,

উনিশের চেতনায় জাগল নতুন প্রজন্ম, শিলচরে মিছিলের নেতৃত্বে স্কুল পড়ুয়ারা

ভাষা শহিদ দিবসের মিছিলে সংগঠনের চেয়ে ছাত্রছাত্রীদের ভিড়েই স্পষ্ট বার্তা, দাবি উঠল ‘ভাষা শহিদ স্টেশন বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন, শিলচর: ১৯৬১ সালের ১৯ মে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় শিলচর রেলস্টেশনে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারানো ১১ ভাষা শহিদের আত্মবলিদান স্মরণে মঙ্গলবার আবেগ ও সংকল্পে মুখর হল গোটা বরাক উপত্যকা। এবারের ‘উনিশের পথচলা’য় সবচেয়ে নজর কাড়ল স্কুল-কলেজের পড়ুয়াদের স্বতঃস্ফূর্ত…

ভাষা শহিদ দিবসের মিছিলে সংগঠনের চেয়ে ছাত্রছাত্রীদের ভিড়েই স্পষ্ট বার্তা, দাবি উঠল ‘ভাষা শহিদ স্টেশন

বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন, শিলচর: ১৯৬১ সালের ১৯ মে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় শিলচর রেলস্টেশনে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারানো ১১ ভাষা শহিদের আত্মবলিদান স্মরণে মঙ্গলবার আবেগ ও সংকল্পে মুখর হল গোটা বরাক উপত্যকা। এবারের ‘উনিশের পথচলা’য় সবচেয়ে নজর কাড়ল স্কুল-কলেজের পড়ুয়াদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। তুলনায় সামাজিক সংগঠনের উপস্থিতি ছিল কম।

মহামিছিলে ছাত্রছাত্রীদের ঢল
সকাল ৭-৩০ মিনিটে শিলচর রেলস্টেশন থেকে শুরু হওয়া ১৯শের মহামিছিলে স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রী ব্যানার, প্ল্যাকার্ড আর শহিদদের প্রতিকৃতি হাতে পা মেলায়। কাছাড় কলেজ, গুরুচরণ কলেজ, রাধামাধব কলেজ, শিলচর কলেজিয়েট স্কুল, নরসিং স্কুল, ডনবস্কো, হলিক্রস সহ শহরের প্রায় সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পড়ুয়ারা মিছিলে সামিল হয়।

মিছিলে পা মেলান রাজ্যসভার সাংসদ কনাদ পুরকায়স্থ, শিলচরের বিধায়ক ডা:রাজদীপ রায়, কাটিগড়ার বিধায়ক কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থ, প্রাক্তন বিধায়ক দীপায়ন চক্রবর্তী, বিজেপি জেলা সভাপতি রূপম সাহা, সমাজসেবী  স্বর্ণালী চৌধুরী,  ডাঃ রাজীব কর, অভ্রজিৎ চক্রবর্তী ঝলক, সাংস্কৃতিক কর্মী অরিন্দম ভট্টাচার্য, বাবুল হোড়, গোপাল রায়, মৃদুল মজুমদার , সঞ্জীব রায় সহ অনেকে।

‘নতুন প্রজন্মই দিচ্ছে বার্তা’
বিজেপি জেলা সভাপতি রূপম সাহা বলেন, “আজকের মিছিল দেখে বোঝা যায়, ভাষা শহিদদের আত্মত্যাগ বিফলে যায়নি। স্কুলের ছেলেমেয়েরা যেভাবে নিজেরাই এগিয়ে এসেছে, সেটাই আগামী দিনের জন্য সবচেয়ে বড় আশার আলো।” বিশিষ্ট সমাজসেবী রজত ঘোষ বলেন, “১৯ মে কেবল একটি তারিখ নয়। এটি বাঙালির আত্মপরিচয়ের দিন। নতুন প্রজন্ম এই দিনটিকে যেভাবে আপন করে নিয়েছে, তাতে আমরা গর্বিত।” শ্রীহট্ট সম্মিলনীর সহ-সভাপতি মঞ্জুল দেব বলেন, ছাত্র-সমাজ জেগেছে। এই জাগরণই বলে দেয়, মাতৃভাষার লড়াই শেষ হয়নি।”

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক মঞ্চের শ্রদ্ধাঞ্জলি
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক মঞ্চের পক্ষ থেকেও মিছিল করে সদস্যরা শিলচর শ্মশানঘাটে গিয়ে শহিদবেদীতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন। এরপর নাটক ও আবৃত্তির মাধ্যমে উনিশের চেতনাকে দর্শকের সামনে জীবন্ত করে তোলেন মঞ্চের শিল্পীরা।

