একষট্টির সত্যাগ্রহী সমর কুমার চন্দ
——————————————————–
‘কমলা ভট্টাচার্য ও শচীন্দ্র পালদের পাশেই আমরা দাঁড়িয়েছিলাম রেললাইনে, চোখের সামনে ঝরল তাজা রক্ত’
দেবাঞ্জন মুখোপাধ্যায়—
[এই সাক্ষাৎকারটি দেবাঞ্জন মুখোপাধ্যায় গ্রহণ করেন ২০১২ সালে, সমরকুমার চন্দের জীবিত অবস্থায়]
ষাটের ভাষা সংগ্রামে শ্যামাপ্রসাদ রোড নরসিংটলা এলাকায় নেতৃত্ব দিতেন পরাণ চক্রবর্তী, টুকু ব্যানার্জি, বাটু দাশগুপ্ত প্রমুখ।
রেল স্টেশনে পিকেটিং করতে হাতে হাত ধরে আমি, মনীন্দ্র ধর, শৈলেশ সেন সহ কানাইলাল নিয়োগী রেললাইনের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম (পরে কানাইলাল নিয়োগী একাদশ শহিদের একজন)
“১৯-এর আগে মাসখানেক আমরা নাওয়া-খাওয়া ভুলে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরতাম, অফিস-আদালত বন্ধ করতাম, পুলিশ ধরলেও ভয় পেতাম না” — সমর কুমার চন্দ।
১৯৬০ সালের ২৪ অক্টোবর ‘অসম ভাষা বিল’ আইনে রূপান্তরিত হয়। অসমিয়াকে রাজ্যের একমাত্র সরকারি ভাষা ঘোষণা করা হলে রাজ্যের সংখ্যালঘু ভাষিক গোষ্ঠী, বিশেষ করে বরাক উপত্যকার বাঙালিরা নিজেদের মাতৃভাষা, সংস্কৃতি ও অস্তিত্ব নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়ে। প্রতিবাদে বাংলাকে অসমের দ্বিতীয় সরকারি ভাষা করার দাবিতে গড়ে ওঠে ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন। এই আন্দোলনে বাঙালির পাশে দাঁড়ায় ডিমাছা, মণিপুরি, বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি-সহ বিভিন্ন ছোট ভাষিক জনগোষ্ঠী। বাম দলগুলিও একে গণতান্ত্রিক আন্দোলন হিসেবে সংগঠিত করতে এগিয়ে আসে।১৯৬১ সালের ১৯ মে শিলচর রেলস্টেশনে শান্তিপূর্ণ পিকেটিং চলাকালে পুলিশের গুলিতে শহিদ হন কমলা ভট্টাচার্য, শচীন্দ্র পাল, কানাইলাল নিয়োগী, চন্ডীচরণ সূত্রধর-সহ ১১ জন ভাষা সেনানী। তাঁদের আত্মবলিদানের মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত ভৌগোলিক এলাকাভিত্তিক ত্রিভাষা সূত্র স্বীকৃত হয়। বরাক উপত্যকা পায় বাংলাকে দ্বিতীয় সরকারি ভাষা হিসেবে ব্যবহারের অধিকার।
৫০ বছর পর স্মৃতির খোঁজে
ভাষা আন্দোলনের ৫০ পূর্তি উপলক্ষে ২০১২ সালে এক সকালে পৌঁছে যাই বরাককণ্ঠের স্বত্বাধিকারী ও সম্পাদক সন্তোষ চন্দের বাড়িতে। উদ্দেশ্য, তাঁর বাবা সমরকুমার চন্দের মুখে ১৯ মে-র প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা শোনা। শুনেছিলাম, এই মানুষটি এখনও ১৯ মে নিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। নিরালায় স্বজনের সঙ্গে বসে সেদিনের কথা বলেন, রক্তরাঙা দিনের স্মৃতি রোমন্থন করেন।২০১২ সালে সমরবাবুর বয়স তখন ৬৯ ছুঁই ছুঁই। অসুস্থ, শয্যাশায়ী। স্মৃতি কিছুটা ঝাপসা, কিন্তু আন্দোলনের উত্তাপ আজও তাঁর কণ্ঠে স্পষ্ট। শায়িত অবস্থাতেই বলতে শুরু করলেন সেই দিনগুলির কথা।
প্রস্তুতি পর্ব: নাওয়া-খাওয়া ভুলে সংগ্রাম
“১৯-এর প্রায় মাসখানেক আগে থেকেই আমরা ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম,” বললেন সমরবাবু। “বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালতে ঢুকে বন্ধ করে দিতাম। সকাল থেকে হাতে পতাকা নিয়ে স্লোগান দিতে দিতে রাস্তা, গলি, পাড়ায় পাড়ায় বেরিয়ে পড়তাম। মূল আন্দোলনের কেন্দ্রভূমি ছিল শিলচর কোর্ট প্রাঙ্গণ পরে শিলচর রেল স্টেশন। আমার দলে ছিল মনীন্দ্র ধর, শৈলেশ সেন সহ অনেকেই। আশ্চর্যের বিষয়, কোনও বাড়ি থেকেই বেরোতে নিষেধ ছিল না। আসলে আমরা এমন সংগ্রামী মনোভাবে তৈরি হয়েছিলাম যে নিষেধ মানতাম না।” তাঁর কণ্ঠে ক্ষোভ ঝরে পড়ল, “আজকের দিনে এসব ভাবাই যায় না। ৬১-এর মতো আন্দোলন হয়তো আবার আসবে বর্তমান পরিস্থিতিতে। আমরা সারাদিনের অভিযানে নাওয়া-খাওয়া ভুলে যেতাম। দলনেতারা পাউরুটি, কলা, বিস্কুট, চকোলেট খেতে দিতেন। আমাদের মাথায় শুধু পরবর্তী কর্মসূচির কথা খেলত।” পুলিশের সঙ্গে সম্পর্কের কথা বলতে গিয়ে হেসে বললেন, “লাগাতার অফিস বন্ধ করায় পুলিশ এসে ধরে নিয়ে যেত। থানায় ২-৩ ঘণ্টা রেখে আবার ছেড়ে দিত। কতবার জেলে গেছি, তার হিসেব নেই। তবে পুলিশ আমাদের নাম লিখত না, শুধু ভয় দেখাত। কোনও কোনও দিন আবার মজা করত, স্নেহ করত। তাই পুলিশ দেখে আমরা ভয় পেতাম না। আমরা সমবেত গলায় স্লোগান দিতাম— ‘নওজওয়ান নওজওয়ান বিশ্বে জেগেছে নওজওয়ান, একই প্রাণ কোটি প্রাণ একই শপথ গড়িয়ান’। প্ল্যাকার্ডে লেখা থাকত— ‘আমাদের মুক্তি স্বপ্নে সূর্যের রং লাগে, যৌবনেরই অভ্যুদয়ে হিমালয় জাগে’।”
সংগ্রামী অফিস আর গোপন বৈঠক
ষাটের দশকের নরসিংটলার বাসিন্দা সমরবাবু জানালেন, প্রত্যেক ওয়ার্ডে সংগ্রামী অফিস ছিল। “রাতে মোমবাতি-হারিকেন জ্বালিয়ে পরদিনের কার্যসূচি ঠিক হত। আমাদের নেতৃত্ব দিতেন পরাণ চক্রবর্তী, টুকু ব্যানার্জি, বাটু দাশগুপ্ত, করিমগঞ্জের রথীন সেন-সহ অনেকে। ভাষা সংগ্রামী পরিতোষ পাল চৌধুরীকে ধরতে পুলিশ হানা দিত। আমরা তখন মন্দির, আখড়ায় লুকিয়ে কাজ চালাতাম।” একটি বিশেষ ঘটনার কথা উঠতেই চোখ চকচক করে উঠল তাঁর। বললেন, “যেদিন বিমলা প্রসাদ চালিহার ফাঁসি ঘোষণা হয়, সেদিন ম্যাজিস্ট্রেটের চেয়ার দখল করে গোপা দত্তকে বসানো হয়েছিল। গোপা দত্তই ফাঁসির রায় দিয়েছিলেন। আদালত চত্বর সেদিন পুরোপুরি সংগ্রামী জনতার নিয়ন্ত্রণে ছিল।”
১৯ মে: রক্তে ভেজা রেললাইন
১৯ মে সকাল থেকেই শিলচর শহর ছিল থমথমে। নরসিংটলা থেকে সেন্ট্রাল রোড হয়ে আমরা রেল স্টেশনে যাই। পিকেটিং করতে “হাতে হাত ধরে আমি, মনীন্দ্র ধর, শৈলেশ সেন সহ কানাইলাল নিয়োগী রেললাইনের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম। (পরে কানাইলাল নিয়োগী একাদশ শহিদের একজন) আমাদের পাশেই কমলা-শচীন্দ্র চাদর পেতে লাইনের উপর বসেছিল।”
তিনি থেমে গেলেন কিছুক্ষণ। তারপর ধীরে বললেন, সেদিন “সব ঠিকঠাক ছিল। বড় কিছু ঘটবে, এমন পরিস্থিতি ছিল না ।উত্তেজনার পারদ এক জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু বেলা গড়াতেই হঠাৎ সেই অন্ধকার মুহূর্ত নেমে এল। গুলি চলল। আমার গা ঘেঁষে বন্দুকের গুলি গেল। আমি বেঁচে যাই। কিছু জীবনের প্রাণ-প্রদীপ নিভে গেল। এগারটি তাজা প্রাণ আত্মাহুতি দিল।” কণ্ঠ বুজে এল সমরবাবুর। বলেন,“আমরা সেই ঐতিহাসিক ঘটনার মর্মবেদনা বয়ে চলেছি। এখনও সবকিছু চোখের সামনে ভাসে। কিন্তু নতুন প্রজন্মের কাছে কীভাবে তুলে ধরব, বুঝি না।”
শহিদের শেষযাত্রা
১৯ মে সারারাত শিলচর সিভিল হাসপাতালে শহিদদের নিথর দেহের পাশে কেটেছে তাঁদের। ২০ মে কারফিউ উপেক্ষা করে বরাক উপত্যকাজুড়ে গণজাগরণে মিছিল বের হয়। শিলচরে হাজার হাজার শিশু-কিশোর, যুবক-যুবতী, আবালবৃদ্ধবনিতা শহিদদের নিয়ে শহর পরিক্রমা করে মহাশ্মশানে পঞ্চভূতে বিলীন করে দেয়।
আজকের বরাক ও একষট্টির প্রাসঙ্গিকতা
শেষ বয়সে এসে সমরকুমার চন্দের গলায় হতাশা ও প্রত্যয় একসঙ্গে। “ভাষা আন্দোলনের এত বছর পরেও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর বিপন্নতা কাটেনি, বরং চরিত্র বদলে ব্যাপক হয়েছে। ভাষিক অস্তিত্বের সংকট আজ নাগরিকের সার্বিক অস্তিত্বকে বিপন্ন করছে।” তিনি মনে করেন, “একষট্টির আন্দোলনের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাবকে আজকের অধিকার আন্দোলনে আমরা ব্যাপকতা দিতে পারিনি। কিন্তু প্রক্রিয়া থেমে নেই। মিডিয়া, সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে নতুন প্রজন্ম এই ইতিহাস জানছে। একদিন এই জানার নির্যাসই সময়োচিত আন্দোলনের প্রেরণা হবে। ভাষিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে হাতিয়ার হয়ে উঠবে।”
শয্যাশায়ী সত্যাগ্রহীর শেষ আকুতি, “একষট্টির শক্তি, সংহতি ও অঙ্গীকার নিয়ে বারবার আসুক উনিশ। বরাকের মাটি যেন শহিদের রক্তকে ভুলে না যায়।”












