মাতৃভাষা সুরক্ষা সমিতি কাছাড়ের ৪ দফা দাবি, ‘বৈষম্য দূর না হলে পরাধীন নাগরিকের মতো বাঁচতে হবে’
বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন, শিলচর: আসামে বাংলা ভাষাকে রাজ্য ভাষার মর্যাদা প্রদান ও বরাক উপত্যকার ভাষা শহিদদের পরিবারকে আর্থিক সম্মাননা দেওয়ার দাবিতে মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্তবিশ্ব শর্মার কাছে স্মারকপত্র পাঠাল বরাক উপত্যকা মাতৃভাষা সুরক্ষা সমিতি, কাছাড় জেলা কমিটি। ১৫ মে স্পিড পোস্টের মাধ্যমে এই স্মারকপত্র পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা সভাপতি সুনীল রায়।
অভিনন্দন ও আশা
স্মারকপত্রের শুরুতেই মুখ্যমন্ত্রীকে তৃতীয়বার নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজেপি-এজিপি জোটের জয়ের জন্য আন্তরিক অভিনন্দন জানানো হয়। একইসঙ্গে আশা প্রকাশ করা হয়, ড. শর্মার দ্বিতীয় দফায় মুখ্যমন্ত্রিত্বে রাজ্যের উন্নয়ন ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় নতুন মাত্রা যোগ হবে। সমিতি মনে করে, সাংবিধানিক শপথের মর্যাদা রক্ষায় সরকার কোনও নাগরিক, ধর্ম, ভাষিক গোষ্ঠী বা অঞ্চলের প্রতি বৈষম্য করবে না।
‘বঙ্গ ভাষীরা বৈষম্যের শিকার’
স্মারকপত্রে গভীর দুঃখ প্রকাশ করে বলা হয়, স্বাধীনতার পর থেকে, বিশেষ করে আসাম বিভাজনের সময় থেকেই রাজ্যে বাংলা ভাষীরা ঘৃণা ও বৈষম্যের শিকার। ২১ জানুয়ারি ও ৬ মে ২০২৫ তারিখেও একই বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রীকে স্মারকপত্র দেওয়া হয়েছিল।
সমিতি উল্লেখ করে, ২০১৬ সালে সর্বানন্দ সনোয়ালের নেতৃত্বে বিজেপি-এজিপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর বৈষম্য দূরীকরণে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়। সমিতির তথ্যের ভিত্তিতেই ২৬ মার্চ ২০১৮ তারিখে তৎকালীন মন্ত্রী চন্দ্রমোহন পাটোয়ারী বিধানসভায় ১৯৬১-তে ১১ জন, ১৯৮৬-তে ২ জন ও ১৯৯৬-তে ১ জনসহ মোট ১৪ জন ভাষা শহিদের নাম ঘোষণা করেন। দীর্ঘ ৬০ বছর পর শহিদদের নাম সরকারি স্বীকৃতি পেলেও শহিদ পরিবার ও আহতদের আর্থিক সম্মাননা আজও অধরা।
৩০% ভাষাকে স্বীকৃতি নেই কেন?
২০১১ সালের লোকগণনা অনুযায়ী, আসামের ৩.১২ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে ৯০.২৪ লক্ষ, অর্থাৎ প্রায় ৩০% মানুষের মাতৃভাষা বাংলা। এর মধ্যে মাত্র ১০% বরাকে, বাকি ২০% ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় বাস করেন।
স্মারকপত্রে প্রশ্ন তোলা হয়, “৫% বড়ো ভাষা রাজ্য ভাষার মর্যাদা পেয়েছে। ৫% এর কম মণিপুরী ভাষাভাষীর জন্য চারটি জেলায় অতিরিক্ত সরকারি ভাষার স্বীকৃতি মিলেছে। ঝাড়খণ্ডে মাত্র ৯.৭৫% বাংলা ভাষীর জন্য বাংলা রাজ্য ভাষা। পশ্চিমবঙ্গে ১১টি ভাষা অতিরিক্ত রাজ্য ভাষা। অথচ আসামে ৩০% মানুষের ভাষা বাংলা আজও রাজ্য ভাষার মর্যাদা থেকে বঞ্চিত। এটা সংবিধান স্বীকৃত ভাষিক সংখ্যালঘুর মৌলিক অধিকারকে অস্বীকার করার সামিল।”
তদন্ত রিপোর্ট ৬৫ বছরেও প্রকাশ হয়নি
১৯৬১ সালের ১৯ মে শিলচর রেল স্টেশনে শান্তিপূর্ণ সত্যাগ্রহে পুলিশের গুলিতে ১১ জন শহিদ ও শতাধিক আহত হন। বিচারপতি গোপালজি মেহেরোত্রার নেতৃত্বে তদন্ত কমিশন গঠিত হলেও ৬৫ বছরেও সেই রিপোর্ট প্রকাশ করেনি রাজ্য সরকার। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সনোয়াল কাছাড়ে ভব্য ভাষা শহিদ স্মৃতি সৌধ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিলেও আট বছরেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।
অসম সাহিত্য সভার শ্রদ্ধা, তবুও বঞ্চনা
স্মারকপত্রে উল্লেখ করা হয়, ২১ জানুয়ারি ২০২৫-এ অসম সাহিত্য সভার সভাপতি ড. বসন্ত কুমার গোস্বামী ও প্রধান সম্পাদক দেবজিত বরা শিলচর স্টেশনের ভাষা শহিদ বেদীতে শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেছিলেন, “বিশ্বের আর কোথাও যেন কাউকে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় প্রাণ দিতে না হয়।” রাজ্যের মন্ত্রী, সাংসদ, বিধায়করাও প্রতি বছর শহিদ বেদীতে শ্রদ্ধা জানান। “তবুও ৩০% মানুষের ভাষা বাংলা রাজ্য ভাষার স্বীকৃতি পায় না। এটা ন্যায় বিচারের বিপরীত,” বলা হয়েছে স্মারকপত্রে।
৪ দফা দাবি
সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে বঙ্গ ভাষীরা ‘পরাধীন নাগরিকের মতো মানসিক হীনমন্যতায়’ দিন কাটাচ্ছেন উল্লেখ করে সমিতি ৪ দফা দাবি পেশ করেছে:
১. বাংলা ভাষাকে আসামের একটি সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হোক।
২. বরাকের ভাষা শহিদদের পরিবার এবং ভাষা আন্দোলনে গুরুতর আহতদের বা তাঁদের পরিবারকে সমহারে আর্থিক সম্মাননা দেওয়া হোক।
৩. অনতিবিলম্বে শিলচর রেল স্টেশনের নাম পরিবর্তন করে ‘ভাষা শহিদ স্টেশন, শিলচর’ করার জন্য গেজেট নোটিফিকেশন জারি করা হোক। কেন্দ্র সরকার ২০১৬ সালেই এ বিষয়ে চিঠি দিলেও গত দশ বছরে তা কার্যকর হয়নি।
৪. প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সনোয়ালের প্রতিশ্রুতি মতো বরাক উপত্যকায় ভব্য ভাষা শহিদ স্মারক নির্মাণ করা হোক।
সমিতির দাবি, এই চারটি দাবি সম্পূর্ণ সাংবিধানিক ও যুক্তিযুক্ত। দাবিগুলো মেনে নিয়ে রাজ্যের সর্ববৃহৎ ভাষিক সংখ্যালঘু বাঙালিদের প্রতি ন্যায় ও সুবিচার করবে সরকার, এই আশা প্রকাশ করা হয়েছে স্মারকপত্রে।












