। অস্থায়ী শহিদবেদিতে পুষ্পস্তবক ও প্রদীপ প্রজ্বালনের মাধ্যমে সূচনা করেন ডা: কুমার কান্তি দাশ, কবি অতীন দাশ, সাংবাদিক হারান দে, মিহিরলাল রায়, অঞ্জু এন্দো, হোসাইন আহমেদ লস্কর, সভাপতি সুনীল রায়, জয়ন্তী দত্ত, আব্দুর রহমান লস্কর, সাধারণ সম্পাদক সানি ভট্টাচার্য্য সহ বিশিষ্টজনেরা। সমবেত কণ্ঠে সঙ্গীত পরিবেশন করেন সদস্যরা।
প্রকাশিত হল ‘মাতৃভাষা’ সাময়িকী
অনুষ্ঠানে সমিতির ৩৮তম সংখ্যা সাহিত্য সাময়িকী ‘মাতৃভাষা’ প্রকাশিত হয়। একইসঙ্গে উন্মোচিত হয় কবি জয়ন্তী দত্তের বই ‘রক্তে লেখা উনিশে মে’ এবং কবি স্বাগতা চক্রবর্তী সম্পাদিত ‘কল্পতরু’।
‘একমাত্র সমিতিই সারা বছর লড়ছে’: অতীন দাশ
বিশিষ্ট কবি অতীন দাশ বলেন, “বছরে একটা দিন শহিদ স্মরণ অর্থহীন হয়ে যায় যদি ভাষিক ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া হয়। একমাত্র মাতৃভাষা সুরক্ষা সমিতিই সারা বছর নিরলস চেষ্টা করে যাচ্ছে।” মাতৃভাষা সুরক্ষায় অভিভাবকদের দায়বদ্ধতার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
‘শহিদ স্বীকৃতি আজও মেলেনি’
সমিতির কাছাড় জেলা সভাপতি সুনীল রায় তাঁর বক্তব্যে আসাম তথা ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে বাঙালিদের প্রতি ঘৃণা, বৈষম্য ও শারীরিক-মানসিক অত্যাচারে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “আসামে প্রায় ৩০% মানুষের মাতৃভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও তা রাজ্যভাষার মর্যাদা পায়নি। রাজ্যে অন্য ভাষিক গোষ্ঠীর শহিদদের পরিবারকে আর্থিক সম্মাননা দেওয়া হলেও বরাক উপত্যকার ভাষা শহিদদের পরিবার বা আহতদের আজও কিছু দেওয়া হয়নি।” তিনি আরও জানান, “রাজ্য বিধানসভায় ২৬ মার্চ ২০১৮ তারিখে লিখিত বিবৃতিতে ১৪ জন ভাষা শহিদের নাম উল্লেখ করা সত্ত্বেও তাঁদের পরিবারকে ন্যূনতম আর্থিক সম্মাননা দিয়ে শহিদ স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল শিলচরে ভাষা শহিদ স্মারক গড়ার প্রতিশ্রুতি ও অর্থ বরাদ্দ করলেও তা হয়নি। ২০১৬ সালে কেন্দ্র সরকার শিলচর রেলস্টেশনের নাম ‘ভাষা শহিদ স্টেশন শিলচর’ করার নির্দেশ দিলেও দশ বছরেও রাজ্য সরকার গেজেট নোটিফিকেশন জারি করেনি।” সুনীল রায় মণিপুরী ভাষাকে কাছাড়, শ্রীভূমি, হাইলাকান্দি ও জোজাই জেলায় অতিরিক্ত সরকারি ভাষার মর্যাদা দেওয়ার জন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানান। একইসঙ্গে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী সহ অন্য ভাষিক সংখ্যালঘুদের দাবিকে সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দেন।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মুখর গান্ধীবাগ
অনুষ্ঠানে সমবেত সংগীত পরিবেশন করেন মহাশ্বেতা পাল, পিঙ্কি পাল, বনানী চৌধুরী, সুতপা দে, সুমিতা ভট্টাচার্য সহ অন্যান্য শিল্পীরা। একক সংগীতে ছিলেন দীপায়ন রায়, প্রাপ্তি দাস, শান্তি কুমার ভট্টাচার্য, শিশু শিল্পী সোমরাজ মজুমদার ও উদ্দীপনা ক্লাবের শিল্পীরা। আবৃত্তি করেন শৈলেন দাস, শিবানী গুপ্ত, জয়ন্তী দত্ত, সানি ভট্টাচার্য, মিতা দাস পুরকায়স্থ প্রমুখ। দেশাত্মবোধক সঙ্গীতের সঙ্গে নৃত্য পরিবেশন করেন পল্লবী পাল, পৌলমী পাল, দেবাহুতি দাশগুপ্ত ও পূজা সূত্রধর।
পথনাটকে ফুটে উঠল বাঙালির করুণ দশা
মাতৃভাষা সুরক্ষা সমিতির মঞ্চের সামনে কোরাসের শিল্পীরা পথনাটক পরিবেশন করেন। নাটকে আসাম সহ সমগ্র ভারতে বাঙালিদের প্রতি বৈষম্য ও ঘৃণামূলক ব্যবহারের করুণ দশা তুলে ধরে উপস্থিত সকলকে আবেগাপ্লুত করেন। অনুষ্ঠানে শিলিগুড়ি থেকে আগত দর্শক, ১৯৬১-র ভাষা আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে আহত হিরন্ময় মিত্র, অধ্যাপক বিশ্বতোষ চৌধুরী সহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানের সাফল্যে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন কার্যকরী কমিটির সদস্য জয় বরদিয়া। দুপুর ২-৩৫ মিনিটে গান্ধীবাগের মূল শহিদবেদিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ এবং সন্ধ্যায় প্রদীপ প্রজ্জ্বোলনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হয়। এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানিয়েছেন সুতপা দে।












