উন্নত পরিকাঠামো, স্যাটেলাইট চ্যানেল ও দৈনিক সংবাদ বুলেটিন পুনরায় শুরুর প্রস্তাব
বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন: বরাক উপত্যকার ভাষা-সংস্কৃতি ও জনআকাঙ্ক্ষাকে জাতীয় স্তরে তুলে ধরতে শিলচর দূরদর্শন কেন্দ্রকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য উদ্যোগী হয়েছেন রাজ্যসভার সাংসদ কণাদ পুরকায়স্থ। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা এই কেন্দ্রটিকে ফের সচল করার দাবিতে তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে জোরালো তদ্বির শুরু করেছেন। তাঁর এই প্রচেষ্টাকে বরাক উপত্যকার সর্বস্তরের মানুষ স্বাগত জানিয়েছেন। গত ১৭ জুন নয়াদিল্লিতে যোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি বিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটির বৈঠকে তিনি বিষয়টি উত্থাপন করেন। এরপর সোমবার প্রসার ভারতীর ডিরেক্টর জেনারেল রাজীবকুমার জৈনকে একটি বিস্তারিত চিঠি লিখে শিলচর ডিডি-কে নতুন করে চালু করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের আর্জি জানান। চিঠিতে সাংসদ কণাদ পুরকায়স্থ উল্লেখ করেন, বরাক উপত্যকা ভারতবর্ষের এক অনন্য উদাহরণ। এখানে বাঙালি, আদিবাসী, চা-জনগোষ্ঠী সহ বিভিন্ন জাতি-উপজাতির মানুষ শতাব্দী ধরে সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের সঙ্গে বসবাস করে আসছেন। এই বহুমাত্রিক সংস্কৃতি, লোকশিল্প, সাহিত্য ও ঐতিহ্যকে দেশের সামনে তুলে ধরার জন্য একটি শক্তিশালী গণমাধ্যমের প্রয়োজন। আর সেই ক্ষেত্রে শিলচর দূরদর্শন কেন্দ্র পুনরায় চালু হলে তা বরাকের মানুষের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। তিনি বলেন, এই কেন্দ্রটি শুধু বিনোদনের মাধ্যম হবে না, বরং এটি স্থানীয় শিল্পী, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিকর্মী ও তরুণ প্রজন্মের প্রতিভা বিকাশের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে। শিলচর দূরদর্শনের রয়েছে এক গৌরবময় ইতিহাস। ১৯৮৪ সালের ৪ ডিসেম্বর ‘লো পাওয়ার ট্রান্সমিটার’ স্থাপনের মাধ্যমে এর পথচলা শুরু। ১৯৮৭ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর ‘হাই পাওয়ার ট্রান্সমিটার’ চালু হওয়ার পর এর পরিধি আরও বৃদ্ধি পায়। ১৯৯২ সালের মার্চে স্টুডিও স্থাপন এবং ১৯৯৩ সালের ৩০ এপ্রিল থেকে স্থানীয় অনুষ্ঠান সম্প্রচার শুরু হওয়ার পর ধীরে ধীরে এটি মানুষের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ২০১৪ সাল পর্যন্ত এখান থেকে দৈনিক সাড়ে তিন ঘণ্টা সরাসরি স্থানীয় অনুষ্ঠান সম্প্রচারিত হত।

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ২০২১ সালের ১৩ অক্টোবর স্থানীয় সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয়। ২০২২ সালের ৩১ মার্চ বন্ধ হয়ে যায় ‘হাই পাওয়ার টেরিস্ট্রিয়াল ট্রান্সমিটার’টিও। বর্তমানে শুধুমাত্র ‘ডিডি অসম’-এর জন্য দৈনিক ২ ঘণ্টা স্থানীয় অনুষ্ঠান তৈরি করে চলেছে শিলচর কেন্দ্র। অথচ এখানে তিনটি ক্যামেরা সম্বলিত আধুনিক স্টুডিও, দুটি এডিট স্যুট সহ অত্যাধুনিক পোস্ট-প্রোডাকশন পরিকাঠামো এখনও বিদ্যমান রয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হল, অনুমোদিত পদের মাত্র ৪০ শতাংশ কর্মী দিয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রটি চালানো হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে সাংসদ কণাদ পুরকায়স্থ প্রসার ভারতীর কাছে চারটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব পেশ করেছেন। তিনি বলেছেন, প্রথমত যেহেতু স্টুডিও ও কারিগরি পরিকাঠামো রয়েছে, তাই সামান্য অতিরিক্ত বিনিয়োগ করলেই সম্প্রচার পুনরায় শুরু করা সম্ভব। দ্বিতীয়ত, যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সেকেলে টেরিস্ট্রিয়াল ট্রান্সমিশনের বদলে একটি আর্থ স্টেশন ও স্যাটেলাইট চ্যানেলের ব্যবস্থা করা হোক। এর ফলে প্রাথমিকভাবে দৈনিক অন্তত ১২ ঘণ্টা স্থানীয় অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা যাবে এবং পরবর্তী সময়ে জাতীয় নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হওয়া সম্ভব হবে। তৃতীয়ত, স্যাটেলাইট চ্যানেল সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য অবিলম্বে প্রয়োজনীয় সংখ্যক কর্মী নিয়োগ করতে হবে। চতুর্থত, বরাক উপত্যকার মানুষের কাছে একসময় অত্যন্ত জনপ্রিয় দৈনিক স্থানীয় সংবাদ বুলেটিনটি পুনরায় চালু করতে হবে। এই বুলেটিন স্থানীয় সমস্যা, উন্নয়নমূলক কাজ, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিত। আজও এই বুলেটিন ফের চালুর জন্য জোরালো গণদাবি রয়েছে। সাংসদ কণাদ পুরকায়স্থের এই উদ্যোগকে বরাক উপত্যকার বুদ্ধিজীবী, সংস্কৃতিকর্মী ও সাধারণ মানুষ স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, শিলচর দূরদর্শন পুনরায় চালু হলে তা শুধুমাত্র একটি সম্প্রচার কেন্দ্র হয়ে থাকবে না, বরং এটি দক্ষিণ অসমের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সামাজিক সম্প্রীতির ধারক ও বাহক হয়ে উঠবে। এটি স্থানীয় সমস্যাগুলিকে জাতীয় স্তরে তুলে ধরার পাশাপাশি সরকারি প্রকল্প ও উন্নয়নমূলক কাজকেও মানুষের কাছে পৌঁছে দেবে। ফলে গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হবে। সবমিলিয়ে সাংসদ কণাদ পুরকায়স্থের এই সময়োপযোগী উদ্যোগ বরাকবাসীর দীর্ঘদিনের দাবিকে নতুন করে জোর দিয়েছে। তিনি প্রসার ভারতীর কাছে আবেদন জানিয়েছেন, অবিলম্বে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে শিলচর দূরদর্শন কেন্দ্রকে পুনরুজ্জীবিত করে বরাক উপত্যকার মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে মর্যাদা দেওয়া হোক।












