,

বিরোধীদের প্রতিবাদ, ধরনার মধ্যেই অসম বিধানসভায় পাস হলো ইউসিসি বিল: উপজাতিরা আইনের বাইরে, মৌলিক অধিকার বিতর্ক অমীমাংসিত

বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন: বিরোধীদের প্রবল প্রতিবাদ, আপত্তি ও ধরনার মধ্যে দিয়ে বুধবার অসম বিধানসভায় গৃহীত হলো ঐতিহাসিক অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কিংবা ইউসিসি বিল। প্রচণ্ড হুলুস্থুলের মধ্যেই বিরোধীদের আনা সব সংশোধনী খারিজ করে ধ্বনিভোটে বিল পাসের কথা ঘোষণা করেন অধ্যক্ষ। সরকারের দাবি, এর ফলে সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং লিঙ্গ সমতা আনার ক্ষেত্রে এক ধাপ এগিয়ে গেল অসম।…

বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন: বিরোধীদের প্রবল প্রতিবাদ, আপত্তি ও ধরনার মধ্যে দিয়ে বুধবার অসম বিধানসভায় গৃহীত হলো ঐতিহাসিক অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কিংবা ইউসিসি বিল। প্রচণ্ড হুলুস্থুলের মধ্যেই বিরোধীদের আনা সব সংশোধনী খারিজ করে ধ্বনিভোটে বিল পাসের কথা ঘোষণা করেন অধ্যক্ষ। সরকারের দাবি, এর ফলে সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং লিঙ্গ সমতা আনার ক্ষেত্রে এক ধাপ এগিয়ে গেল অসম।

বিল পেশ থেকে পাস: বিরোধীদের লাগাতার আপত্তি
গোড়া থেকেই ইউসিসি বিলের বিরোধিতা করে আসছেন বিরোধী বিধায়করা। সোমবার বিধানসভায় বিল পেশের সময়ও আপত্তি জানানো হয়। বুধবার ছিল ইউসিসি বিল নিয়ে আলোচনা। সেখানেও কংগ্রেস বিধায়করা বিভিন্ন যুক্তি দেখিয়ে বিলের বিরোধিতা করেন।

বারবার প্রশ্ন আসে, বাল্যবিবাহ থেকে বহুবিবাহ, তিন তালাক প্রতিরোধে কড়া আইন রয়েছে। তারপরও কেন প্রয়োজন হচ্ছে ইউসিসির? শরিয়ত আইনে বিয়ে থেকে শুরু করে বিচ্ছেদে মুসলিমদের যে সব অধিকার দেওয়া হয়েছে, তাতে হস্তক্ষেপ করার অভিযোগও আসে।

রাজ্যে বসবাসকারী সব নাগরিকের জন্য বিয়ে, বিবাহ বিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার এবং লিভ-ইন সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি অভিন্ন আইনি কাঠামো তৈরির কথা সরকার বললেও কংগ্রেস বিধায়করা ধর্ম পালনে সংবিধান স্বীকৃত অধিকারে হস্তক্ষেপের অভিযোগ আনেন। বলা হয়, ইউসিসি হচ্ছে আরএসএস-বিজেপির রাজনৈতিক এজেন্ডা।

বিরোধী দলনেতার অভিযোগ: ভয়ের পরিবেশ আসবে
বিরোধী দলনেতা ওয়াজেদ আলি চৌধুরী বলেন, “সংবিধানের ২৫ নং অনুচ্ছেদে ধর্ম পালনের অধিকার দিয়েছে। সেখানে ডিরেক্টিভ প্রিন্সিপলে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ইউসিসি। অসমের মতো বহুভাষিক, বহুজাতিক রাজ্যে সবার উপর ইউসিসি চাপিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। এটা সামাজিক সংহতির পক্ষে ক্ষতিকারক হবে। ভয়-ভীতির পরিবেশ আসবে রাজ্যে।” তিনি প্রশ্ন তোলেন, “বাল্যবিবাহ থেকে বহুবিবাহ প্রতিরোধে আইন রয়েছে রাজ্যে। বিয়ে-বিচ্ছেদের পঞ্জিয়ন বাধ্যতামূলক করেও রয়েছে আইন। তাহলে ইউসিসির প্রয়োজন পড়ছে কোথায়?”

উপজাতিদের বাদ দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন
কংগ্রেস বিধায়ক জাকির হুসেন দাবি করেন, “কোনও আলোচনা না করে সরকার কেন এই বিল আনল? সংশ্লিষ্ট সবপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে বিল আনা উচিত। বিলের শিরোনামও বদলের দাবি করেন তিনি, কারণ, উপজাতিদের বাদ দেওয়া হয়েছে এর আওতা থেকে। তাই ইউনিফর্ম হয়নি বিধি।”

মুখ্যমন্ত্রীকে টার্গেট করে তিনি বলেন, “মুখ্যমন্ত্রী মহিলাদের সমান অধিকার দেওয়ার কথা বলেন। কিন্তু উপজাতি সমাজের মহিলাদের কেন সমান অধিকার দিতে চান না? সমঅধিকার থেকে কেন বঞ্চিত করা হচ্ছে তাদের?”

