,

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক মঞ্চের ‘উনিশের মহা পথচলা’য় জনসমুদ্রে ভাসল শিলচর, আত্মপরিচয়ের শপথে কাঁপল বরাক

২৮ বছরের ইতিহাসে নজিরবিহীন জমায়েত, ৭৫ সংগঠনের কণ্ঠে একটাই ধ্বনি: ‘উনিশ চিরজাগ্রত’ বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন : “যে কেড়েছে বাস্তুভিটে, সেই কেড়েছে ভয়, আকাশ জুড়ে লেখা আমার আত্মপরিচয়”— কবি শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর এই পংক্তি বুকে নিয়ে রবিবার শিলচরের রাজপথ কাঁপিয়ে দিল সম্মিলিত সাংস্কৃতিক মঞ্চের ‘উনিশের মহা পথচলা’। বরাক উপত্যকার আত্মপরিচয়ের প্রতীক ‘উনিশ’ যে চিরজাগ্রত, কাঠফাটা রোদ উপেক্ষা করে…

২৮ বছরের ইতিহাসে নজিরবিহীন জমায়েত, ৭৫ সংগঠনের কণ্ঠে একটাই ধ্বনি: ‘উনিশ চিরজাগ্রত’

বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন : “যে কেড়েছে বাস্তুভিটে, সেই কেড়েছে ভয়, আকাশ জুড়ে লেখা আমার আত্মপরিচয়”— কবি শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর এই পংক্তি বুকে নিয়ে রবিবার শিলচরের রাজপথ কাঁপিয়ে দিল সম্মিলিত সাংস্কৃতিক মঞ্চের ‘উনিশের মহা পথচলা’। বরাক উপত্যকার আত্মপরিচয়ের প্রতীক ‘উনিশ’ যে চিরজাগ্রত, কাঠফাটা রোদ উপেক্ষা করে ৭৫টির বেশি সংগঠনের হাজারো মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত মিছিল আবারও সেই সত্য প্রতিষ্ঠা করল।

সূচনায় আবেগ, উন্মোচনে ইতিহাস
বিকেলের সূর্য তখনও মাথার ওপর। রাঙ্গিরখাড়ি পয়েন্টে নেতাজির মূর্তির পাদদেশে জড়ো হয়েছেন শহরের শিল্পী, শিক্ষক, ছাত্র, শ্রমিক, গৃহবধূ। বিপ্লব দে-র স্বাগত ভাষণ এবং নাট্যাঙ্গনের পথনাটিকা দিয়ে শুরু হল কর্মসূচি। সাধারণ সম্পাদক অজয় রায় অভিনন্দন জানালেন আগতদের। মঞ্চে তখন আবেগের বিস্ফোরণ। অধ্যাপক বিশ্বতোষ চৌধুরী, বিশ্বজিৎ রায় চৌধুরী, সঞ্জীব রায় ও সভাপতি বিশ্বজিৎ দাসের কণ্ঠে উঠে এল উনিশের চেতনা। অধ্যাপক বিশ্বতোষ চৌধুরী, কিশোর কুমার ভট্টাচার্য, স্বপ্না ভট্টাচার্য, মহাদেব বণিক, মনোজ দেব, প্রদীপ নাথ , কমল চক্রবর্তী, অরিন্দম ভট্টাচার্য, সন্তোষ চন্দ, অজয়কুমার রায়, সঞ্জু রায় , সীমান্ত ভট্টাচার্য , বিশ্বজিৎ দত্ত, সায়ন রায় কুটন, দেবরাজ ভট্টাচার্য, বিপ্লব দে সহ বিশিষ্টদের হাত ধরে উন্মোচিত হল মঞ্চের মুখপত্র ‘সময়ের বার্তা’র তৃতীয় সংখ্যা। প্রতিটি পাতায় যেন লেখা বরাকের আত্মপরিচয়ের লড়াই।

রাজপথে শপথ, কণ্ঠে কণ্ঠে উনিশ
এরপর শুরু হল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। গান, স্লোগান আর ‘উনিশের’ গর্জনে এগিয়ে চলল মহা পথচলা। রাঙ্গিরখাড়ি থেকে হাসপাতাল রোড, প্রেমতলা, শিলংপট্টি, পার্ক রোড হয়ে জেলা ক্রীড়া সংস্থার মাঠ— পুরো শহর যেন মিশে গেল এক সুরে। কারও হাতে মাতৃভাষার পতাকা, কারও কণ্ঠে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার শপথ।দল-মত-রাজনীতির সীমারেখা মুছে দিয়ে পা মেলালেন শিলচরের বিধায়ক ডা:রাজদীপ রায়, উধারবন্দের বিধায়ক রাজদীপ গোয়ালা, কংগ্রেস নেতা তমালকান্তি বণিক সহ শহরের বিশিষ্টজন। প্রমাণ হল, উনিশে মে বরাকবাসীর কাছে কোনো দলের নয়, জাতির পরিচয়।

যে সব সংগঠন গড়ল ইতিহাস
এদিনের মহা পথচলায় অংশ নেয় শিলচর ইয়ুথ কয়্যার, নেতাজি ছাত্র যুব সংস্থা, ক্লাব আমরা, শিলচর সংগীত বিদ্যালয়, মাতৃভাষা ঐক্য মঞ্চ উধারবন্দ, ছন্দে ছন্দে মিউজিক অ্যাকাডেমি, বংশিতা কলা নিকেতন, সুর মন্দির সাংস্কৃতিক কলা কেন্দ্র, কথা-বাক শিল্প চর্চা কেন্দ্র, প্রয়াস এনজিও, মালুগ্রাম গার্লস এইচ এস স্কুল, শিলচর মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন, সাউথ পয়েন্ট স্কুল, কোরাস, জয় রাধে সেবা সমিতির সদস্য সহ জয়দীপ চক্রবর্তী, ছন্দনীড়ের ভাস্কর দাস, বিশল্যকরণী নারী সমিতি, ঝংকার সংগীত বিদ্যালয় ও সমাজ কল্যাণ মঞ্চ, ইয়ুথ অ্যাগেইনস্ট সোশ্যাল ইভিলস, মারোয়ারি যুব মঞ্চ, অইঋদ্ধি স্পর্শমনি ফাউন্ডেশন, নাগরিক স্বার্থ রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ, গৌড়ীয় নৃত্য কলা ভারতী, বিনির্মাণ, ফকিরা লোক গানের দল , নৃত্যায়ন, অগ্রণী ক্লাব, নবারুন, ত্রিনয়নী, নান্দনিক, নিনাদ গুরুকুল, স্বরলিপি, সম্মিলিত লোক মঞ্চ, নৃত্যকলি অ্যাকাডেমী, বন্ধু সামাজিক সংস্থা, নৃত্যকলি একাডেমি, পুষ্পাঙ্গন সঙ্গীত কলাকেন্দ্র, নীলাম্বরী সেল্ফ হেল্প গ্রুপ, ক্লাব অনন্যা, মহিলা কল্যাণ সমিতি, শিলচর ডিএসএ, জয় রাধে সেবা সমিতি, দীননাথ নবকিশোর উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলাক্ষেত্রম মিউজিক কলেজ, ছন্দালয়, সমকাল, নির্বাণ, সর্বজনীন সংস্থা, বিভাঙ্গণ, গীতাঞ্জলী সংগীত বিদ্যালয়, সঙ্গীতচক্র, আশ্বাস এনজিও, কৈবর্ত সমাজ কল্যাণ মঞ্চ, লায়ন্স ক্লাব, শিবালয় এনজিও সহ ৭৫টির বেশি সংগঠন।

‘উনিশ এখন গ্রামের ঘরেও’
ডিএসএ মাঠে সমাপনী বক্তব্যে মঞ্চের সভাপতি বিশ্বজিৎ দাস ঘোষণা করলেন, “বরাকের বুকে উনিশের চেতনা চির জাগ্রত। ১৯ আর শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়েছে উনিশ। বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যই ভারতবর্ষের মূল দর্শন। এই চেতনাকে সঠিক মাত্রায় জাগ্রত করতে আমাদের সঙ্গে নিতে হবে মেহনতিদের।”

শহিদ স্মরণে শপথ, উন্নয়নের বার্তা
বিধায়ক ডা:রাজদীপ রায় ১৯৬১ সালের ভাষা আন্দোলনের ১১ শহিদকে শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, “উনিশ আমাদের আবেগ, উনিশ আমাদের চেতনা। ৬৫ বছরে অনেক সরকার এসেছে, গেছে। কিন্তু আজ গর্বের সঙ্গে বলতে পারি, উপত্যকার ৪৫ লক্ষ মানুষ ভাতৃত্ব নিয়ে বসবাস করছেন।” তিনি জানান, শিলচর-সৌরাষ্ট্র মহাসড়কের ৯৫ শতাংশ কাজ শেষ। রাজ্যের সর্ববৃহৎ জেলা গ্রন্থাগার মিলনায়তনের কাজ দ্রুত শেষ করতে মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়েছে। মাতৃভাষায় শিক্ষার ওপর নতুন শিক্ষানীতির গুরুত্বও তুলে ধরেন তিনি। উধারবন্দের বিধায়ক রাজদীপ গোয়ালা বলেন, “শহিদদের আত্মত্যাগে অর্জিত অধিকার আমাদের গর্ব। এই ইতিহাস উত্তর প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।” বরাক চা শ্রমিক ইউনিয়নের প্রাক্তন নেতা বিশ্বনাথ উপাধ্যায় ও গৌরীশংকর রায়ের পদত্যাগের ঘটনাকেও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন তিনি।

২৮ বছরের উত্তরাধিকার
সাধারণ সম্পাদক অজয় রায় বলেন, “দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে এই পথচলার মাধ্যমে আমরা বরাকের মানুষের মধ্যে উনিশের বীজ বপন করেছি। আজকের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ তারই প্রমাণ। শিলচর রেলস্টেশনকে ‘ভাষা শহিদ স্টেশন’ হিসেবে নামাঙ্কিত করার দাবি একদিন বাস্তব হবেই।”

সন্ধ্যা নামার আগে প্রায় দেড় হাজার মানুষের কণ্ঠে ধ্বনিত হল একটাই সত্য— উনিশে মে কোনো তারিখ নয়, বরাকের বাঙালির রক্তে লেখা আত্মপরিচয়। এই উত্তরাধিকারকে সম্বল করেই আমরা হেঁটেছি দীর্ঘপথ, পৃথিবীর বুকে লিখেছি স্বকীয় পরিচয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *