,

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম: শিকল ভাঙার গান থেকে মানবতার জয়গান

বরাককণ্ঠ ডেস্ক প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৬ আজ ১১ জ্যৈষ্ঠ। ১৮৯৯ সালের এই দিনে বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে জন্ম নিয়েছিলেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পুরুষ কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি শুধু কবি নন, একাধারে গীতিকার, সুরকার, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, সাংবাদিক, সৈনিক ও রাজনৈতিক কর্মী। দ্রোহ আর প্রেমের এমন সমন্বয় বিশ্বসাহিত্যেই বিরল। দুখু মিয়া থেকে বিদ্রোহী কবি…

বরাককণ্ঠ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৬

আজ ১১ জ্যৈষ্ঠ। ১৮৯৯ সালের এই দিনে বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে জন্ম নিয়েছিলেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পুরুষ কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি শুধু কবি নন, একাধারে গীতিকার, সুরকার, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, সাংবাদিক, সৈনিক ও রাজনৈতিক কর্মী। দ্রোহ আর প্রেমের এমন সমন্বয় বিশ্বসাহিত্যেই বিরল।

দুখু মিয়া থেকে বিদ্রোহী কবি
পিতা কাজী ফকির আহমদ ছিলেন স্থানীয় মসজিদের ইমাম। ১৯০৮ সালে পিতৃবিয়োগের পর ৯ বছরের নজরুলের জীবনযুদ্ধ শুরু। পেটের দায়ে মক্তবের শিক্ষক, মুয়াজ্জিন, রুটির দোকানের কর্মচারী, লেটো দলের ওস্তাদ সবই করেছেন। গ্রামবাসী তখন আদর করে ডাকত ‘দুখু মিয়া’।

দশ বছর বয়সে ‘চাপাতির জয়’ পালা লিখে তিনি চমকে দেন সবাইকে। সিয়ারসোল রাজস্কুলে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েন। ১৯১৭ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামা বাজলে দশম শ্রেণির ছাত্র নজরুল পড়াশোনা ছেড়ে ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগ দেন। হাবিলদার পদে করাচি সেনানিবাসে থাকাকালে ফারসি কবি হাফিজ, রুমি, ওমর খৈয়ামের সঙ্গে পরিচয় ঘটে। সেখানেই প্রথম গল্প ‘বাউন্ডুলের আত্মকাহিনী’ ও প্রথম কবিতা ‘মুক্তি’ লেখেন।

কলম যখন অস্ত্র
১৯২০ সালে সৈনিক জীবন শেষে কলকাতায় এসে ‘বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতি’র অফিসে থাকতে শুরু করেন। ‘মোসলেম ভারত’, ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’, ‘উপাসনা’ পত্রিকায় লিখতে থাকেন।

১৯২১ সালের ডিসেম্বরে ‘বিজলী’ পত্রিকায় ‘বিদ্রোহী’ কবিতা প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং বলেছিলেন, ‘কাজী নজরুল ইসলামের “বিদ্রোহী” কবিতাটি পড়ে আমি মুগ্ধ হয়েছি’।

‘আমি চির-বিদ্রোহী বীর, আমি বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির-উন্নত শির।’

১৯২২ সালে প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অগ্নিবীণা’ ব্রিটিশ সরকার বাজেয়াপ্ত করে। ওই বছরই নিজের সম্পাদনায় সাপ্তাহিক ‘ধূমকেতু’ পত্রিকা বের করেন। প্রথম সংখ্যায় রবীন্দ্রনাথের আশীর্বাণী ছাপা হয়। পত্রিকার মলাটে বড় করে লেখা থাকত ‘পূর্ণ স্বাধীনতা’। ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতা লেখার অপরাধে ১ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়। হুগলি জেলে ৩৯ দিন অনশন করেন। সেখানেই রচনা করেন ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’।

সাম্য ও মানবতার দর্শন
নজরুলের বিদ্রোহ কেবল পরাধীনতার বিরুদ্ধে নয়। তিনি লড়েছেন সাম্প্রদায়িকতা, নারী নির্যাতন, শ্রেণি বৈষম্যের বিরুদ্ধে। ‘সাম্যবাদী’ কাব্যগ্রন্থে ঘোষণা করেন: ‘গাহি সাম্যের গান, যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান’।

হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার সময় লেখেন ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’: ‘হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন জন? কাণ্ডারী! বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার’। আবার লিখেছেন, ‘মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান। মুসলিম তার নয়ন-মণি, হিন্দু তাহার প্রাণ’।

নারী জাগরণের পক্ষে তাঁর কণ্ঠ ছিল সবচেয়ে সোচ্চার। ‘নারী’ কবিতায় লেখেন: ‘বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর’। ‘বারাঙ্গনা’ কবিতায় পতিতাদের মানুষের মর্যাদা দিয়েছেন।

নজরুলগীতি: ৪ হাজারের মহাসমুদ্র
নজরুল একাই একটি প্রতিষ্ঠান। প্রায় ৪ হাজার গান লিখেছেন ও অধিকাংশের সুর করেছেন। এই গানগুলোই ‘নজরুলগীতি’। শাস্ত্রীয় সংগীত, কীর্তন, শ্যামাসংগীত, ইসলামি গান, গজল, কাব্যগীতি, রাগপ্রধান, ঠুমরি, লোকসুর, সব ধারায় তিনি সিদ্ধহস্ত।

তিনি বাংলা গজলের জনক। ‘বাগিচায় বুলবুলি তুই’, ‘এত জল ও কাজল চোখে’, ‘নিশীথে যাইও ফুলবনে’ গজলগুলো আজও অমর।

৫০০-এর বেশি শ্যামাসংগীত লিখেছেন। ‘শ্যামা মা কি আমার কালো রে’, ‘বল রে জবা বল’ গেয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন, ধর্ম নয়, মনই আসল। ইসলামি গানে তিনি এক নতুন ধারা তৈরি করেন। ‘ত্রিভুবনের প্রিয় মুহাম্মদ এলো রে দুনিয়ায়’, ‘তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে’, ‘খোদার প্রেমের শরাব পিয়ে’ গানগুলো উপমহাদেশের মুসলমানের ঘরে ঘরে বাজে।

‘চল চল চল, ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল’ গানটি বাংলাদেশের রণসংগীত। ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রাণী’, ‘আলগা করো গো খোঁপার বাঁধন’, ‘শাওন রাতে যদি’ প্রেমের গানগুলো চিরসবুজ।

সাহিত্যের সব শাখায় অবাধ বিচরণ
কাব্যগ্রন্থ: অগ্নিবীণা, বিষের বাঁশী, ভাঙার গান, সাম্যবাদী, সর্বহারা, সিন্ধু হিন্দোল, চক্রবাক, সন্ধ্যা, প্রলয়শিখা, ঝিঙেফুল।

উপন্যাস: বাঁধনহারা, মৃত্যুক্ষুধা, কুহেলিকা। ‘বাঁধনহারা’ বাংলা সাহিত্যের প্রথম পত্রোপন্যাস।

গল্পগ্রন্থ: ব্যথার দান, রিক্তের বেদন, শিউলিমালা। নাটক: ঝিলিমিলি, আলেয়া, পুতুলের বিয়ে। প্রাবন্ধিক হিসেবেও তিনি ক্ষুরধার। ‘রুদ্রমঙ্গল’, ‘যুগবাণী’ প্রবন্ধগ্রন্থ।

ব্যক্তিগত জীবনের ঝড়
১৯২১ সালে কুমিল্লার দৌলতপুরে নার্গিস আসার খানমের সঙ্গে বিয়ে ঠিক হয়। বাসর রাতে ঘরজামাই থাকার শর্ত মানতে না পেরে বিয়ে ভেঙে বেরিয়ে আসেন। সেই রাতেই লেখেন বিখ্যাত গান ‘যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পার নাই’।

১৯২৪ সালের ২৫ এপ্রিল হিন্দু ব্রাহ্মণ কন্যা প্রমীলা দেবীকে বিয়ে করেন। এই আন্তঃধর্ম বিয়ে নিয়ে তৎকালীন সমাজে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়। তাঁদের চার পুত্র: কৃষ্ণ মুহম্মদ, অরিন্দম খালেদ, কাজী সব্যসাচী ও কাজী অনিরুদ্ধ। প্রথম দুই পুত্র শৈশবেই মারা যায়। পুত্রশোকে কাতর কবি লেখেন ‘শূন্য এ বুকে পাখি মোর আয়’।

বাকরুদ্ধ ৩৪ বছর: এক মহাকাব্যিক ট্র্যাজেডি
১৯৪২ সালের ১০ জুলাই মাত্র ৪৩ বছর বয়সে নজরুল পিক্স ডিজিজ নামক দুরারোগ্য স্নায়ুরোগে আক্রান্ত হন। ধীরে ধীরে বাকশক্তি, স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেন। এরপর ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত ৩৪ বছর তিনি জীবিত ছিলেন, কিন্তু একটি কথাও বলতে পারেননি। লিখতে পারেননি একটি পঙক্তিও। বাংলা সাহিত্যের জন্য এর চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি আর নেই।

১৯৭২ সালের ২৪ মে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিশেষ উদ্যোগে ভারত সরকারের অনুমতি নিয়ে কবিকে সপরিবারে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। ‘ধূমকেতু’ নজরুলকে বাংলাদেশে স্বাগত জানায়। ১৯৭৬ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে নাগরিকত্ব প্রদান করে। ১৮ ফেব্রুয়ারি তিনি বাংলাদেশের নাগরিক হন।

মহাপ্রয়াণ ও শেষ ইচ্ছা
১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট ঢাকার পিজি হাসপাতালে ৭৭ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।

তিনি লিখেছিলেন: ‘মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই, যেন গোরে থেকেও মোয়াজ্জিনের আজান শুনতে পাই’। রাষ্ট্র তাঁর শেষ ইচ্ছা পূরণ করেছে।

অমর উত্তরাধিকার
১৯৪৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগত্তারিণী স্বর্ণপদক, ১৯৬০ সালে ভারত সরকারের পদ্মভূষণ, ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক ডি.লিট, ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ সরকারের একুশে পদক লাভ করেন।

বাংলাদেশ তাঁকে ১৯৭২ সালেই জাতীয় কবির মর্যাদা দেয়। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে আসানসোলে ‘কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়’ ও ‘নজরুল তীর্থ’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

আগামী ২৯ আগস্ট ২০২৬ তাঁর মৃত্যুর ৫০ বছর পূর্ণ হবে। অর্ধশতাব্দী পরেও নজরুল সমান প্রাসঙ্গিক। যতদিন পৃথিবীতে শোষণ থাকবে, সাম্প্রদায়িকতা থাকবে, নারীর অসম্মান থাকবে, ততদিন নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা মানুষকে পথ দেখাবে। যতদিন মানুষ ভালোবাসবে, ততদিন বাজবে নজরুলের প্রেমের গান।

বরাককণ্ঠ ডেস্ক কর্তৃক সংকলিত

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *