সারা আসামে বরাকের নাম উজ্জ্বল করা শিল্পীদের অভিনন্দন, কলকাতা-সহ বিশিষ্টদের সম্মাননা
বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন: বরাক ভ্যালি নিউজপেপার ওনার অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে বুধবার রবীন্দ্র সংগীত ও নৃত্যের সুর-মূর্ছনায় মুখরিত হয়ে উঠল শিলচর গান্ধীভবন। ২০২৬ সালের বার্ষিক কার্যসূচির অংশ হিসেবে আয়োজিত এই মহতী অনুষ্ঠানে ছিল তিন বিভাগে রবীন্দ্র নৃত্য প্রতিযোগিতা, মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা ও গুণীজন সম্মাননা। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত শিল্প-সাহিত্যপ্রেমী দর্শকের সরব উপস্থিতিতে গান্ধীভবন প্রাঙ্গণ হয়ে ওঠে উৎসবমুখর ও প্রাণবন্ত। অনুষ্ঠান আয়োজনে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন অনেকেই।

সকাল ১০টায় মঙ্গলপ্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা করেন সংস্থার সভাপতি মনোতোষ ধর, কার্যকরী সভাপতি সন্তোষ চন্দ এবং শহরের প্রথিতযশা সঙ্গীতশিল্পী ও সঙ্গীতগুরু বিশ্বজিৎ রায় চৌধুরী। এরপরই শুরু হয় বহু প্রতীক্ষিত রবীন্দ্র নৃত্য প্রতিযোগিতা। প্রথম থেকে চতুর্থ মান বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করে সূর্যতপা দেব, দ্বিতীয় দিত্যা বসুমাতারি, তৃতীয় ঈশানি শীল। পঞ্চম থেকে অষ্টম মান বিভাগে প্রথম হয়েছে বেদান্তিকা ধর, দ্বিতীয় মধুশ্রী পাল, তৃতীয় মৃগাঙ্কী দে। নবম থেকে স্নাতক বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করে সাথী বিশ্বাস, দ্বিতীয় সৃজনি দেব, তৃতীয় ঋষিতা নাথ। এই প্রতিযোগিতার বিচারকের গুরুদায়িত্ব পালন করেন কলকাতা থেকে আগত বিশ্ববঙ্গ সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলনের সম্পাদক ড.রাধাকান্ত সরকার এবং শিলচরের বিশিষ্ট নৃত্য শিক্ষিকা গায়ত্রী দেব।

সন্ধ্যার সাংস্কৃতিক পর্বে একের পর এক মনোমুগ্ধকর পরিবেশনা দর্শকদের বিমোহিত করে। একক কণ্ঠে রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করেন মনোপ্রিয়া দেব, কলকাতা থেকে আমন্ত্রিত ড.শিবানী দাস, রত্না মুখোপাধ্যায়, টুন্না মজুমদার । শিলচরের বিশিষ্ট সঙ্গীত শিল্পী শান্তিকুমার ভট্টাচার্যের গান ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। তবলায় অনবদ্য সঙ্গত করেন সন্তোষ চন্দ ও বিপ্লব দে। অনুষ্ঠানে সমবেত সংগীতে অংশ নেয় দিপা মিউজিক ইনস্টিটিউট পরিচালনায় ছিলেন শিবশংকর ধর। রবি-জুঁই সঙ্গীত বিদ্যালয় পরিচালনায় ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষিকা ও সঙ্গীত শিল্পী বাপি রায়। সুর মল্লার মিউজিক ইনস্টিটিউট পরিচালনায় ছিলেন বিশিষ্ট সঙ্গীত শিল্পী ও শিক্ষক শান্তিকুমার ভট্টাচার্য। আবৃত্তির সুরেলা উচ্চারণে মঞ্চ মুখর করেন পুলক রায়, মহুয়া চৌধুরী,রীনা দত্ত, সুজিত কুমার চৌধুরী।

নৃত্যাঞ্জলি সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংস্থার নিবেদনে ‘বীরপুরুষ’ নৃত্যনাট্য এবং শিলচর ইয়ুথ কয়্যারের সমবেত নৃত্য দর্শকের হৃদয় স্পর্শ করে। উভয় পরিবেশনার নৃত্য পরিচালনায় ছিলেন গায়ত্রী দেব এবং সোনালি দে। বিশেষ করে বীরপুরুষ নৃত্যনাট্যের নিখুঁত ভাবপ্রকাশ ও উপস্থাপনা দর্শকমহলে বিপুল প্রশংসা ও করতালি কুড়ায়। এদিন প্রতিটি পরিবেশনাই অনুষ্ঠানে যোগ করে এক নতুন মাত্রা ও বৈচিত্র্য। যন্ত্রানুষঙ্গে ছিলেন সন্তোষ চন্দ, বিপ্লব দে, দিবাকর দাস, তুষার দেব ও উৎপল বিশ্বাস। আলোকধ্বনি নিয়ন্ত্রণে দক্ষতার পরিচয় দেন সুজিত চন্দ্র পাল। এদিন, বিশ্ববঙ্গ সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলন এবং সুরমল্লারের পক্ষ থেকে সন্তোষ চন্দ কে সম্মাননা প্রদান করেন ড.রাধাকান্ত সরকার এবং শান্তিকুমার ভট্টাচার্য।

অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল সম্মাননা প্রদান পর্ব। ওইদিন কলকাতা সহ শিলচরের বিশিষ্টদের সমাজ ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্মাননা জ্ঞাপন করা হয়। সম্মানিতদের তালিকায় ছিলেন স্বর্ণালী চৌধুরী, ড.রাধাকান্ত সরকার, কস্তুরি হোমচৌধুরী, দীপক হোমচৌধুরী, ড.শিবানী দাস, সুব্রত চক্রবর্তী, ড.সিদ্ধার্থ শংকর ভট্টাচার্য, উদয় শংকর গোস্বামী, ড.অখিল পাল, সন্তোষ চন্দ প্রমুখ। দৈনিক অবিচার ও শিলচর হেল্পিং এইড-এর পক্ষ থেকে বিশ্ববঙ্গ সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলনের সভাপতি ড. রাধাকান্ত সরকারকে বিশেষ ট্রফি প্রদান করে সম্মানিত করা হয়। সেই মাহেন্দ্রক্ষণে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন দৈনিক অবিচার পত্রিকার সম্পাদক মনোতোষ ধর, সংস্থার কার্যকরী সভাপতি সন্তোষ চন্দ, অন্যতম কর্মকর্তা দূর্বা সেন, সাধারণ সম্পাদক বিজয় দেবনাথ, যুবদর্পনের সম্পাদক দিলু দাস, সংস্থার সহ-সম্পাদিকা সোনালি নাথ, বরাক প্রহরীর সংযোজক অনুপম দে প্রমুখ।

সুর মল্লার মিউজিক ইনস্টিটিউটের পক্ষ থেকে বিশিষ্টজনদের মানপত্র ও উত্তরীয় প্রদান করা হয়। কলাক্ষেত্রম মিউজিক কলেজের সৌজন্যে নৃত্য প্রতিযোগিতার তিনটি বিভাগের বিজয়ীদের হাতে তুলে দেওয়া হয় আকর্ষণীয় পুরস্কার। এই দুই সংস্থার কর্ণধার হিসেবে রয়েছেন শান্তিকুমার ভট্টাচার্য, অপু সূত্রধর ও তাপস সূত্রধর। যুবদর্পন পত্রিকার পক্ষ থেকে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রের ত্রিশজন কৃতী ব্যক্তিকে উত্তরীয় পরিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়।
প্রারম্ভিক পর্বের সঞ্চালনায় ছিলেন শান্তিকুমার ভট্টাচার্য ও বিপ্লব দে। মূল অনুষ্ঠান সাবলীলভাবে সঞ্চালনা করেন বিশিষ্ট আবৃত্তিকার জনান্তিকা দেব ভট্টাচার্য। বরাককণ্ঠের পক্ষ থেকে তাঁকেও উত্তরীয় ও উপহার দিয়ে সম্মান জানানো হয়।

সারা আসাম রবীন্দ্র নৃত্য প্রতিযোগিতায় প্রথম ও তৃতীয় স্থান অর্জন করে বরাকের মুখ উজ্জ্বল করায় শিশুশিল্পী তনুশ্রী পাল ও শ্রুতি বিশ্বাসকে শিলচর ইয়ুথ কয়্যারের পক্ষ থেকে অভিনন্দন স্মারক প্রদান করেন সাধারণ সম্পাদক সন্তোষ চন্দ। একইসঙ্গে তাঁদের নৃত্যশিক্ষিকা গায়ত্রী দেব এবং আইনজীবী সোনালি দে-র হাতেও সম্মাননা তুলে দেন আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে ড.রাধাকান্ত সরকার এবং সন্তোষ চন্দ।

সভাপতির ভাষণে মনোতোষ ধর বলেন, সংবাদ পরিবেশনের গণ্ডি পেরিয়ে খেলাধুলা ও সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে সমাজ গঠনে সক্রিয় অংশ নিতে চায় বরাক ভ্যালি নিউজপেপার ওনার অ্যাসোসিয়েশন। কার্যকরী সভাপতি সন্তোষ চন্দ আগামীতে আরও বৃহৎ পরিসরে সাংস্কৃতিক আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সকলের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করেন। সঙ্গীতগুরু বিশ্বজিৎ রায়চৌধুরী সংস্থার নিরলস কর্মকাণ্ডের ভূয়সী প্রশংসা করেন। কলকাতা থেকে আগত ড. রাধাকান্ত সরকার শিলচরের আন্তরিক আতিথেয়তা ও গভীর সাংস্কৃতিক চেতনার প্রশংসা করে বক্তব্য রাখেন।
সমগ্র আয়োজনকে সুচারু ও সফল করে তুলতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন সংগঠনের কার্যকরী সভাপতি সন্তোষ চন্দ। তাঁর নেতৃত্বে বরাক ভ্যালি নিউজপেপার ওনার অ্যাসোসিয়েশনের এই সাংস্কৃতিক প্রয়াস শিলচরের সংস্কৃতি পরিমণ্ডলে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল।













