,

বাজেটে ২৫ কোটির টেগোর কালচারাল সেন্টার: বীরভূমেই গড়ার দাবিতে সরব শান্তিনিকেতন, রবীন্দ্রচর্চায় নতুন দিগন্তের প্রত্যাশা

নিজস্ব সংবাদদাতা। বোলপুর: রাজ্য বাজেটে ২৫ কোটি টাকার ‘টেগোর কালচারাল সেন্টার’ নির্মাণের ঘোষণায় উচ্ছ্বাসে ভাসছে রবীন্দ্রতীর্থ শান্তিনিকেতন। এই সাংস্কৃতিক কেন্দ্র বীরভূমেই গড়ে তোলার জোরালো দাবি তুলেছেন আশ্রমিক, শিক্ষক, প্রাক্তনী ও সংস্কৃতিপ্রেমীরা। রবীন্দ্রনাথের ভাবনা ও কর্মের পীঠস্থানেই এই কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা হলে তা সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক হবে বলে মত সকলের। রবীন্দ্রচর্চা আজ বিশ্বের দরবারে: রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে গবেষণা…

নিজস্ব সংবাদদাতা। বোলপুর: রাজ্য বাজেটে ২৫ কোটি টাকার ‘টেগোর কালচারাল সেন্টার’ নির্মাণের ঘোষণায় উচ্ছ্বাসে ভাসছে রবীন্দ্রতীর্থ শান্তিনিকেতন। এই সাংস্কৃতিক কেন্দ্র বীরভূমেই গড়ে তোলার জোরালো দাবি তুলেছেন আশ্রমিক, শিক্ষক, প্রাক্তনী ও সংস্কৃতিপ্রেমীরা। রবীন্দ্রনাথের ভাবনা ও কর্মের পীঠস্থানেই এই কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা হলে তা সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক হবে বলে মত সকলের।

রবীন্দ্রচর্চা আজ বিশ্বের দরবারে: রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে গবেষণা ও চর্চার ক্ষেত্র আজ আর শুধু বাংলা বা ভারতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। হার্ভার্ড থেকে টোকিও, লন্ডন থেকে সিডনি— বিশ্বের নানা প্রান্তের বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক সংগঠন তাঁর সাহিত্য, দর্শন, শিক্ষা ভাবনা এবং মানবতাবাদ নিয়ে নিরন্তর কাজ করে চলেছে। গীতাঞ্জলির নোবেল শতবর্ষ পেরিয়ে আজও রবীন্দ্রনাথ বিশ্বসাহিত্যে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। সেই প্রেক্ষাপটেই রাজ্য সরকারের এই সাংস্কৃতিক কেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগকে অত্যন্ত সময়োপযোগী ও দূরদর্শী পদক্ষেপ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, বিশ্বব্যাপী রবীন্দ্রচর্চাকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে এই কেন্দ্র যুগান্তকারী ভূমিকা নেবে।

শান্তিনিকেতন মানেই রবীন্দ্রনাথের জীবন্ত উপস্থিতি: শান্তিনিকেতন মানেই রবীন্দ্রনাথের জীবনের এক বিস্তৃত ও সৃষ্টিশীল অধ্যায়। এই লালমাটির দেশেই তিনি গড়ে তুলেছিলেন বিশ্বভারতী— যেখানে পূর্ব ও পশ্চিমের মিলনের স্বপ্ন দেখেছিলেন কবি। প্রকৃতির কোলে মুক্তাঙ্গনে শিক্ষার যে বিপ্লব তিনি ঘটিয়েছিলেন, তার সাক্ষী শান্তিনিকেতনের প্রতিটি ধূলিকণা। আর সেই স্বপ্নের টানে আজও দেশ-বিদেশের ছাত্রছাত্রী, গবেষক, শিল্পী ও সংস্কৃতিপ্রেমীরা শান্তিনিকেতনে ছুটে আসেন। ফলে নতুন এই সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের ঘোষণাকে অনেকেই রবীন্দ্রচর্চার পরবর্তী অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে দেখছেন। শান্তিনিকেতনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের আত্মিক যোগই এই কেন্দ্রের জন্য বীরভূমকে সবচেয়ে যোগ্য স্থান করে তুলেছে বলে মনে করেন স্থানীয়রা।

বিশ্বভারতীর আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া: বিশ্বভারতীর ভারপ্রাপ্ত জনসংযোগ আধিকারিক অতিগ ঘোষ এই ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, “রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে চর্চা ক্রমশ বাড়ছে। আমাদের কাছে প্রতিদিনই বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে গবেষকরা আসেন। একটি আধুনিক ও সর্বসুবিধাযুক্ত বিশেষ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র গড়ে উঠলে গবেষণা, আলোচনা, আর্কাইভ সংরক্ষণ ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের সুযোগ আরও বৃদ্ধি পাবে। এটি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত ইতিবাচক ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ।”

আশ্রমিকদের আবেগ ও প্রত্যাশা: শান্তিনিকেতনের প্রবীণ আশ্রমিক সুপ্রিয় ঠাকুর বলেন, “গুরুদেব বলতেন, যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখো তাই, পাইলেও পাইতে পারো অমূল্য রতন। রবীন্দ্রনাথ নিজেই সেই অমূল্য রতন। তাঁকে যত বেশি মানুষের কাছে, বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া যাবে, সমাজ ততই সমৃদ্ধ হবে, মানবিক হবে। রাজ্যের এই উদ্যোগকে আমরা আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাই।” আশ্রমিকদের বিশ্বাস, রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিধন্য এই ভূমিতে প্রতিষ্ঠিত হলে দেশ-বিদেশ থেকে আগত গবেষক ও দর্শনার্থীদের জন্যও তা বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠবে এবং তাঁরা রবীন্দ্র-দর্শনের প্রকৃত আবহ অনুভব করতে পারবেন।

শিক্ষক ও শিক্ষাবিদদের মূল্যায়ন: বিশ্বভারতীর পাঠভবনের প্রাক্তন শিক্ষক কিশোর ভট্টাচার্যের মতে, “বিশ্বভারতী তার প্রতিষ্ঠাকালীন আদর্শ ও শিক্ষাগত দায়িত্ব পালন করে চলেছে। এর পাশাপাশি একটি স্বতন্ত্র, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সাংস্কৃতিক কেন্দ্র গড়ে উঠলে রবীন্দ্রচর্চা আরও বৃহত্তর ও বহুমাত্রিক রূপ পাবে। ডিজিটাল আর্কাইভ, আন্তর্জাতিক সম্মেলন, নাট্য ও সংগীত কর্মশালা, প্রদর্শনী এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। বিশ্বভারতীর পরিপূরক হিসেবেই কাজ করবে এই কেন্দ্র।”

বীরভূমেই চাই টেগোর কালচারাল সেন্টার: প্রবীণ আশ্রমিক সুব্রত সেন মজুমদার ও অপর্ণা সেন মহাপাত্র একযোগে বলেন, “রাজ্য সরকারের এই সিদ্ধান্ত সমগ্র বাঙালি জাতির কাছে গর্বের বিষয়। রবীন্দ্রনাথ বাঙালির শ্রেষ্ঠ সম্পদ। তবে শান্তিনিকেতন বা বীরভূমে এমন একটি কেন্দ্র গড়ে উঠলে তার কার্যকারিতা, প্রাসঙ্গিকতা এবং গ্রহণযোগ্যতা আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। কারণ রবীন্দ্রনাথের চিন্তা, কর্ম, দর্শন ও জীবনযাপনের সঙ্গে এই অঞ্চলের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য, নাড়ির টানের মতো। গঙ্গাকে তার উৎস থেকে বিচ্ছিন্ন করলে যেমন তার মাহাত্ম্য কমে, তেমনই রবীন্দ্রনাথকে শান্তিনিকেতন থেকে বিচ্ছিন্ন করে চর্চা অসম্পূর্ণ।”

স্থান নিয়ে জল্পনা ও নতুন প্রত্যাশার আবহ: তবে ২৫ কোটি টাকার এই টেগোর কালচারাল সেন্টারটি ঠিক কোথায় গড়ে তোলা হবে, সে বিষয়ে রাজ্য সরকার এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি। এই ঘোষণার পর থেকেই শুধু শান্তিনিকেতন নয়, গোটা বীরভূম জেলাজুড়ে এক নতুন প্রত্যাশার আবহ তৈরি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা থেকে ব্যবসায়ী, ছাত্র থেকে শিক্ষক— সকলেই আশায় বুক বাঁধছেন যে রবীন্দ্রনাথের সাধনভূমিতেই গড়ে উঠবে তাঁর নামাঙ্কিত এই আন্তর্জাতিক মানের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। এটি শুধু পর্যটন নয়, গবেষণা ও সংস্কৃতির মানচিত্রে বীরভূমকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে সকলের বিশ্বাস।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *