চোদ্দতম পাসপোর্ট দিবসে মন্ত্রকের চাঞ্চল্যকর ব্যাখ্যা ঘিরে সোশাল মিডিয়ায় ঝড়, উঠছে প্রশ্ন তাহলে নাগরিকত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ কী
বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন। নয়াদিল্লি : বিদেশমন্ত্রকের একটি মাত্র বক্তব্য ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন করে আইনি ও সামাজিক দ্বন্দ্ব। বুধবার মন্ত্রকের তরফে সরকারিভাবে জানিয়ে দেওয়া হল, পাসপোর্ট হল বিদেশ ভ্রমণের জন্য জারি করা একটি প্রশাসনিক নথি মাত্র, এটি কোনওভাবেই নাগরিকত্বের চূড়ান্ত প্রমাণপত্র নয়।
আর ঠিক একই দিন ছিল চোদ্দতম পাসপোর্ট দিবস। এই দিনের তাৎপর্যকেই সামনে রেখে মন্ত্রকের এই ব্যাখ্যায় দানা বাঁধল ব্যাপক বিতর্ক ও আলোচনা। বিদেশমন্ত্রকের এই বক্তব্য একটি বড় সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে। কারণ বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা যায়, ভারত সরকার অ-নাগরিকদের পাসপোর্ট ইস্যু করে না।পাসপোর্ট দেওয়া হয় কেবলমাত্র যারা ভারতীয় নাগরিক, তাদের জন্যই। আবেদনকারীর নাগরিকত্ব যাচাই না করে পাসপোর্ট সেবা কেন্দ্র কখনও পাসপোর্ট জারি করে না। এই প্রসঙ্গে মন্ত্রক আরও ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছে, পাসপোর্ট ব্যক্তির হাতে থাকলেও তা আদতে ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। প্রতিটি পাসপোর্টের শেষ পাতায় স্পষ্ট লেখা থাকে, এটি ভারত সরকারের সম্পত্তি। ভারত সরকার বা তার নির্দেশপ্রাপ্ত কোনও আধিকারিক চাইলে যে কোনও সময় তা বাতিল করতে পারেন বা ফেরত চাইতে পারেন। বুধবার বিদেশমন্ত্রকের এক পদস্থ আধিকারিক সাংবাদিকদের বলেন, পাসপোর্ট প্রাথমিকভাবে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ও বিদেশে ভারতীয়দের পরিচয় যাচাইয়ের জন্য একটি জরুরি ও বাধ্যতামূলক নথি। এর অর্থ হল, কেবলমাত্র কারও কাছে বৈধ পাসপোর্ট থাকলেই তাকে ভারতীয় নাগরিক বলে স্বীকার করে নেওয়া যাবে না। পাসপোর্ট নাগরিকত্ব দেয় না, নাগরিকত্ব থাকার কারণেই পাসপোর্ট দেওয়া হয়। ‘পাসপোর্ট নয়, আধার নয়, ভোটার কার্ডও নয়, তাহলে নাগরিকত্বের চূড়ান্ত প্রমাণপত্র আসলে কী?’ এই প্রশ্ন তুলে এক্স হ্যান্ডেল-সহ ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম ও অন্যান্য সোশাল মিডিয়ায় শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা, তর্ক ও কৌতুক। আইনজীবী, সমাজকর্মী, ছাত্র-ছাত্রী থেকে সাধারণ নাগরিক সকলেই জানতে চাইছেন, দৈনন্দিন জীবনে বহুল ব্যবহৃত এই নথিগুলি যদি নাগরিকত্বের প্রমাণ না হয়, তাহলে সরকারের কাছে নাগরিকত্বের আসল নথি কোনটি। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হল, এই স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার এখনও পর্যন্ত বিস্তারিত ও চূড়ান্ত ব্যাখ্যা দেয়নি। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি আরও বেড়েছে। নাগরিকত্বের প্রমাণ নিয়ে ধোঁয়াশা নতুন নয়, বরং দিন তা জটিল হচ্ছে। চলতি বছরের শুরুতে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন সংক্রান্ত একটি মামলার শুনানির সময় সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করে দেয়, আধার কার্ড নাগরিকত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। আধার শুধুমাত্র একটি বায়োমেট্রিক পরিচয়পত্র। এটি বাসস্থান ও পরিচয় যাচাইয়ের কাজে ব্যবহৃত হয়, কিন্তু জন্মসূত্রে বা অন্য কোনও সূত্রে নাগরিকত্ব প্রমাণ করে না। একইভাবে নির্বাচন কমিশন ও আদালতের বহু রায়ে বলা হয়েছে, ভোটার আইডি কার্ডকেও নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র হিসেবে গণ্য করা যাবে না। ভোটার কার্ড মূলত পরিচয়, বয়স ও বাসস্থানের একটি নথি। নির্বাচনের সময় ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ করে দেওয়াই এর প্রধান কাজ।
প্রসঙ্গত, নাগরিকত্ব আইন, ১৯৫ অনুযায়ী ভারতে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব লাভের জন্য সুনির্দিষ্ট শর্ত রয়েছে। কোনও ব্যক্তি যদি ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি বা তার পরে এবং ১৯৮৭ সালের ১ জুলাইয়ের আগে ভারতের মাটিতে জন্মগ্রহণ করে থাকেন, তবে তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে জন্মসূত্রে ভারতীয় নাগরিক। ১৯৮৭ সালের ১ জুলাইয়ের পরে জন্মগ্রহণকারী কোনও ব্যক্তি নাগরিকত্বের দাবি করতে পারেন, যদি তাঁর বাবা-মায়ের মধ্যে অন্তত একজন জন্মের সময় ভারতীয় নাগরিক হন। আর ৩ ডিসেম্বর ২০০৪ বা তার পরে জন্মগ্রহণকারীদের ক্ষেত্রে শর্ত আরও কড়া করা হয়েছে। এক্ষেত্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পেতে হলে বাবা-মা উভয়কেই ভারতীয় নাগরিক হতে হবে। অথবা বাবা-মায়ের মধ্যে একজন নাগরিক হবেন এবং অন্যজন জন্মের সময় অবৈধ অভিবাসী হিসেবে গণ্য হবেন না। এত আইন, এত শর্ত, এত ব্যাখ্যার পরেও নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে ধোঁয়াশা কাটছে না। পাসপোর্ট, আধার, ভোটার কার্ড, জন্ম সার্টিফিকেট, স্কুলের সার্টিফিকেট কোনোটিই যখন চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে স্বীকৃত নয়, তখন একজন সাধারণ নাগরিক তাঁর নাগরিকত্ব প্রমাণ করবেন কী দিয়ে, সেই প্রশ্নই এখন দেশজুড়ে সবচেয়ে বেশি ঘুরছে। আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিদেশমন্ত্রকের এই বক্তব্যের পর সরকারের উচিত দ্রুত একটি স্বচ্ছ নীতি প্রকাশ করা। নাগরিকত্বের চূড়ান্ত ও একমাত্র গ্রহণযোগ্য প্রমাণপত্র কী হবে, তা স্পষ্ট করে দেওয়া প্রয়োজন। নাহলে ভবিষ্যতে প্রশাসনিক কাজ, আদালতের মামলা ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে আরও জটিলতা ও সমস্যা বাড়বে। পাসপোর্ট দিবসের দিনেই মন্ত্রকের এই মন্তব্য তাই শুধু একটি ব্যাখ্যা নয়, হয়ে উঠেছে জাতীয় আলোচনার নতুন কেন্দ্রবিন্দু।










