,

বিশ্ব সঙ্গীত দিবসে সুরমল্লারের হৃদয়ছোঁয়া সঙ্গীত সন্ধ্যা, কালিকা প্রসাদের স্মৃতি সুরে মুখরিত হল শিলচর

কালিকা প্রসাদ স্মৃতি সম্মাননায় সম্মানিত হলেন আকাশবাণীর হিতব্রত ভট্টাচার্য, সাংস্কৃতিক সংগঠক ভাস্কর দাস, বিপ্লব দেবনাথ ও অজয় রায় বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন:  গানই মানুষের আত্মার ভাষা, গানই সর্বশ্রেষ্ঠ সাধনা। সঙ্গীতের মাঝেই ঘটে ঈশ্বর দর্শন, সঙ্গীতই পারে মুছে দিতে জাতপাত ধর্ম বর্ণের বিভেদ বিদ্বেষ হিংসার সমস্ত দেয়াল। সঙ্গীতের এক সুরেই বাঁধা থাকে মানবিক সম্প্রীতি, সংহতি ও ভালোবাসার অটুট…

কালিকা প্রসাদ স্মৃতি সম্মাননায় সম্মানিত হলেন আকাশবাণীর হিতব্রত ভট্টাচার্য, সাংস্কৃতিক সংগঠক ভাস্কর দাস, বিপ্লব দেবনাথ ও অজয় রায়
বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন:  গানই মানুষের আত্মার ভাষা, গানই সর্বশ্রেষ্ঠ সাধনা। সঙ্গীতের মাঝেই ঘটে ঈশ্বর দর্শন, সঙ্গীতই পারে মুছে দিতে জাতপাত ধর্ম বর্ণের বিভেদ বিদ্বেষ হিংসার সমস্ত দেয়াল। সঙ্গীতের এক সুরেই বাঁধা থাকে মানবিক সম্প্রীতি, সংহতি ও ভালোবাসার অটুট বন্ধন। বিশ্ব সঙ্গীত দিবসের এই চিরন্তন বার্তাকে সামনে রেখে গত ২১ জুন শিলচর শহরের সুভাষ নগর অরবিন্দ রোডের শ্যামানন্দ আবাসনে অবস্থিত সুরমল্লার মিউজিক ইনস্টিটিউটের স্থায়ী কার্যালয়ে আয়োজিত হল এক স্মরণীয় সঙ্গীত সন্ধ্যা। শহরের প্রবীণ ও অন্যতম বিশিষ্ট শিল্পী, সুরমল্লারের প্রতিষ্ঠাতা সচিব শান্তি কুমার ভট্টাচার্যের নব নির্মিত এই প্রাঙ্গণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে কালিকা প্রসাদের প্রতিকৃতির সামনে প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করে অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা করেন আকাশবাণী শিলচর কেন্দ্রের বিশিষ্ট কর্মকর্তা ও অনুষ্ঠানের মুখ্য অতিথি হিতব্রত ভট্টাচার্য। প্রদীপের শিখায় আলোকিত হওয়ার সঙ্গে সুরমল্লারের শিক্ষার্থী ও শিল্পীরা সমবেত কণ্ঠে পরিবেশন করেন কালিকা প্রসাদের সুরে কথায় রচিত অমর গান “আমি তোমারই তোমারই গান গাই”। কালিকার গানে গানে মুখরিত হয়ে ওঠে গোটা পরিবেশ, স্মৃতি আর সুরের মেলবন্ধনে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েন উপস্থিত সকলে। মুখ্য অতিথির ভাষণে হিতব্রত ভট্টাচার্য আবেগঘন কণ্ঠে বলেন কালিকা প্রসাদ ছিলেন নিছক গায়ক নন, তিনি ছিলেন এক জীবন্ত কিংবদন্তি। গান ছিল তার নিঃশ্বাস প্রশ্বাস, তার ধ্যান জ্ঞান। তিনি নিজে গান লিখতেন, নিজে সুর দিতেন, আবার নিজেই সেই গানকে বরাকের মাটির গন্ধ মাখিয়ে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতেন। ঢোল, মন্দিরা, খোল, দোতারা , বাঁশি সহ বরাকের বহু লুপ্তপ্রায় লোক বাদ্যযন্ত্রকে তিনি নতুন করে বাঁচিয়ে তুলেছিলেন। বরাক উপত্যকার মাটির গান, লোকগান, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়াকে তিনি নিয়ে গিয়েছিলেন দেশ বিদেশের বড় বড় মঞ্চে। তার হাত ধরেই বরাকের সংস্কৃতি পেয়েছিল আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। তিনি শুধু একজন লোক শিল্পী ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সৎ, আদর্শবান, ভালো মনের মানুষ, যার হৃদয়ে ছিল গরিব মানুষের জন্য অফুরন্ত মমতা। বিশ্ব সঙ্গীত দিবসের তাৎপর্য ও সঙ্গীতের সামাজিক ভূমিকা নিয়ে গভীর আলোচনা করেন বিশিষ্ট নৃত্য শিল্পী দেবতোষ নাথ। তিনি বলেন আজকের দিনে যখন মানুষ যন্ত্রের কাছে বন্দি, তখন সঙ্গীতই পারে মানুষকে মানুষের কাছাকাছি আনতে। সুরের শক্তিই পারে সমাজকে সুস্থ সুন্দর পথ দেখাতে। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন সাংস্কৃতিক সংগঠক এবং বিশিষ্ট তবলা শিল্পী সন্তোষ চন্দ, ভাস্কর দাস ও বিপ্লব দেবনাথ। সন্তোষ চন্দ বলেন, আজ বিশ্ব সঙ্গীত দিবসে আমরা সবাই মিলে একটি শপথ নিই। বরাক উপত্যকার প্রতিটি শিল্পী যেন ভাইয়ের মতো হাত ধরে থাকি। ভেদাভেদ ভুলে এক সুরে গান গাই, এক তালে সংস্কৃতির পথে এগিয়ে যাই। শিলচর ছোট শহর ঠিকই, কিন্তু আমাদের মন বড়, আমাদের সুর বড়। এখানে দলাদলি নয়, থাকুক একতা। থাকুক সহযোগিতা, থাকুক পারস্পরিক শ্রদ্ধা। সবার সুর মিলিয়েই তো বরাকের নাম বিশ্ব দরবারে পৌঁছে দিতে হবে।আজকের দিন সার্থক হবে তখনই, যখন আমরা এক হয়ে সঙ্গীতের আলো ছড়িয়ে দেব চারদিকে। কালিকা প্রসাদের আদর্শ ও সুরমল্লারের নিরলস সাংস্কৃতিক সাধনার ভূয়সী প্রশংসা করেন বক্তারা। কালিকা প্রসাদের দেখানো পথ ধরেই বরাকের লোকসংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার আহ্বান জানান তারা। অনুষ্ঠানের মর্মস্পর্শী মুহূর্ত ছিল কালিকা প্রসাদ স্মৃতি সম্মাননা প্রদান পর্ব।


বরাকের লোকসংস্কৃতি চর্চা, সংরক্ষণ ও সামাজিক কাজে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এই সম্মাননা তুলে দেওয়া হয় চার বিশিষ্টজনের হাতে। আকাশবাণী শিলচরের কর্মকর্তা ও গুণী শিল্পী হিতব্রত ভট্টাচার্য, দীর্ঘদিন ধরে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ভাস্কর দাস, বিপ্লব দেবনাথ এবং অজয় রায়ের হাতে উত্তরীয়, স্মারক ও মানপত্র তুলে দেন অতিথিরা। সম্মাননা গ্রহণ করে প্রত্যেকেই কালিকার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানান এবং সুরমল্লারের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানান। অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্ব জুড়ে ছিল নিবেদিত সঙ্গীতানুষ্ঠান, যা ছিল এক কথায় অনবদ্য। কালিকার গানকে শ্রদ্ধা জানিয়ে একের পর এক মন ভরানো গান পরিবেশন করেন ভাস্কর দাস, দেবাশীষ চৌধুরী, সুরমল্লার সভানেত্রী সুকৃতি ভট্টাচার্য, শরবাণী চক্রবর্তী, শ্যামা ভট্টাচার্য, রমা চৌধুরী, শিবানী দাস গুপ্ত, অনামিকা পাল, দেবাঞ্জলী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দেবনাথ এবং কালিকার ছোট বোন ইন্দ্রাণী ভট্টাচার্য। তাদের কণ্ঠে উঠে আসে বরাকের মাটির গন্ধ, নদীর বুকের বেদনা, গ্রামের মানুষের সুখ দুঃখের কথা। প্রতিটি গানই যেন শ্রোতাদের নিয়ে যায় বরাকের সেই চেনা মাটির পথে। বিশিষ্ট লোক শিল্পী মঙ্গল নাথ ও মনোমিতা গোস্বামী বিভিন্ন পর্যায়ের লোকগান পরিবেশন করে আসরকে জমিয়ে তোলেন। তাদের গানে ধরা পড়ে হারিয়ে যেতে বসা বরাকের লোকায়ত সুর ও ছন্দ। নৃত্য পরিবেশনে মুগ্ধতার জোয়ার বইয়ে দেন বিশিষ্ট নৃত্য শিল্পী সৌমিত্র শংকর চৌধুরী জয়।
তার একক নৃত্য অনুষ্ঠানে লোকনৃত্যের ছন্দ ও আধুনিক ভাবনার মেলবন্ধন দর্শকদের দীর্ঘক্ষণ মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে। শিল্পীদের প্রতিটি গানের সঙ্গে যন্ত্রানুসঙ্গে সহযোগিতা করেন সন্তোষ চন্দ, ভাস্কর দাস, অনামিকা পাল ও শুভঙ্কর পাল। তাদের সুনিপুণ বাদনে প্রতিটি গানই পেয়ে যায় পূর্ণতা ও প্রাণ। সুরমল্লারের ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের পরিবেশনাও ছিল বিশেষভাবে প্রশংসনীয়।
তাদের কণ্ঠে কালিকার গান শুনে বোঝা যায় কালিকার সুরের ধারা বয়ে চলেছে নতুন প্রজন্মের মধ্যেও। অনুষ্ঠানে শহরের বিশিষ্ট শিল্পী, শিক্ষক, সংস্কৃতি কর্মী, সাহিত্যিক ও রসিক শ্রোতাদের উপস্থিতি সন্ধ্যাকে করে তোলে প্রাণবন্ত ও উৎসবমুখর।
সকলেই একবাক্যে স্বীকার করেন এই আয়োজন শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়, এটি কালিকা প্রসাদের প্রতি বরাকবাসীর ভালোবাসার নিবেদন। অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে সুরমল্লার সচিব শান্তি কুমার ভট্টাচার্য উপস্থিত সকল শিল্পী, অতিথি, দর্শক ও সহযোগীদের ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন কালিকা প্রসাদ আমাদের শিখিয়েছেন গান দিয়ে মানুষকে ভালোবাসতে। সুরমল্লার তার দেখানো পথ ধরেই বরাকের লোকসংস্কৃতি চর্চা, শিক্ষা ও প্রচারের কাজ করে যাবে। আগামী দিনেও সকলের সহযোগিতা ও ভালোবাসা কামনা করেন তিনি।শেষ গানের সুর মিলিয়ে, স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বিশ্ব সঙ্গীত দিবসের এই হৃদয়ছোঁয়া সন্ধ্যার সমাপ্তি ঘটে। সুর থেকে যায়, থেকে যায় কালিকার গান, থেকে যায় মানুষের ভালোবাসা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *