নাড্ডার সঙ্গে বৈঠক, তিন দফা দাবি, সংসদ অভিমুখে মিছিলে পুলিশি বাধা
বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন। নয়াদিল্লি : সোমবার সকাল থেকেই রাজধানীতে তুঙ্গে উত্তেজনা। সর্বভারতীয় চিকিৎসা প্রবেশিকা পরীক্ষা দুই হাজার ছাব্বিশের প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং জাতীয় স্তরের বিভিন্ন পরীক্ষায় বারবার অনিয়মের অভিযোগে উত্তাল দিল্লি। গত ৬ জুন থেকে এই ইস্যুতে আন্দোলনে নেমেছে আরশোলা জনতা দল। পরে সেই আন্দোলন দেশের একাধিক শহরে ছড়িয়ে পড়ে।
এই আবহের মধ্যেই অবশেষে আন্দোলনকারীদের দাবি মেনে তাঁদের সঙ্গে দেখা করলেন কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী তথা শাসক দলের সর্বভারতীয় সভাপতি জগৎ প্রকাশ নাড্ডা। আর তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই টানা ২৩ দিন পর অনশন ভাঙার ঘোষণা করলেন পরিবেশকর্মী ও শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুক।
সংসদ অভিমুখে মিছিল, পুলিশি বাধা
সোমবার ‘চলো সংসদ’ কর্মসূচির ডাক দেয় আরশোলা জনতা দল। হাজার হাজার ছাত্র-যুব ও সমর্থক সংসদ সড়ক এলাকায় জড়ো হয়ে সংসদের দিকে এগোতে চাইলে পুলিশ একাধিক স্তরের বাধা দিয়ে তাদের আটকে দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে লাঠি চালানো ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। পুলিশি বাধা সত্ত্বেও আন্দোলনকারীরা ছত্রভঙ্গ হননি। তারা কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান-এর পদত্যাগের দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন। পরে জন্তর মন্তর ও আশপাশের এলাকা থেকেও বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দেয় দিল্লি পুলিশ। আরশোলা জনতা দল পুলিশের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের উপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগও তুলেছে।
নাড্ডার সঙ্গে বৈঠক, তিন দফা দাবি জমা
এই উত্তপ্ত আবহের মধ্যেই আরশোলা জনতা দলের দুই প্রতিনিধি সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা নাড্ডার বাসভবনে যান। সেখানে প্রায় ১০ মিনিটের সাক্ষাতে তাঁরা মন্ত্রীর হাতে সংগঠনের লিখিত আবেদনপত্র তুলে দেন। সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া বার্তায় নাড্ডা জানান, সকাল এগারোটা পঞ্চাশ মিনিট থেকে আলোচনা শুরু হয়ে বিকেল প্রায় চারটা পর্যন্ত চলে। বৈঠকটি অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে হয়েছে।
আরশোলা জনতা দলের তরফে জানানো হয়েছে, এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য রাজনৈতিক সংঘাত নয়। দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ফেরানো এবং সর্বভারতীয় প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলিতে আস্থা ফিরিয়ে আনাই তাঁদের লক্ষ্য। বৈঠক শেষে সংগঠনের প্রতিনিধিরা জানান, সরকার তাঁদের বক্তব্য শুনেছে। তবে কোনও দাবি মেনে নেওয়ার লিখিত প্রতিশ্রুতি এখনও মেলেনি। সরকার বিষয়গুলি বিবেচনার জন্য কিছু সময় চেয়েছে।
আবেদনপত্রে আরশোলা জনতা দল তিনটি প্রধান দাবি জানিয়েছে।
প্রথমত, সাম্প্রতিক সর্বভারতীয় চিকিৎসা প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও অনিয়মের কারণে যেসব পরীক্ষার্থীর পরিবারে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে, সেই প্রতিটি পরিবারকে এক কোটি টাকা আর্থিক সাহায্য দিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি আন্দোলনের অন্যতম মুখ সোনম ওয়াংচুকের চলাফেরা ও যোগাযোগের উপর থাকা নিষেধাজ্ঞা অবিলম্বে প্রত্যাহার করে তাঁকে স্বাধীনভাবে আন্দোলনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে।
তৃতীয়ত, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় বারবার অনিয়মের নৈতিক দায় নিয়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান-কে পদত্যাগ করতে হবে বা তাঁকে অপসারণ করতে হবে।
আরশোলা জনতা দলের অভিযোগ, সর্বভারতীয় চিকিৎসা প্রবেশিকা পরীক্ষা দুই হাজার ছাব্বিশের প্রশ্নপত্র ফাঁস, কেন্দ্রীয় মাধ্যমিক শিক্ষা পর্ষদের দ্বাদশ শ্রেণির ওয়েব পোর্টাল বিভ্রাট এবং সর্বভারতীয় স্নাতক প্রবেশিকা পরীক্ষায় বিলম্ব-সহ একাধিক ঘটনায় শিক্ষা ব্যবস্থার গুরুতর ব্যর্থতা সামনে এসেছে এবং তার দায় শিক্ষা মন্ত্রকেই নিতে হবে।

২৩ দিন পর অনশন ভাঙলেন সোনম
সরকারের সঙ্গে আলোচনার পথ খোলায় এবং দাবিগুলি বিবেচনার আশ্বাস পাওয়ার কথা জানিয়ে সোমবার হাসপাতালেই অনশন ভাঙেন সোনম ওয়াংচুক। তিনি ২০ জুন জন্তর মন্তরের আন্দোলনে যোগ দেন। সরকারের পক্ষ থেকে দাবিগুলির কোনও সাড়া না মেলায় ২৮ জুন তিনি অনশন শুরু করেন।
স্বাস্থ্যের অবনতি হওয়ায় অনশনের তেইশতম দিনে রবিবার দিল্লি পুলিশ তাঁকে সফদরজং হাসপাতালে ভর্তি করে। সেখানেই চিকিৎসকদের উপস্থিতিতে তিনি তরল খাবার গ্রহণ করে অনশন ভাঙেন। হাসপাতাল থেকেই স্ত্রী গীতাঞ্জলি আংমো-র মাধ্যমে পাঠানো হাতে লেখা চিঠিতে সোনম জানিয়েছিলেন, যতক্ষণ না তরুণ নেতারা সংসদ ভবনে গিয়ে সাংসদদের সঙ্গে দেখা করার অনুমতি পান, ততক্ষণ অনশন চলবে।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, দীর্ঘ অনশনের কারণে তিনি দুর্বল হয়ে পড়লেও বর্তমানে তাঁর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল। তাঁকে এখনও পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
শিক্ষা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠক, উচ্চ আদালতে মামলা
এদিনই আন্দোলনের আবহে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের সঙ্গে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ-এর প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা বৈঠক হয়। তবে সেই বৈঠকে কী আলোচনা হয়েছে তা সরকারিভাবে জানানো হয়নি।
অন্যদিকে দিল্লি উচ্চ আদালতে সোনম ওয়াংচুক সংক্রান্ত মামলার শুনানি মঙ্গলবার পর্যন্ত স্থগিত রাখা হয়েছে। আদালত নির্দেশ দিয়েছে, ওয়াংচুকের চিকিৎসার দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক এবং তাঁর আস্থাভাজন এক চিকিৎসককে পরবর্তী শুনানিতে উপস্থিত থাকতে হবে। ওয়াংচুকের হয়ে সওয়াল করা প্রবীণ আইনজীবী কপিল সিব্বল তাঁকে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরের আবেদন করলে আদালত জানায়, জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হলে তা সর্বভারতীয় চিকিৎসা বিজ্ঞান সংস্থানের অধিকর্তার অনুমোদন ছাড়া করা যাবে না।
আন্দোলন থামছে না
আরশোলা জনতা দলের মুখপাত্র সৌরভ দাস জানিয়েছেন, অনশন প্রত্যাহার হলেও আন্দোলন শেষ হচ্ছে না। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত ‘চলো সংসদ’ সহ অন্যান্য কর্মসূচির মাধ্যমে দেশজুড়ে বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়া হবে। সরকারের সঙ্গে সংলাপের প্রক্রিয়াও চলবে। সোনম ওয়াংচুকও আগেই জানিয়েছিলেন, তাঁর উদ্দেশ্য ব্যক্তিগত লড়াই নয়, বরং দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় জবাবদিহি ও সংস্কার নিশ্চিত করা।












