✍️ দেবরাজ মাহাতো
ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক মানচিত্রের দিকে তাকালে আজ যে চিত্রটি বারবার ভেসে ওঠে, তা হলো তীব্র মেরুকরণ ও বিভাজন। আদর্শগত সংঘাত যখন ব্যক্তিগত আক্রমণ আর কাদা ছোড়াছুড়ির পর্যায়ে পৌঁছায় তখন গণতন্ত্রের প্রকৃত স্বরূপ ম্লান হয়ে পড়ে। একে অপরকে রাজনৈতিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার অশুভ প্রতিযোগিতা যখন সমকালীন রাজনীতির দস্তুর হয়ে দাঁড়িয়েছে, ঠিক সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়ে পশ্চিমবঙ্গের প্রান্তিক জেলা পুরুলিয়া এক বিরল ও অভূতপূর্ব আলোকবর্তিকা প্রদর্শন করল। উপলক্ষ্য ছিল ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম পুরোধা, মানভূমের মুক্তিদাতা ঋষি নিবারণচন্দ্র দাশগুপ্তের জন্ম সার্ধশতবর্ষ। বিগত এক বছর ধরে পুরুলিয়া জেলা জুড়ে যে সম্প্রীতির আবহ তৈরি হলো, তা প্রমাণ করল যে মহাপুরুষদের আদর্শ কোনো নির্দিষ্ট দলের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে না।
নিবারণচন্দ্র দাশগুপ্ত কেবল একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন ত্যাগী ঋষি। ১৮৭৬ সালের ২৫শে এপ্রিল (১২ই বৈশাখ ১২৮৩ বঙ্গাব্দ) অবিভক্ত বাংলার ঢাকা জেলার বিক্রমপুর পরগনার গাউপাডায় তাঁর জন্ম। তবে তাঁর কর্মভূমি হয়ে উঠেছিল রুক্ষ মাটির জেলা মানভূম (বর্তমান পুরুলিয়া)।
১৯১১ সালে তিনি বিদ্যালয় পরিদর্শক হিসেবে এই জেলায় আসেন এবং ১৯১৭ সালে পুরুলিয়া জেলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক নিযুক্ত হন। সে যুগে সরকারি চাকরি ও ‘সম্মানিক ম্যাজিস্ট্রেট’ পদের যে আভিজাত্য ছিল, দেশের ডাক এলে তিনি তা তুচ্ছ করতে দ্বিধা করেননি। ১৯২১ সালে মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনে সাড়া দিয়ে তিনি রাজকীয় পদমর্যাদা ত্যাগ করে সাধারণ মানুষের সারথি হন। তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘শিল্পাশ্রম’ এবং ‘তিলক জাতীয় বিদ্যালয়’। ১৯২৫ সালে তাঁর হাত ধরেই প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক ‘মুক্তি’ পত্রিকা। ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রাম থেকে শুরু করে পরবর্তীকালে মানভূমের ভাষা আন্দোলনে এই পত্রিকা এক শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল। মহাত্মা গান্ধী থেকে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু—জাতীয় স্তরের সমস্ত নেতৃত্ব তাঁকে পরম শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন। ২০২৫ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত এই উদযাপনের মূল কারিগর ছিল ‘ঋষি নিবারণ চন্দ্র জন্ম সার্ধশত উদযাপন কমিটি’। কমিটির কার্যকরী সভাপতি দীপক মাহাতো, সম্পাদক ড.প্রদীপ কুমার মণ্ডল এবং আহ্বায়ক অত্রি চৌধুরী এক অসাধ্য সাধন করেছেন। তাঁরা যুযুধান রাজনৈতিক দলগুলোকে এক মঞ্চে আনতে সক্ষম হয়েছেন। অনুষ্ঠান হয়েছে বান্দোয়ান ঋষি নিবারণ চন্দ্র বিদ্যাপীঠ, মাঝিহিড়া আশ্রম, ভূতাম নিবারণ চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়, স্বাধীনতা সংগ্রামী নীলকন্ঠ চট্টোপাধ্যায় এর বাড়ি, পুরুলিয়া জিলা স্কুল, টামনা বিদ্যাসাগর আবাসিক বালিকা বিদ্যালয় সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। মাঝিহিড়া আশ্রমে ১৪ ডিসেম্বর, ২০২৫ জন্ম সার্ধশত বর্ষ উদযাপন হয়। এই আশ্রমে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দেখা গিয়েছিল বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু এবং তৃণমূলের জেলা সভাপতি তথা বিধায়ক রাজীব লোচন সোরেনকে। একই মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন বিজেপি বিধায়ক সুদীপ মুখোপাধ্যায়, বিজেপি নেতা আব্দুল আলিম আনসারী এবং আরএসপি নেতা অত্রি চৌধুরী। রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে এটিই ছিল ঐক্যের প্রথম বড় বার্তা। ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ঐতিহাসিক সভা হয়।
এটিই ছিল উদযাপনের মূল কেন্দ্রবিন্দু। যেখানে ঘাসফুল,পদ্ম, কাস্তে-হাতুড়ি আর তেরঙা পতাকার বাহকরা একে অপরের ঘোর বিরোধী, সেখানে ঋষি নিবারণের আদর্শের ছাতার তলায় তাঁরা সবাই মিলেমিশে একাকার হয়ে গেলেন। পুরুলিয়া জেলা তৃণমূল কংগ্রেস সভাপতি রাজীব লোচন সোরেন, প্রাক্তন পৌর প্রধান নবেন্দু মাহালী, জেলা পরিষদের সভাধিপতি নিবেদিতা মাহাতো, সিপিআইএম এর জেলা সম্পাদক প্রদীপ রায় এবং প্রাক্তন বিধায়ক নিখিল মুখার্জি, বিজেপির প্রাক্তন কাউন্সিলর আবির সেনগুপ্ত ও প্রদীপ মুখোপাধ্যায়, ফরওয়ার্ড ব্লকের মিহির মাঝি ও ডাঃ অসীম সিনহা, আরএসপি-র দীপক দাস, জেডিইউ-র অশোক দাস এবং এসইউসিআই-র হরলাল মাহাতো সহ অন্যান্যরা। এই বিচিত্র রাজনৈতিক সমীকরণ বুঝিয়ে দেয় যে, যখন বিষয় হয় দেশের মাটি আর মাটির মানুষের মুক্তিদাতার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন, তখন দলীয় সংকীর্ণতা গৌণ হয়ে দাঁড়ায়। কেবল রাজনীতি নয়, এই উদযাপন ছিল জ্ঞানের আকর। অনুষ্ঠানে সামিল হয়েছিলেন মানভূমের ভাষা আন্দোলনের প্রবাদপ্রতিম সেনানী কাজল সেন, প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ড.গৌতম ভদ্র, বিশ্বভারতীর অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ রায়, সাঁওতালি সাহিত্যিক বঙ্গভূষণ কলেন্দ্রনাথ মান্ডি এবং অধ্যাপক ড. প্রবীর সরকার। তাঁদের ভাষণে ফুটে ওঠে ঋষি নিবারণের বহুমুখী প্রতিভা তাঁর সাংবাদিকতা, সমাজ সংস্কার এবং কুটির শিল্পের প্রতি অনুরাগ। ২৮শে ফেব্রুয়ারি সকালে ডাকবাংলো মাঠ থেকে শুরু হওয়া বিশাল পদযাত্রায় অংশ নিয়েছিল সহস্রাধিক ছাত্রছাত্রী। এটি প্রমাণ করে যে, নতুন প্রজন্মের কাছে ঋষি নিবারণ আজও বিস্মৃত হননি। এদিন স্কুল পড়ুয়াদের জন্য স্বরূপ দত্তের গ্রন্থ ‘নিবারণ চিত্র’ প্রকাশিত হয়, যা ছবি ও ছড়ার মাধ্যমে ঋষির জীবনী তুলে ধরে। এই উদযাপনের অংশ হিসেবেই পোস্ট অফিস মোড়ে অবস্থিত ঋষি নিবারণ চন্দ্রের মূর্তির পাদদেশে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। পুরুলিয়া সদর মহকুমা শাসক তথা পৌর প্রশাসক উৎপল কুমার ঘোষ নবরূপে সেজে ওঠা ঋষি নিবারণচন্দ্র পার্কের ফলক উন্মোচন করেন। এটি ঋষির স্মৃতির প্রতি প্রশাসনের দায়বদ্ধতার একটি বড় দিক। ১২ বৈশাখ, ১৪৩৩ (২৬ এপ্রিল, ২০২৬) ঋষি নিবারণ চন্দ্র দাশগুপ্তের জন্ম সার্ধশতবর্ষ সমাপ্ত হলো এবং তাঁর ১৫১তম জন্মদিন। এক বছরের এই দীর্ঘ পরিক্রমা কেবল একটি বার্ষিক উৎসব ছিল না, এটি ছিল একবিংশ শতাব্দীর কলুষিত রাজনীতির বিপরীতে এক বিনম্র আত্মসমর্পণ। মঞ্চে উপস্থিত সব দলের নেতারা একটি বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেছেন নিবারণ চন্দ্র যেভাবে নিজের আখের না গুছিয়ে সাধারণ মানুষের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিলেন,তা আজকের রাজনৈতিক কর্মীদের জন্য সবথেকে বড় শিক্ষা। তাঁর সার্ধশতবর্ষে পুরুলিয়া যে রাজনৈতিক সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত স্থাপন করল, তা গোটা ভারতের রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য একটি বড় শিক্ষা। ঋষি নিবারণচন্দ্র দাশগুপ্ত কোনো অতীতের ধূসর স্মৃতি নন তিনি এক জীবন্ত আদর্শ। পুরুলিয়া প্রমাণ করে দিল যে, মহাপুরুষরা কোনো নির্দিষ্ট দলের ব্যক্তিগত সম্পত্তি হতে পারেন না, তাঁরা জাতীয় সম্পদ। রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে এই ঐক্যবদ্ধ উদযাপনই হোক আগামীর ভারতের প্রকৃত রূপরেখা। মানভূমের রুক্ষ মাটিতে আজ যে সম্প্রীতির বীজ বপন করা হলো, তা যেন আগামী দিনে গোটা বাংলার রাজনৈতিক আকাশে এক নতুন সূর্যোদয়ের বার্তা নিয়ে আসে।