মৌলিক অধিকার বনাম ডিরেক্টিভ প্রিন্সিপল: অমীমাংসিত বিতর্ক
বিরোধী সংখ্যালঘু বিধায়করা বারবার মৌলিক অধিকার খর্ব করার কথা বলেছেন। মুজিবুর রহমান সুপ্রিম কোর্টের রায়ের উদ্ধৃতি দিয়ে দাবি করেন, “মৌলিক অধিকার কখনই খর্ব করা যায় না ডিরেক্টিভ প্রিন্সিপল কার্যকরী করার নামে। ইউসিসি প্রবর্তন মুসলিমদের সংবিধান প্রদত্ত অধিকার খর্ব করছে সরকার। তাই উপজাতিদের মতো মুসলিমদেরও ইউসিসির বাইরে রাখার দাবি করেন তিনি।”

তৃণমূল কংগ্রেস বিধায়ক শেরমান আলি আহমেদ দাবি করেন, “ইসলামেও বহুবিবাহের অনুমতি নেই। দুই, তিন, চারটি বিয়ের অনুমতি রয়েছে। কিন্তু প্রত্যেক পত্নীর সঙ্গে ন্যায় করতে না পারলে এক বিয়েতেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে।” তিনি বলেন, “মৌলিক অধিকার হচ্ছে ন্যায়সঙ্গত, কিন্তু ডিরেক্টিভ প্রিন্সিপল কখনই ন্যায়সঙ্গত নয়।”

সংবিধানের ২৫, ২৬ এবং ২৭ নং অনুচ্ছেদে দেশের প্রত্যেক নাগরিককে নিজেদের ধর্ম পালন, প্রচার-প্রসার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান স্থাপন করার অধিকার দেওয়া হয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি প্রণয়ন করে ধর্মপালনের অধিকারে হস্তক্ষেপ করছে সরকার।

লিভ-ইন নিয়ে আপত্তি অখিল গগৈর
রাইজর দলের বিধায়ক অখিল গগৈ লিভ-ইন রিলেশন নিয়ে ইউসিসিতে থাকা বিধানের বিরোধিতা করেন। তাঁর দাবি, “কারও ব্যক্তিগত সম্পর্কে হস্তক্ষেপ করতে চাইছে সরকার। সম্পর্কে জড়ালে শুধু পঞ্জিয়নই নয়, থানায় জানাতে হবে। তখন হেনস্তা, মরাল পুলিশিঙের ভয় থাকবে। সংবিধান প্রদত্ত ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে। মানুষের গোপনীয়তায় আক্রমণ করছে সরকার।” মুখ্যমন্ত্রীকে আক্রমণ করে তিনি বলেন, “আসলে ইউসিসি করে দেশে রেকর্ড করতে চাইছেন মুখ্যমন্ত্রী। মোদিকে খুশি করতে চাইছেন।”

মুখ্যমন্ত্রীর জবাব: সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশেই ইউসিসি
বিরোধীদের সব অভিযোগ খণ্ডন করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, “সংবিধানের ৪৪ নং অনুচ্ছেদে ডিরেক্টিভ প্রিন্সিপল অব স্টেট পলিসির অধীনে রয়েছে অভিন্ন দেওয়ানি বিধির কথা। উপযুক্ত সময় এলে ইউসিসি গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। সেটাই ইউসিসি প্রণয়নের ভিত।”

তিনি আরও বলেন, “১৯৮৫ সালের শাহবানু মামলাসহ আরও কয়েকটি মামলায় সুপ্রিম কোর্ট বারবার সামাজিক ন্যায়ের জন্য অভিন্ন দেওয়ানি বিধি প্রণয়নের কথা বলেছে। সরকারের দিকে বল ঠেলেছে শীর্ষ আদালত। কিন্তু কংগ্রেসের কার্যকালে চালু করা হয়নি।”

উপজাতিদের বাইরে রাখার ব্যাখ্যা
উপজাতি সমাজকে ইউসিসির আওতার বাইরে রাখা প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “উপজাতিদের কাস্টমারি প্রথা রয়েছে, যা তাদের জীবন পরিচালনা করে। উপজাতি সমাজ কখনই বহুবিবাহকে স্বীকৃতি দেয় না, মেয়েদের সমান অধিকার দেয়, লিভ-ইনকে স্বীকৃতি দেয় না। ফলে এক ধরনের ইউসিসির প্রতিফলন আগে থেকেই রয়েছে উপজাতিদের মধ্যে। কাস্টমারি আইন, কাস্টমারি কোর্ট রয়েছে তাদের। উপজাতিদের কাছ থেকে শেখার রয়েছে আমাদের। উপজাতিদের মতো হিন্দু-মুসলমানরা মহিলাদের সমান অধিকার দিলে ইউসিসির প্রয়োজন নেই।”

ইউসিসিতে কী থাকছে
মুখ্যমন্ত্রী জানান, “বহুবিবাহ, বিবাহ বিচ্ছেদ নিয়ন্ত্রণ করা, উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তি লাভের পরম্পরা নিয়ন্ত্রণ করা, লিভ-ইন রিলেশনকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টাও রয়েছে, যাতে সকলে সমান অধিকার পান।”

তিনি বলেন, “ইউসিসি বাল্যবিবাহকে স্বীকৃতি দেবে না। বিয়ের ন্যূনতম বয়স নির্ধারণ করা হয়েছে ছেলেদের ২১, মেয়েদের ১৮। এই আইনের ফলে ধর্ম নির্বিশেষে একবার বিয়েতেই সম্মতি দেওয়া হয়েছে। বিয়ে, বিচ্ছেদের পঞ্জিয়ন করা বাধ্যতামূলক। স্বামী কিংবা পত্নীর জীবিত সঙ্গী থাকলে বিয়ে করা যাবে না। তবে বিয়ের ধর্মীয় রীতিনীতিকে বাধা দেওয়া হয়নি। বৈদিক বিবাহ, আহোম চাকলং, সপ্তপদী, আশীর্বাদ, নিকাহ, হোলি ইউনিয়ন এবং আনন্দ কারজের মতো প্রচলিত যে কোনও ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিতে বিয়ে সম্পন্ন করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।”

সম্পত্তির অধিকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “কেউ মারা গেলে তাঁর সম্পত্তির সমান ভাগ পাবেন পত্নী, সন্তান এবং জীবিত বাবা-মা। ফলে মহিলারা সুরক্ষার কবচ পেয়েছেন।”

লিভ-ইন প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “সুপ্রিম কোর্ট লিভ-ইন রিলেশনকে বিয়ের সমপর্যায়ের স্বীকৃতি দিয়েছে। তাই এটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। লিভ-ইনে সন্তানের জন্ম হলে দায়িত্ব কে নেবে? তাই রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। প্রতারিত হলে আদালতের মাধ্যমে খোরপোষ দাবি করতে পারবে মেয়েটি। একুশ বছরের কম বয়স হলে বাবা-মাকেও জানানো হবে।”

বিজেপি-আরএসএসের এজেন্ডা? মুখ্যমন্ত্রীর গর্ব
ইউসিসিকে বিজেপি-আরএসএসের এজেন্ডা বলায় আপত্তি নেই মুখ্যমন্ত্রীর। তিনি বলেন, “বিজেপি-আরএসএস ইউসিসির মতো সামাজিক বিপ্লবের প্রেরণা দেয় আমাদের। বিজেপি-আরএসএস না হলে ইউসিসি কখনই আনা হতো না।”

তিনি দাবি করেন, “১৯২৫ সাল থেকে দেশে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালুর কাজ চলছে, যখন বিজেপি, আরএসএসের জন্মই হয়নি। কংগ্রেসের অধিবেশনের মঞ্চ থেকে প্রথম ইউসিসির দাবি ওঠে। ১৯৩৭ সালে নেহরু কমিটির সুপারিশেও ছিল ইউসিসির কথা। সংবিধান সভায় কংগ্রেসের প্রতিনিধিরা ইউসিসির পক্ষে কথা বলেছেন।”

সিলেক্ট কমিটির দাবি খারিজ, ধ্বনিভোটে পাস
মুখ্যমন্ত্রীর দীর্ঘ ভাষণের পর সরকার বিল পাসে উদ্যত হলে সিলেক্ট কমিটিতে পাঠানোর জোরালো দাবি ওঠে। কিন্তু বিজেপির অঙ্গীকারের কথা মনে করিয়ে সেই আর্জি খারিজ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তখন অধ্যক্ষের আসনের সামনে ওয়েলে নেমে প্রতিবাদ শুরু করেন বিরোধী বিধায়করা। “সিলেক্ট কমিটি চাই” বলে তীব্র চিৎকারও করা হয়।

কংগ্রেস বিধায়করা বিলে সংশোধনী এনে দাবি করেন, পত্নী দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হলে, মানসিকভাবে অক্ষম হলে, কাজকর্ম করতে অক্ষম হলে দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি দিতে হবে। কংগ্রেসের একমাত্র মহিলা বিধায়ক বেবি বেগমও সেই সংশোধনীর পক্ষে বক্তব্য রাখেন। মুখ্যমন্ত্রী চড়া সুরে আক্রমণ করে বলেন, “এক মহিলা বিধায়ক একথা বললে, এর চেয়ে অমানবিক আর কী হতে পারে?”

শেষ পর্যন্ত বিরোধীদের আনা সব সংশোধনী খারিজ করে ধ্বনিভোটে বিধানসভায় বিল পাস হওয়ার কথা ঘোষণা করেন অধ্যক্ষ।

উত্তরাখণ্ড, গুজরাটের পর অসম
উত্তরাখণ্ড, গুজরাটের পর অসম তৃতীয় রাজ্য হিসেবে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি গ্রহণ করল। তবে মৌলিক অধিকার খর্ব করে ডিরেক্টিভ প্রিন্সিপলের অধীনে আইন প্রণয়ন করা যায় কি না, সেই প্রশ্নের জবাব মিলেনি। অমীমাংসিত থেকেছে সেই বিতর্ক।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *