প্রদীপ প্রজ্জ্বলন, বন্দেমাতরম ও অসম সঙ্গীতে সূচনা, সাংসদ-বিধায়ক সহ বিশিষ্টজনদের উপস্থিতিতে জাতীয় সঙ্গীতে সমাপ্তি
বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন: বরাক উপত্যকার ভবিষ্যৎ উন্নয়নের রূপরেখা প্রণয়নে বিশিষ্ট নাগরিক, পেশাজীবী এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সক্রিয় অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে অসম সরকার। রবিবার কাছাড়ের অভিভাবক মন্ত্রী তথা বরাক ভ্যালি ডেভেলপমেন্ট বিভাগের মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু পাল আশ্বাস দিয়ে বলেন, জনসাধারণের গঠনমূলক পরামর্শ এই অঞ্চলের উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
বরাক ভ্যালি ডেভেলপমেন্ট বিভাগের উদ্যোগে শিলচরের কাছাড় ক্লাবে আয়োজিত উচ্চ পর্যায়ের নাগরিক মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু পাল। তিনি বলেন, মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্তবিশ্ব শর্মার নেতৃত্বে রাজ্য সরকার সমগ্র অসমে সুষম ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং সেই বৃহত্তর উন্নয়ন ভাবনায় বরাক উপত্যকা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে রয়েছে।
অনুষ্ঠানের সূচনা: সভার শুরুতে বন্দেমাতরম এবং অসম সঙ্গীত পরিবেশন করা হয়। এরপর মঞ্চে উপস্থিত অতিথিদের হাতে প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে আমন্ত্রিত প্রত্যেক নাগরিক, সাংবাদিক এবং অতিথিকে উত্তরীয় পরিয়ে সম্মান জানানো হয়।
উপস্থিত বিশিষ্টজন: এই গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ সভায় উপস্থিত ছিলেন খাদ্য, গণবণ্টন ও উপভোক্তা বিষয়ক, আবাসন ও নগর বিষয়ক এবং সমবায় দপ্তরের মন্ত্রী কৌশিক রায়, সাংসদ পরিমল শুক্লবৈদ্য, বিধায়ক ডা: রাজদীপ রায়, রাজদীপ গোয়ালা, কিশোর নাথ, কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থ, অমিয় কান্তি দাস, আমিনুল হক লস্কর, প্রাক্তন শিলচরের বিধায়ক দীপায়ন চক্রবর্তী, প্রাক্তন উদারবন্দের বিধায়ক মিহির কান্তি সোম, প্রাক্তন ধলাইর বিধায়ক নিহার রঞ্জন দাস, কাছাড় জেলা বিজেপির সভাপতি রূপম সাহা, এজিপি জেলা সভাপতি নাজমুল হক মজুমদার এবং বরাক উপত্যকা উন্নয়ন বিভাগের অতিরিক্ত সচিব আদিত্য বিক্রম যাদব সহ ঊর্ধ্বতন সরকারি আধিকারিক ও জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত বহু বিশিষ্ট নাগরিক।
খোলামেলা মতবিনিময় ও লিখিত প্রস্তাব: বুদ্ধিজীবী, অবসরপ্রাপ্ত প্রশাসনিক আধিকারিক, শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, গবেষক, সমাজকর্মী, চিকিৎসক, বিভিন্ন পেশাজীবী এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা এই উন্মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন। বিভিন্ন সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে মতবিনিময় করেন আইনজীবী দুলাল মিত্র, সুব্রত রায়, মঞ্জুল দেব, তৈমুর রাজা চৌধুরী, অংশুমান রায়, পদ্মশ্রী পুরস্কারপ্রাপ্ত বিশিষ্ট ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ ডা: রবি কান্নান, ডা: পি কে দাস, প্রাক্তন বিধায়ক দীপায়ন চক্রবর্তী, প্রদীপ বণিক, নিলয় পাল, সাংবাদিক অনিরুদ্ধ লস্কর, সঞ্জীব রায়, দেবাশিস সোম প্রমুখ।
এদিকে সন্তোষ চন্দ শিলচর ইয়ুথ কয়্যার এবং বরাককণ্ঠের পক্ষ থেকে লিখিত চারটি প্রস্তাব মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু পালের হাতে তুলে দেন। মূল্যবান বক্তব্য রাখেন সাংসদ পরিমল শুক্লবৈদ্য। তিনি বরাক উপত্যকার উন্নয়নে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন।

মাস্টার ড্রেনেজ ও পৌরনিগম ভোট: সভায় আবাসন ও নগর বিষয়ক বিভাগের অধীনে শিলচর শহরের জন্য গৃহীত সর্বাঙ্গীণ মাস্টার ড্রেনেজ প্রকল্প নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু পাল জানান, শিলচরকে জমা জলের সমস্যা থেকে স্থায়ীভাবে মুক্ত করাই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য এবং এটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
মন্ত্রী কৌশিক রায় বলেন, নগর বন্যা প্রতিরোধ বর্তমানে সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের বিষয়গুলির মধ্যে অন্যতম। প্রাকৃতিক নিকাশি ব্যবস্থা ও খালের উপর ব্যাপক দখলদারির ফলে শহরে জলাবদ্ধতা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। সেই কারণে নিকাশি ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের স্বার্থে দখলমুক্তকরণ অভিযান অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তিনি বলেন, “সময় লাগবে, তবে সমস্ত দখলদারি অবশ্যই উচ্ছেদ করা হবে।”
পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করে জানানো হয়, প্রস্তাবিত শিলচর পৌর নিগমের নির্বাচন দুর্গাপূজার আগেই অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ লক্ষ্যে ভোটার তালিকা প্রস্তুতের কাজ ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে।
পরিকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্প: মন্ত্রী কৌশিক রায় আরও জানান, প্রস্তাবিত শিলচর ফ্লাইওভারের নির্মাণকাজ খুব শীঘ্রই শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নির্মাণ শুরুর আগে গণপূর্ত বিভাগ মাটি পরীক্ষাসহ প্রাথমিক প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু করবে। এছাড়া যাতায়াত ব্যবস্থা এবং রোগীদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে বিরবল বাজার–শিলচর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল সড়কের সংস্কার কাজও খুব শীঘ্রই শুরু হবে।
মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু পাল বলেন, আত্মনির্ভর অসমসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে অসম ধীরে ধীরে উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার পথে এগিয়ে চলেছে। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনা (পিএমজিএসওয়াই)-এর অধীনে গ্রামীণ সড়ক সংযোগ সম্প্রসারণের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলেছে।
সোনবিল ও জল জীবন মিশন: মন্ত্রী সোনবিলের প্রস্তাবিত উন্নয়ন প্রকল্প সম্পর্কেও আলোকপাত করে বলেন, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে মাছ উৎপাদন বৃদ্ধি, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং স্থানীয় মানুষের নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি এটি গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে।
বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, জল জীবন মিশনের অধীনে ২০২৮ সালের মধ্যে প্রতিটি পরিবারে নিরাপদ পানীয় জল পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতিদিন প্রতি পরিবারকে ৫৫ লিটার বিশুদ্ধ পানীয় জল সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে সরকার কাজ করছে। তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ, পরিচ্ছন্নতা এবং জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নে স্বচ্ছ ভারত মিশনের গুরুত্ব এখনও সমানভাবে বজায় রয়েছে।

বিভাগের দায়িত্ব ও মুখ্যমন্ত্রীর ভিশন: মন্ত্রী কৌশিক রায় বলেন, বিভিন্ন সরকারি বিভাগের উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলির বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ ও সমন্বয়ের দায়িত্ব বরাক ভ্যালি ডেভেলপমেন্ট বিভাগকে অর্পণ করা হয়েছে, যাতে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পগুলি সম্পন্ন হয় এবং জনসেবা কার্যকরভাবে মানুষের কাছে পৌঁছায়।
মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু পাল বলেন, “আজকের সভায় বিশিষ্টজনদের মূল্যবান পরামর্শ ও গঠনমূলক সুপারিশ শোনার সৌভাগ্য হয়েছে। আমি সবাইকে আশ্বস্ত করছি, এই সুপারিশগুলি যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী ড.হিমন্তবিশ্ব শর্মার দূরদর্শী নেতৃত্বে অসম সরকার একটি উন্নত, আধুনিক ও সমৃদ্ধ রাজ্য গড়তে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই ভিশনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে আমরা নিশ্চিত করতে চাই যে, অসমের উন্নয়নের গল্পে বরাক উপত্যকা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।” বরাক ভ্যালি ডেভেলপমেন্ট বিভাগের দায়িত্ব অর্পণ করায় মুখ্যমন্ত্রীর প্রতি তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
সমাপ্তি: সভার শেষ পর্যায়ে মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু পাল উপস্থিত সকলকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। কাছাড় জেলা ও সমগ্র বরাক উপত্যকার টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জনকেন্দ্রিক উন্নয়নের জন্য সকলের অব্যাহত সহযোগিতা ও সম্মিলিত সমর্থনের আন্তরিক আবেদন জানান তিনি। এরপর জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।

অতিরিক্ত সচিব আদিত্য বিক্রম যাদব, আইএএস-এর তত্ত্বাবধানে বরাক ভ্যালি ডেভেলপমেন্ট বিভাগ এই কর্মসূচির আয়োজন করে। অংশগ্রহণকারীরা এই উদ্যোগকে নীতিনির্ধারক এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সরাসরি সংলাপের একটি ইতিবাচক ও গঠনমূলক মঞ্চ হিসেবে অভিহিত করেন।












