পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে শপথের পর শিলিগুড়ির ট্রাফিক, জল, চাকরি-সহ ৫ অগ্রাধিকারের কথা জানালেন তিনি
বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন,কলকাতা: শঙ্কর ঘোষের মন্ত্রী হওয়ার খবরে আবেগে ভাসছে সাংস্কৃতিক মহল। শিলচর ইয়ুথ কয়্যারের সাধারণ সম্পাদক সন্তোষ চন্দ বলেন, “শঙ্করদা শুধু একজন রাজনীতিবিদ নন, তিনি একজন সাংস্কৃতিক মনস্ক মানুষ। শিলিগুড়ি আলোট্রাস্ট আয়োজিত ১৯ মে (শিলচর বাংলা ভাষা আন্দোলনের ১১ জন শহিদ দিবস) অনুষ্ঠানে ওনার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। সেদিন দীর্ঘক্ষণ সাংস্কৃতিক মত বিনিময় হয়েছিল আমাদের। শিলচরের মাটি, বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলনের কথা, শিলিগুড়ির সংস্কৃতি—সবকিছু নিয়ে অত্যন্ত আন্তরিকভাবে কথা বলেছিলেন তিনি। সেদিনই বুঝেছিলাম, এই মানুষটা শুধু উন্নয়নের কথা ভাবেন না, মাটি ও সংস্কৃতিকেও সমান গুরুত্ব দেন। ওনার মন্ত্রী হওয়ার খবরে আমরা আবেগে আপ্লুত। শিলিগুড়ির পাশাপাশি বরাক উপত্যকার সাংস্কৃতিক মানুষদেরও আশা—শঙ্করদার হাত ধরে দুই বাংলার সংস্কৃতি আরও কাছাকাছি আসবে।”
সংস্কার ভারতীর দক্ষিণ আসাম প্রান্তের সম্পাদক বিশ্বতোষ দেব বলেন, “শঙ্কর ঘোষের নেতৃত্বে শিলিগুড়ি সহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের কাজ এগিয়ে যাবে বলে আমরা আশাবাদী। সীমান্তবর্তী শহর শিলিগুড়ি সাংস্কৃতিক সেতু হিসেবে কাজ করবে, এই বিশ্বাস আমাদের আছে।”
আলো ট্রাস্টের চেয়ারম্যান কমলকৃষ্ণ কুইলা জানান, “শঙ্করবাবু একজন প্রগতিশীল চিন্তার মানুষ। ১৯ মে-র অনুষ্ঠানে ওনার সঙ্গে আলাপের পর থেকেই মনে হয়েছে, রাজনীতির পাশাপাশি সংস্কৃতির বিকাশেও তিনি সমানভাবে আগ্রহী। ওনার নেতৃত্বে শিলিগুড়ি থেকে সারা ভারতে সাংস্কৃতিক যোগাযোগ আরও মজবুত হবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।”

‘মাটির ছেলে’ শঙ্কর ঘোষের ওপর ভরসা
সাংস্কৃতিক মহলের এই শুভেচ্ছার মধ্যেই সোমবার পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন শিলিগুড়ির ‘মাটির ছেলে’ শঙ্কর ঘোষ। ২০২১-এর পর ২০২৬-এ টানা দু’বার রেকর্ড মার্জিনে জিতে তিনি প্রমাণ করেছেন, মানুষের বিশ্বাস অর্জন করতে গেলে শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, নিষ্ঠা ও কর্মদক্ষতা লাগে। কাউন্সিলর থেকে বিধায়ক, বিরোধী দলের মুখ্য সচেতক থেকে আজ পূর্ণমন্ত্রী—প্রতিটি ধাপে নিজের কাজ দিয়ে পরিচয় গড়েছেন তিনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শঙ্কর ঘোষের মতো মাটির সঙ্গে যুক্ত, সাংস্কৃতিক মনস্ক এবং জনসংযোগে দক্ষ নেতা পাওয়া উত্তরবঙ্গের কাছে এক বড় প্রাপ্তি। সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের কথা যিনি নিজের করে বোঝেন, সেই শঙ্কর ঘোষের হাতেই এবার শিলিগুড়ির ভবিষ্যৎ। তবে কোন দফতরের দায়িত্ব পাচ্ছেন, তা এখনও সরকারিভাবে ঘোষণা করা হয়নি।

শপথের পর শঙ্কর ঘোষ বলেন, “মন্ত্রী আমি হইনি, মন্ত্রী হয়েছেন যে মানুষরা আমাদের ওপর প্রত্যাশা রেখে সরকার গড়ার সুযোগ দিয়েছিলেন, জনাদেশ দিয়েছিলেন। মন্ত্রী তাঁরাই হয়েছেন। আমাদের মূল কাজ হল মানুষের প্রত্যাশাগুলো বাস্তবের মাটিতে নামিয়ে আনা। বিজেপির যে সংকল্পপত্র অমিত শাহ মহাশয় প্রকাশ করেছিলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মহাশয়ের বিকশিত ভারত-বিকশিত পশ্চিমবঙ্গের স্বপ্ন—তা বাস্তবের মাটিতে নামিয়ে আনাই লক্ষ্য। মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী মহাশয় ও রাজ্য সভাপতি শমিক ভট্টাচার্যের নির্দেশিত পথেই আমরা কাজ করব।”

শিলিগুড়ির ঘরের ছেলে শঙ্কর ঘোষ বলেন, “আমি উত্তরের ছেলে। ওখানকার জল ও হাওয়ায় আমি বেড়ে উঠেছি। তাই উত্তরবঙ্গের মাটি ও শিলিগুড়ি, যে শহর আমাকে বড় করেছে—সেখানকার মানুষদের নিয়ে আমার অবশ্যই ভাবনা চিন্তা রয়েছে। এই মুহূর্তে উত্তরবঙ্গে উন্নয়ন দফতরের মন্ত্রী আছেন নিশীথ প্রামাণিক মহাশয়। আমি আমার ভাবনা-চিন্তা নিঃসন্দেহে তাঁর সঙ্গে আলোচনা করব।”
তিনি আরও বলেন, “শিলিগুড়ি শহরের কিছু নির্দিষ্ট সমস্যা রয়েছে। ট্রাফিক জ্যামের সমস্যা, পানীয় জলের সমস্যা, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার সমস্যা। কলোনি অঞ্চলের আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষদের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কাজ করতে চাই। এছাড়া নারী সুরক্ষা, চাকরির সুযোগ তৈরি করা, আইনশৃঙ্খলা—এই বিষয়গুলোর ওপর কাজ করব। আমাদের উত্তরবঙ্গের আড়াই কোটি ও উত্তর-পূর্ব ভারতের সাড়ে চার কোটি, এই সাত কোটি মানুষের প্রত্যাশা পূরণের কেন্দ্র হিসেবে শিলিগুড়ি শহরকে গড়ে তোলা হবে। ডাবল ইঞ্জিন সরকারের যে স্বাদ, সেই স্বাদ শিলিগুড়ি সহ পশ্চিমবঙ্গের মানুষও পাবেন।”

শপথের পর শঙ্কর ঘোষ বলেন, “কৃতজ্ঞতা জানাই প্রতিটি মানুষকে, যাঁদের ভালোবাসা, বিশ্বাস এবং আশীর্বাদ আমাকে পথ চলার শক্তি দিয়েছে। নতুন দায়িত্ব মানুষের জন্য, উন্নয়নের জন্য, পশ্চিমবঙ্গের জন্য। আপনাদের বিশ্বাসের মর্যাদা রক্ষা করতে সর্বদা নিবেদিত থাকব আমি।”
২০২১ সালের পর ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনেও বিপুল ভোটে শিলিগুড়ি কেন্দ্র থেকে জিতেছেন বিজেপি প্রার্থী শঙ্কর ঘোষ। প্রত্যাশামতোই তিনি পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন সোমবার। শিলিগুড়ি রামকৃষ্ণ মোড়ে ঢাক-ঢোল বাজিয়ে উল্লাসে মাতলেন দলীয় সমর্থকরা। দলীয় কর্মীদের দাবি, এই প্রথম উত্তরবঙ্গের বঞ্চনা মিটল।
২০১৬ সালে সিপিআই(এম)-এর প্রার্থী হিসেবে শিলিগুড়ি পুরনিগমের ২৪ নম্বর ওয়ার্ড থেকে প্রথমবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। এরপর মেয়র পরিষদের সদস্য ও করোনাকালে প্রশাসক মণ্ডলীর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব সামলান। দার্জিলিংয়ের সাংসদ রাজু বিস্তার সংস্পর্শে এসে বাম শিবির ছেড়ে ভারতীয় জনতা পার্টিতে যোগ দেন। ২০২১-এ অশোক ভট্টাচার্যকে প্রায় ৩৫ হাজার ভোটে, ২০২৬-এ গৌতম দেবকে প্রায় ৭৫ হাজার ভোটে হারিয়ে বিধায়ক হন। বিধানসভায় বিরোধী দলের মুখ্য সচেতক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।