গান্ধীভবনে দিনরাত লোকগানের আসর
সারা দিনব্যাপী গান্ধীভবন প্রেক্ষাগৃহে বসে লোকগানের আসর। দিন-রাত চলা এই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে শহরের বিশিষ্ট শিল্পীদের পাশাপাশি আগরতলা, কলকাতা, গৌহাটি থেকে আমন্ত্রিত শিল্পীরাও অংশগ্রহণ করেন। গণসঙ্গীত, ভাটিয়ালি, জারি-সারির সুরে মুখরিত হয়ে ওঠে গোটা প্রাঙ্গণ। বরাকের লোকসংস্কৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায় ১৯৬১-র রক্তাক্ত ইতিহাস।

ভোর থেকে শ্রদ্ধাঞ্জলি, উন্মোচিত ‘বর্ণমালার রোদ্দুর’
সকালের প্রথম প্রহরেই শিলচর রেলস্টেশন চত্বরে জমতে শুরু করে মানুষের ভিড়। ভাষা শহিদ স্টেশন স্মরণ সমিতির তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে প্রকাশিত হয় স্মারক পত্রিকা ‘বর্ণমালার রোদ্দুর’-এর নতুন সংখ্যা। মোড়ক উন্মোচন করেন সাংসদ কনাদ পুরকায়স্থ, প্রাক্তন বিধায়ক দীপায়ন চক্রবর্তী, বাবুল হোড় , চিকিৎসক সিদ্ধার্থ ভট্টাচার্য, সাংস্কৃতিক র্কমী তমাল বণিক, বিপ্লব দেবনাথ, সুজন দত্ত,নিলয় পাল,সুব্রত ভট্টাচার্য সহ বিশিষ্টজনেরা।

তিন জেলায় দিনভর কর্মসূচি
শুধু শিলচর নয়, শ্রীভূমি ও হাইলাকান্দি জেলা সদরসহ বরাকের প্রতিটি প্রান্তে দিনব্যাপী কর্মসূচি পালিত হয়। তিন জেলাতেই মূল আয়োজক ছিল বরাক উপত্যকা বঙ্গ সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলন। দিনভর চলে আলোচনাচক্র, স্মৃতিচারণ, কবিতা-গান ও স্বেচ্ছা রক্তদান শিবির। শিলচর মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রছাত্রীরা ১৯ ইউনিট রক্তদান করেন।

২টো ৩৫-এ স্তব্ধ গান্ধীবাগ
দুপুর ঠিক ২টো ৩৫ মিনিটে, ১৯৬১ সালে যে সময়ে পুলিশের গুলিতে শহিদ হয়েছিলেন কমলা ভট্টাচার্য, শচীন্দ্র পালসহ ১১ জন, সেই মুহূর্ত স্মরণ করে গান্ধীবাগ স্মৃতিসৌধে নেমে আসে পিনপতন নীরবতা। একে একে সবাই পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন।

একটাই দাবি: ‘ভাষা শহিদ স্টেশন, শিলচর’
প্রতিটি মিছিল, সভা আর আলোচনাচক্র থেকে একটাই দাবি সমস্বরে উঠে আসে— শিলচর রেলস্টেশনের নাম অবিলম্বে ‘ভাষা শহিদ স্টেশন, শিলচর’ করতে হবে। কেন্দ্র সরকার ২০১৬ সালেই নাম পরিবর্তনের জন্য রাজ্য সরকারকে চিঠি দিলেও আজও গেজেট নোটিফিকেশন জারি হয়নি।

রক্তে লেখা ইতিহাস
১৯৬০ সালে অসম সরকার অসমিয়াকে একমাত্র সরকারি ভাষা ঘোষণা করলে বরাক উপত্যকায় তীব্র প্রতিবাদ শুরু হয়। মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষার দাবিতে ১৯৬১ সালের ১৯ মে শিলচর রেলস্টেশনে শান্তিপূর্ণ সত্যাগ্রহে গুলি চালায় অসম পুলিশ। শহিদ হন ১১ জন, আহত হন শতাধিক।

এই রক্তাক্ত ঘটনাই ‘বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলন’ নামে ইতিহাসে স্থান পায়। সেই আত্মত্যাগের ফলেই বরাকে বাংলাকে অন্যতম সরকারি ভাষার মর্যাদা দিতে বাধ্য হয় রাজ্য সরকার।

দিনশেষে বরাকের আকাশে-বাতাসে ধ্বনিত হল একটাই শপথ— “১৯-এর চেতনা অমর, মাতৃভাষার লড়াই চলছে, চলবে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *