বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন। গুয়াহাটি : উজানের ঢল আর টানা বৃষ্টিতে যখন ব্রহ্মপুত্র ও তার উপনদীগুলি দুকূল ছাপিয়ে একের পর এক গ্রাম গ্রাস করেছে, তখন মৃত্যুর মুখ থেকে মানুষকে ফিরিয়ে আনতে মাঠে নেমেছে ভারতীয় সেনাবাহিনী। ‘অপারেশন জল রাহত’-এর মাধ্যমে দুর্গম জলবন্দি এলাকায় পৌঁছে দিনরাত উদ্ধার ও ত্রাণ কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন সেনা জওয়ানরা।
অসম রাজ্য দুর্যোগ মোকাবিলা কর্তৃপক্ষের সাম্প্রতিক বুলেটিন বলছে বন্যার কবলে পড়েছে রাজ্যের বহু জেলা। গত এক দিনে আরও কয়েকজনের প্রাণহানি ঘটেছে। এতে চলতি বছরের বন্যায় রাজ্যে মোট প্রাণহানির সংখ্যা অনেকটাই বেড়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শিবসাগর জেলা। সেখানে ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, রাস্তাঘাট সবই জলের নিচে। জোরহাট এবং চরাইদেও জেলার পরিস্থিতিও ভয়াবহ। এই দুটি জেলার বহু গ্রামে পানি ঢুকে পড়ায় মানুষজন ঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছেন। গোলাঘাট, কামরূপ, হোজাই, ডিব্রুগড়, বিশ্বনাথ, ধেমাজি, সোনিতপুর, উদালগুড়ি, নগাঁও, কামরূপ মেট্রো, তিনসুকিয়া, কার্বি আংলং এবং লখিমপুর জেলাও বন্যায় বিপর্যস্ত। রাজ্যের অসংখ্য রাজস্ব চক্রের অধীন শতাধিক গ্রাম এখনও পানিতে ডুবে আছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় ত্রাণ পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

এই পরিস্থিতিতে স্পিয়ার কর্পসের অধীনে গঠিত বিশেষ বন্যা ত্রাণ বাহিনীর একাধিক দলকে শিবসাগর, চরাইদেও এবং জোরহাট জেলার সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলিতে মোতায়েন করা হয়েছে। রাজ্য ও জেলা প্রশাসনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে চলছে উদ্ধার অভিযান। প্রবল স্রোত আর প্রতিকূল আবহাওয়াকে পাশ কাটিয়ে মোটরবোট নিয়ে জওয়ানরা পৌঁছে যাচ্ছেন জলবন্দি গ্রামে। সঙ্গে রয়েছে বিশেষ ইঞ্জিনিয়ারিং সরঞ্জাম, জরুরি চিকিৎসা সামগ্রী এবং ত্রাণ।
উদ্ধারকাজে অগ্রাধিকার পাচ্ছেন শিশু, প্রবীণ, অসুস্থ এবং অন্তঃসত্ত্বা মহিলারা। তাঁদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে আনার পাশাপাশি আটকে পড়া গবাদি পশুকেও উদ্ধার করা হচ্ছে। দুর্গত মানুষের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানীয়জল, ওষুধ এবং অন্যান্য নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী। ঘটনাস্থলেই দেওয়া হচ্ছে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা।
রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে খোলা হয়েছে অসংখ্য ত্রাণ শিবির। সেখানে আশ্রয় নিয়েছেন হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত মানুষ। ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্র থেকেও চলছে খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিতরণ। তবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের তুলনায় সাহায্য এখনও অপ্রতুল। শিবসাগর শহর ও নাংলামুরাঘাট এলাকায় দিখৌ ও দিশাং নদী বিপদসীমার অনেক উপর দিয়ে বইছে। ব্রহ্মপুত্র, বুড়িডিহিং এবং দক্ষিণ ধানসিরি নদীর জলস্তরও বিপদসীমা ছাড়িয়েছে। ফলে প্রতিদিনই নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে।

বন্যার ধাক্কায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ থমকে গেছে। টানা দ্বিতীয় দিনের মতো বন্ধ রয়েছে রেল চলাচল। শিবসাগর জেলার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রুটে জল ওঠায় ট্রেন চলাচল সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে। কিছু ট্রেন বাতিল এবং কিছু ট্রেনের পথ ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে। রাস্তাঘাট ভেঙে যাওয়ায় অনেক জায়গায় সড়ক যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন।
মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ স্বাভাবিক রাখতে শিবসাগর, চরাইদেও এবং জোরহাট জেলায় আন্ত জেলা রোমিং সুবিধা চালু করেছে টেলিযোগাযোগ বিভাগ। এতে একটি সংস্থার নেটওয়ার্ক না থাকলেও অন্য সংস্থার নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে কথা বলা যাচ্ছে।
সেনার এক আধিকারিক বলেন সীমান্ত রক্ষার পাশাপাশি দুর্যোগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো সেনাবাহিনীর কর্তব্য। যতদিন প্রয়োজন হবে ততদিন উদ্ধার ও ত্রাণ অভিযান চলবে।
মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা জানিয়েছেন উজানের অতিবৃষ্টির কারণে সৃষ্ট এই বন্যা রাজ্যের মানুষের জন্য চরম দুর্ভোগ ডেকে এনেছে। ত্রাণ ও উদ্ধারকাজ খতিয়ে দেখতে তিনি বুধবার থেকে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলি পরিদর্শনে যাবেন। চরাইদেও, নাজিরা, শিবসাগর, সোনারি, জোরহাট এবং তেওকের বন্যা কবলিত অঞ্চল ও ত্রাণ শিবির ঘুরে তিনি প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেবেন। মুখ্যমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি মানুষের পাশে সরকার আছে এবং দ্রুত পুনর্বাসনের কাজ শুরু হবে।












