২০২১-এর গোসুরক্ষা আইন কঠোরভাবে বলবৎ, ২৮ মে ইদ-উল-আজহা
বরাককণ্ঠপ্রতিবেদন: কোরবানির ইদ এগিয়ে আসতেই অসমে গোহত্যায় কড়াকড়ি বাড়িয়েছে জেলা প্রশাসন। ২০২১ সালের গোসুরক্ষা আইন কঠোরভাবে বলবৎ করার কথা বলা হচ্ছে। তাই ইদে গরু কোরবানি নিয়ে ধন্দে রয়েছে রাজ্যের মুসলিম সমাজ। সরকারের বিরুদ্ধে না গিয়ে রাজ্যের বিভিন্ন স্থানের ইদগাহ কমিটি, কবরস্থান-মসজিদ কমিটি ইদে গরু কোরবানি না দেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছে। কোথাও কোথাও সিদ্ধান্ত হয়েছে, গরু কোরবানি দেওয়া হবে না।
আগামী ২৮ মে রাজ্যে পালিত হবে ইদ-উল-আজহা বা কোরবানির ইদ। কিন্তু ইদের আগে কোরবানির ধর্মীয় রীতি পালনকে ঘিরে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে মুসলিম সমাজে। দীর্ঘদিনের পরম্পরা ভেঙে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা ইদে গরু কোরবানি না দেওয়ার কথা বলছেন। ধুবড়ি থেকে শিলচর, বাকসা থেকে বোকাখাত— ইদে গরু কোরবানি বন্ধ করার আহ্বান জানানো হচ্ছে। সনাতনীদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত না দেওয়ার কথাও বলছে বিদগ্ধ মুসলিম সমাজ।
কী বলছে গোসুরক্ষা আইন?
কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ধর্মীয় পরম্পরা কী এভাবে ত্যাগ করা সম্ভব? বাস্তবে ইসলাম ধর্মাবলম্বী লোকেরা এখন আর সরকারের সঙ্গে ঝামেলার পথে যেতে চাইছেন না। কারণ, কোরবানির ইদ এগিয়ে আসতেই মুসলিম অধ্যুষিত জেলাগুলিতে গোসুরক্ষা আইন কঠোরভাবে বলবৎ করার কথা ঘোষণা করেছে জেলা প্রশাসন।
২০২১ সালের সেই আইন অনুযায়ী, রাজ্যে গোহত্যা পুরোপুরি নিষিদ্ধ। তবে ষাঁড়, বলদ এবং মোষ কোরবানিতে ছাড় রয়েছে। কিন্তু শর্ত হচ্ছে, ১৪ বছরের ঊর্ধ্বের হতে হবে এবং দুর্ঘটনা কিংবা কোনও কারণে অক্ষম হতে হবে। তাছাড়া ‘কোরবানির উপযুক্ত’ বলে প্রমাণপত্র থাকতে হবে পশুচিকিৎসা বিভাগের। তবে প্রকাশ্যে হত্যা নয়, সরকারের স্বীকৃত কসাইখানায় পশু জবাই করা যাবে।
আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, হিন্দু, জৈন, খ্রিস্টান সহ অন্যান্য ধর্মাবলম্বী অধ্যুষিত এলাকায় প্রকাশ্যে গোমাংস ক্রয়-বিক্রয় পুরোপুরি নিষিদ্ধ। ধর্মীয় স্থান, মন্দির, নামঘর, সত্রের পাঁচ কিমি ব্যাসার্ধের মধ্যে গোহত্যা, গোমাংস বিক্রিতেও রয়েছে নিষেধাজ্ঞা। তাছাড়া ‘পারমিট’ ছাড়া গরু পরিবহণও আইনত অবৈধ।
প্রশাসনিক তৎপরতা ও কমিটিগুলোর সিদ্ধান্ত
এই পরিস্থিতিতে ইদে গরু কোরবানির পথ প্রায় রুদ্ধ। তবে বিধানসভায় আইন পাস হওয়ার পর এতদিন ধরে খুব একটা কড়াকড়ির পথে যায়নি সরকার। কিন্তু ভোটে বিপুলভাবে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় ফিরে আসার পর কোরবানির ইদের আগে সরকার এবার কঠোরভাবে গোসুরক্ষা আইন বলবতের উদ্যোগ নিয়েছে। সেই বার্তা পৌঁছেছে মুসলিম সমাজেও। তাই সরকারের রোষে পড়ার আশঙ্কা এবং অযথা ঝামেলা এড়াতে রাজ্যের স্থানে-স্থানে এবার গরু কোরবানি না দেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে মুসলিম মহল থেকে। গরুর বদলে অন্য জন্তুর কোরবানি দিতে বলা হচ্ছে ধর্ম পালনে উদ্যত সমাজকে।
গত বৃহস্পতিবার ধুবড়ির জেলা প্রশাসন স্থানীয় মসজিদ কমিটি, ইদগাহ কমিটি এবং বিভিন্ন মুসলিম সংগঠনের প্রতিনিধিদের ডেকে জানিয়ে দেন যে ইদে এবার গরু কোরবানি দেওয়া যাবে না। গোসুরক্ষা আইন মেনে চলতে হবে সবাইকে। নাহলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ধুবড়ির জেলা আয়ুক্ত, পুলিশ সুপার সহ অন্যান্যরা ছিলেন বৈঠকে। ফলে ধুবড়ির মর্কজ কমিটি, ইদগাহ কমিটি ইদে গরু কোরবানি না করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে।
তাঁদের বক্তব্য, “ইদ হচ্ছে শান্তির উৎসব। তাই শান্তিতে ইদ পালন করতে চাই আমরা। গোহত্যা করলে অন্য ধর্মের লোকদের মনে অশান্তি হয়। তাছাড়া ইদে গরু কোরবানি দেওয়ার বাধ্যবাধকতাও নেই ধর্মে। তাই গরুর বদলে ছাগল, ভেড়া কোরবানি দেওয়া হবে।”
অবশ্য প্রথমে কাছাড়ের উধারবন্দ এলাকার পানগ্রামের ইদগাহ এবং মসজিদ কমিটি ইদে গরু কোরবানি না দেওয়ার আহ্বান জানায়। এরপর বিভিন্ন জেলার মুসলিম সমাজে একই কথা ধ্বনিত হচ্ছে। হোজাই টাউন ইদগাহ, কবরস্থান কমিটিও আহ্বান জানিয়েছে, গরু কোরবানি দেবেন না।
বোকাখাতের জামে মসজিদ কমিটিও একই আহ্বান জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, “গরু কোরবানি দিতে আইনে বাধা রয়েছে। ফলে গরুর বদলে অন্য জন্তু কোরবানি দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি আমরা।” বোকাখাতের জামে মসজিদ এলাকার প্রায় দুশো পরিবার গরু কোরবানি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাকসার মুসলপুর ইদগাহ কমিটি, বঙাইগাঁওয়ের নয়াপাড়া এলাকার কমিটিও সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইদে গরু কোরবানি করা হবে না। ধুবড়ি জেলার হাতিধরা জামে মসজিদ কমিটি সহ জেলার ৮২টি কমিটি ইদে কোরবানি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানা গেছে।
মুখ্যমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া
এদিকে, কোরবানির ইদের আগে রাজ্যের বিভিন্ন জেলার মুসলিম সমাজ থেকে গরু কোরবানি না দেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। মুসলিম সমাজের এই পদক্ষেপকে অসমে সামাজিক সম্প্রীতির এক ইতিবাচক উদাহরণ হিসাবে তুলে ধরেছেন মুখ্যমন্ত্রী ড.হিমন্তবিশ্ব শর্মা। এই স্বেচ্ছামূলক পদক্ষেপ রাজ্যে শান্তি, পারস্পরিক বিশ্বাস, সাম্প্রদায়িক সৌহার্দকে শক্তিশালী করবে বলে তিনি মনে করেন। তবে মুসলিম সমাজের বাকিরাও ইদে গরু কোরবানি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেবেন বলে আশা করেছেন তিনি।
দীর্ঘদিন ধরেই মুখ্যমন্ত্রী চেষ্টা চালিয়ে আসছিলেন যে সনাতনী লোকদের মনে আঘাত না দিয়ে গোহত্যা থেকে বিরত থাকুক মুসলিম সমাজ। বিভিন্ন সময় প্রকাশ্যেই এই আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর মতে, গোহত্যা করলে হিন্দু ধর্মাবলম্বী লোকদের মনে আঘাত লাগে, সামাজিক অশান্তি হয়। সহ্য করতে না পেরে ধীরে-ধীরে সেই এলাকা থেকে সরে যান হিন্দুরা। কিন্তু গোহত্যা বন্ধ করলেই সমাজে সাম্প্রদায়িক সৌহার্দও ফিরে আসবে।
তাই কোরবানির ইদের আগে গোহত্যা বন্ধে তাঁর প্রচেষ্টা সফল হতে দেখে মুসলিম সমাজের প্রশংসা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। শনিবার সামাজিক মাধ্যমে তিনি বলেন, “হোজাই, ধুবড়ি, উধারবন্দ, বঙাইগাঁও এবং অন্যান্য কিছু স্থানের ইদগাহ, কবরস্থান কমিটি আগামী ইদে গরু কোরবানি পরিহার করার যে আহ্বান জানিয়েছে, তা অসমের সামাজিক সম্প্রীতির এক ইতিবাচক এবং প্রশংসনীয় উদাহরণ।”
মুসলিম সমাজের প্রশংসা করে তিনি বলেন, “সংখ্যাগরিষ্ঠ সনাতনী সমাজের অনুভূতির প্রতি সম্মান জানিয়ে আইনসম্মত এবং দায়িত্বশীলভাবে গ্রহণ করা এই স্বেচ্ছামূলক পদক্ষেপ রাজ্যে শান্তি, পারস্পরিক বিশ্বাস এবং সাম্প্রদায়িক সৌহার্দ অধিক শক্তিশালী করবে। অসম সবসময়ই সহাবস্থান, সংবেদনশীলতা এবং পারস্পরিক সম্মানের ভূমি। আশা করি, অন্যান্য কমিটিগুলিও একই ধরনের আইনসঙ্গত, সৌহার্দপূর্ণ এবং দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নিয়ে সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং সময়ের পরিবেশ শক্তিশালী করবে।”












