নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা: ভারতে ও পশ্চিমবঙ্গে বাংলা ভাষা ও বাঙালির অধিকার রক্ষার দাবিতে নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে ১৬ দফা দাবিপত্র পেশ করল সর্বভারতীয় বাংলা ভাষা মঞ্চ।
গত ৯ মে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন শুভেন্দু অধিকারী। মন্ত্রিসভার সেই সূচনাকালেই মঞ্চের কেন্দ্রীয় সম্পাদক, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন জয়েন্ট রেজিস্ট্রার ও দেশের কিংবদন্তী বাংলা ভাষা সংগঠক নীতীশ বিশ্বাস এবং মঞ্চের প্রবীণ সভাপতি ক্যাপ্টেন ডা. দিলীপকুমার সিনহা, প্রাক্তন অধ্যক্ষ, বিহার বাংলা একাডেমি, পাটনা, এক যৌথ প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানান যে তাঁরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে এই দাবিপত্র প্রেরণ করেছেন।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, কিছু দাবি রাজ্য সরকার নিজেই সমাধান করতে পারবেন। আর কিছু দাবি মুখ্যমন্ত্রীর সহৃদয় হস্তক্ষেপে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে আদায় করতে হবে।
মঞ্চের ১৬ দফা দাবি:
১. বাংলা স্কুল বাঁচাও: রাজ্যের ৮৫০০ বন্ধ হয়ে যাওয়া বাংলা মাধ্যম স্কুল অবিলম্বে খুলতে হবে। পরিকাঠামো উন্নত করে দিল্লি ও কেরলের মতো সরকারি স্কুলে ছাত্র টানতে শিক্ষার বাজেট বাড়াতে হবে।
২. চাকরিতে বাংলা বাধ্যতামূলক: রাজ্যের সব সরকারি, আধা-সরকারি ও বেসরকারি চাকরিতে, এমনকি এরাজ্যের কেন্দ্রীয় সরকারের অফিস, ব্যাঙ্ক, পোস্ট অফিস, ইনস্যুরেন্সে চাকরিপ্রার্থীর বাংলা ভাষায় সার্টিফিকেট থাকতে হবে ও বাংলা লিখতে-পড়তে -বলতে জানা বাধ্যতামূলক করতে হবে। পাহাড়ে নেপালি প্রযোজ্য।
৩. সব স্কুলে বাংলা পড়ানো: ২০২৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বরগৃহীত আইন অনুযায়ী ইংরেজি, হিন্দি, উর্দু সহ সব মাধ্যমের স্কুলে একটি পেপার বাংলা আবশ্যিক করতে হবে।
৪. ভাষা গণতন্ত্র: পশ্চিমবঙ্গের অবাঙালিরা যেমন সুযোগ পান ভারতের সব রাজ্যে বাংলাভাষীরা যেন সম-অধিকার পান। সারা দেশে বাংলা ভাষা ও বাঙালির নিজস্ব ধর্ম-সংস্কৃতি রক্ষায় মুখ্যমন্ত্রীকে সচেষ্ট হতে হবে।
৫. বাংলা ভাষা মন্ত্রক: ওড়িশার মতো রাজ্যে বাংলা ভাষা ও বঙ্গ সংস্কৃতির উন্নয়নের জন্য পৃথক বাজেট সহ মন্ত্রী নিয়োগ করতে হবে।
৬. WBCS-এ বাংলা: পশ্চিমবঙ্গ সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় অন্যান্য রাজ্যের মতো বাংলা আবশ্যিক রাখতে হবে। বাতিল করা যাবে না।
৭. বাঙালি নির্যাতন বন্ধ: অন্য রাজ্যে বাংলাভাষী মানেই বাংলাদেশি বলা বন্ধ করতে হবে। কেন্দ্রের সঙ্গে সংলাপ করে গরিব শ্রমিকদের নির্যাতন ও উদ্বাস্তু বাঙালিদের উচ্ছেদ বন্ধ করতে হবে।
৮. বেঙ্গল রেজিমেন্ট: সামরিক বাহিনীতে বেঙ্গল রেজিমেন্ট আবার চালু করতে হবে। দক্ষিণ ভারতীয়দের মতো বাঙালির জন্য দৈহিক মাপ নির্ধারণ করতে হবে।
৯. SSC ও IAS পরীক্ষা: স্টাফ সিলেকশন কমিশনের CGL এবং IAS প্রিলিমিনারি পরীক্ষা বাংলায় নিতে হবে।
১০. NRC ও ডি-ভোটার: আসামসহ পূর্বাঞ্চলে এনআরসি ও ডি-ভোটারের নামে বাঙালি উদ্বাস্তুদের নির্যাতন বন্ধ করতে হবে। তিনসুকিয়া ও ডুমডুমায় বাঙালি হত্যাকারীদের শাস্তির উদ্যোগ নিতে হবে।
১১. CBSE স্কুলে বাংলা: CBSE-র ২০২৩ সালের সার্কুলার অনুযায়ী দেশের সব কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়, নবোদয় বিদ্যালয় ও বেসরকারি স্কুলে বাঙালি ছাত্রদের জন্য বাংলা আবশ্যিক করতে হবে।
১২. প্রশাসনে বাংলা: রাজ্যের অভ্যন্তরীণ সব সরকারি কাজ, বিজ্ঞাপন ও জনসংযোগে প্রধানত বাংলা ব্যবহার করতে হবে। *বাংলাকে জীবনের সর্বক্ষেত্রে কাজের ভাষা করতে হবে।*
১৩. সাইনবোর্ডে বাংলা: রাস্তাঘাট, যানবাহন, দোকান, অফিস, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইনবোর্ডে প্রথমে বড় হরফে বাংলা রাখতে হবে। রাজ্যের কেন্দ্রীয় সরকারি দপ্তরেও এই নিয়ম মানতে হবে।
১৪. বাংলার গৌরব: হিন্দি রাষ্ট্রভাষা নয়। সংবিধানের ৮ম তালিকার ২২টি ভাষাই জাতীয় ভাষা। বাংলা ভাষা ভারতে ও বিশ্বে তার গৌরব ফিরে পাক, রাজ্য সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে।
১৫. অন্য রাজ্যে বাংলা: ঝাড়খণ্ড ও আন্দামানে প্রশাসনিক কাজে হিন্দি-ইংরেজির সঙ্গে বাংলাও চালু করতে হবে। রাজ্যে রাজ্যে বিশেষ করে বাঙালি উদ্বাস্তু অঞ্চলে বাংলা পঠনপাঠনের উন্নতি ও বাংলা পাঠ্যবইয়ের সমস্যা মেটাতে হবে।
১৬. মনীষীদের রচনা অনুবাদ: রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্র, শরৎচন্দ্র, নজরুল,বিবেকানন্দ, পি সি রায়, মেঘনাদ সাহা, জগদীশচন্দ্র, সুভাষচন্দ্রের নির্বাচিত রচনাবলী এবং চৈতন্য চরিতামৃত, রামকৃষ্ণ কথামৃত, শ্রী শ্রী হরিলীলা মৃত ও শ্রী শ্রী গুরুচাঁদ চরিত ইংরেজি-হিন্দি সহ ভারতীয় ভাষায় উন্নত অনুবাদ ও প্রকাশের ব্যবস্থা করতে হবে।
মঞ্চ জানিয়েছে, ভারতের মতো দেশে *রাজ্যের ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার প্রধান দায়িত্ব রাজ্যের হাতেই থাকে*। তাই এই দাবিগুলি মুখ্যমন্ত্রীর কাছেই পেশ করা হল। তাঁদের আশা, মুখ্যমন্ত্রী দ্রুত দাবিগুলি কার্যকর করবেন এবং অপূর্ণ দাবি নিয়ে ভবিষ্যতে পরিকল্পনা নেবেন।












