বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন: সোমবার বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর কাছাড় জেলার রাজনৈতিক মানচিত্র পুরোপুরি গেরুয়া রঙে ঢেকে গেল। ‘রং দে তু মোহে গেরুয়া’ — গণনার দিন সকাল থেকেই এই সুরে মেতে ছিলেন বিজেপি কর্মীরা। ফল বেরোতেই প্রমাণ হল, এটা নিছক স্লোগান ছিল না, জনতার রায়েরই প্রতিধ্বনি। জেলার ৭টি আসনের মধ্যে ৬টিতে প্রার্থী দিয়েছিল বিজেপি। ৬টিতেই এসেছে নিরঙ্কুশ জয়। সোনাই আসনটি জোটসঙ্গী অগপকে ছাড়লেও সেখানে অগপের করিম উদ্দিন বড়ভূইয়া ওরফে সাজু কংগ্রেসের আমিনুল হক লস্করের কাছে পরাজিত হয়েছেন।
শতাংশের বিচারে ভাঙল ১৯৯১-এর রেকর্ড
বরাক উপত্যকায় ১৯৯১ সালে ১৫টি আসনের মধ্যে ৯টিতে জিতেছিল বিজেপি। সেটাই ছিল এতদিনের সেরা ফল। এবার ডিলিমিটেশনের পর ১৩টি আসনের মধ্যে ৯টিতেই জয় পেয়েছে দল। বিজেপি কর্মকর্তা কৌশিক রায়ের মতে, “আসন সংখ্যা কমলেও জয়ের শতাংশ বেড়েছে। তাই এটাই উপত্যকায় আমাদের সর্বকালের সেরা ফল।”
কাছাড়ে শতভাগ সাফল্য
১৯৯১-এ কাছাড়ে বিজেপি পেয়েছিল ৪টি আসন। ২০১৬-তে ৭টিতে লড়ে ৬টি জিতলেও লক্ষীপুরে হারতে হয়েছিল। এবার ৬টিতে প্রার্থী দিয়ে ৬টিতেই জয়। কাছাড় জেলায় এই প্রথম ‘শতভাগ সাফল্য’ পেল বিজেপি।
৬ আসনেই ব্যবধানের সুনামি
লক্ষীপুর: কৌশিক রায় ১,২৫,৩০২ ভোট। কংগ্রেসের এম শান্তিকুমার ২৫,৯০১। ব্যবধান ৯৯,৪০১। রাজ্যে তৃতীয় সর্বোচ্চ ব্যবধান।
উধারবন্দ: রাজদীপ গোয়ালা ১,০৩,৩৩১। কংগ্রেসের অজিত সিংহ ৪৭,৪৬৪। ব্যবধান ৫৫,৪৬৪।
শিলচর: ডা:রাজদীপ রায় ১,১০,৭৫৮। কংগ্রেসের অভিজিৎ পাল ৫৬,৭৬১। ব্যবধান ৫৬,৭৬১।
কাটিগড়া: কমলাক্ষ দেপুরকায়স্থ ১,১০,৭৫৮। কংগ্রেসের অমরচাঁদ জৈন ৭৩,০৭৮। ব্যবধান ৩৭,৬৮০।
ধলাই: অমিয়কান্তি দাস ১,০০,৬৩৪। কংগ্রেসের ধ্রুবজ্যোতি পুরকায়স্থ ৫৬,১৭২। ব্যবধান ৪৪,৪৬২।
বড়খলা: কিশোর নাথ ১,০২,৭৭৫। কংগ্রেসের অমিত কালোয়ার ৬৬,১৬২। ব্যবধান ৩৬,৬১৩।
সোনাইয়ে কংগ্রেসের একমাত্র জয়
গেরুয়া ঝড়ের মাঝেও সোনাইয়ে জিতেছেন কংগ্রেসের আমিনুল হক লস্কর। তিনি পেয়েছেন ৮৯,৯৫৭ ভোট। অগপর করিম উদ্দিন বড়ভূইয়া পেয়েছেন ৬২,৭৮৭। ব্যবধান ২৭,১৭০।
গণনাকেন্দ্রের চিত্র
শিলচর রামনগর আইএসবিটি-আইএসটিটিতে গণনা শুরুর ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই ফলের আভাস মেলে। শিলচরে প্রথম তিন রাউন্ডে কংগ্রেস এগিয়ে থাকলেও সেটা ছিল সংখ্যালঘু অধ্যুষিত বুথের গণনা। চতুর্থ রাউন্ড থেকেই ডা. রাজদীপ রায় লিড নেন। বাকি ৫ আসনে প্রথম থেকেই এগিয়ে ছিলেন বিজেপি প্রার্থীরা। সোনাইয়ে শুরু থেকেই এগিয়ে ছিলেন আমিনুল। ভিভিপ্যাট স্লিপ গণনায় হালকা উত্তেজনা ছাড়া গোটা প্রক্রিয়া শান্তিপূর্ণ ছিল।
দুই শিবিরের প্রতিক্রিয়া
জয়ের পর বিজেপি কর্মকর্তা কৌশিক রায় বলেন, “প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’ নীতিতে মানুষ ভরসা রেখেছে। এ জয় তারই প্রতিফলন।” শিলচরের নবনির্বাচিত বিধায়ক ডা: রাজদীপ রায় বলেন, “এবারের নির্বাচনে বিজেপি শুধু সমগ্র রাজ্যেই নয়, বরাক উপত্যকাতেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। ১৯৯১ সালে বরাক থেকে বিজেপির ৯ জন প্রার্থী জয়ী হয়েছিলেন। এবারও ১৩টির মধ্যে ৯টিতে জিতে সেই সাফল্যের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। এতে বরাকে বিজেপির প্রতি মানুষের আস্থা আরও সুদৃঢ় হয়েছে। শিলচরবাসীর সহযোগিতা নিয়ে আগামী দিনে উন্নয়নের নতুন অধ্যায় রচনা করব।” অপরদিকে জেলা কংগ্রেস সভাপতি সজল আচার্য বলেন, “জনরায় মেনে নিচ্ছি। তবে এই বিপুল ব্যবধানের পেছনে অযৌক্তিক ডিলিমিটেশন ও বিজেপির মেরুকরণের রাজনীতি রয়েছে। তবুও সোনাইয়ের জয় আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর অক্সিজেন দেবে।”












