বিশেষ প্রতিবেদন। ২১ জুন: বছরের দীর্ঘতম দিন ২১ জুন। এই দিনটিকেই আন্তর্জাতিক যোগদিবস হিসেবে পালন করে গোটা পৃথিবী। কিন্তু কেন ঠিক ২১ জুন? এর পিছনে জড়িয়ে আছে জ্যোতির্বিজ্ঞান, যোগদর্শন আর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ব্যক্তিগত যোগসাধনা।
নরেন্দ্র মোদীর প্রস্তাবেই বিশ্ব স্বীকৃতি
২০১৪ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ সভায় ভাষণ দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী প্রথম ২১ জুনকে আন্তর্জাতিক যোগদিবস করার প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, “যোগ হল ভারতের প্রাচীন উপহার। এটা ব্যায়াম নয়, এটা নিজেকে আবিষ্কারের শৃঙ্খলা। মানবতা আর প্রকৃতির মধ্যে একাত্মতা আনে যোগ।” তাঁর মাত্র ৯০ মিনিটের বক্তৃতার পর মাত্র ৭৫ দিনের মধ্যে ১৭৫টা দেশ এই প্রস্তাবে সমর্থন দেয়। রাষ্ট্রসংঘের ইতিহাসে এত দ্রুত কোনো প্রস্তাব পাশ হয়নি। ২০১৫ সাল থেকে ২১ জুন বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে।
ছোটবেলা থেকে যোগের সঙ্গে যুক্ত নরেন্দ্র মোদী। গুজরাটের ভাদনগরে চা বেচার ফাঁকে যোগ-প্রাণায়াম শিখেছেন। হিমালয়ের গুহায় গিয়ে সাধুদের কাছে যোগের গভীর তত্ত্ব জেনেছেন। মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময় থেকেই গুজরাটে যোগকে জনপ্রিয় করেন। প্রতি বছর ২১ জুন তিনি নিজে কোনো না কোনো শহরে গিয়ে যোগে নেতৃত্ব দেন। তাঁর কথায়, “যোগ আমাকে মানসিক শান্তি দেয়, কাজের শক্তি দেয়।”
বছরের দীর্ঘতম দিনের মাহাত্ম্য
২১ জুন হল উত্তর গোলার্ধের কর্কট সংক্রান্তি বা গ্রীষ্ম অয়নান্ত। এই দিন সূর্য কর্কট রেখার একদম উপরে লম্বভাবে কিরণ দেয়। ফলে দিন হয় প্রায় ১৪ ঘণ্টা, রাত হয় মাত্র ১০ ঘণ্টা। যোগশাস্ত্রে এই সময়কে বলা হয় “উত্তরায়ণের শেষ দিন”। এর পরের দিন থেকেই সূর্য দক্ষিণ দিকে হেলে পড়ে, শুরু হয় দক্ষিণায়ন।
যোগীদের কাছে উত্তরায়ণ হল দেবযান পথ। মানে আলোর পথ, জ্ঞানের পথ, উন্নতির পথ। আর দক্ষিণায়ন হল পিতৃযান পথ, মানে ভিতরে ডোবার পথ, ধ্যানের পথ। তাই ২১ জুন হল সেই সেতু। যে দিন আলো সবচেয়ে বেশি, তার পরের দিন থেকেই মানুষ ভিতরের অন্ধকার দূর করার সাধনায় বসে। যোগ মানেই তো ভিতরের আলো জ্বালানো।
সূর্য আর মানবদেহের বিজ্ঞান
আয়ুর্বেদ আর যোগশাস্ত্র বলে, মানুষের শরীর পাঁচটা উপাদানে তৈরি – মাটি, জল, আগুন, বায়ু, আকাশ। সূর্য হল আগুন বা তেজ তত্ত্বের প্রধান উৎস। ২১ জুন সূর্যের তেজ যখন সবচেয়ে বেশি থাকে, তখন মানবদেহের পিত্ত, পরিপাক শক্তি আর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও স্বাভাবিকভাবে বাড়ে।
প্রাচীন যোগীরা দেখেছিলেন, এই দিনে সূর্যোদয়ের সময় যোগাসন আর প্রাণায়াম করলে সূর্যের শক্তি সরাসরি মেরুদণ্ডের সুষুম্না নাড়ি দিয়ে ওঠে। মন স্থির হয়, দুশ্চিন্তা কমে। তাই যোগের মূল ভঙ্গি “সূর্যনমস্কার” এর জন্ম এই চিন্তা থেকেই। বারোটি ভঙ্গি মানে সূর্যের বারোটি রূপকে প্রণাম।
যোগদর্শন আর ঋতুচক্র
“যোগশ্চিত্তবৃত্তিনিরোধ” – মহর্ষি পতঞ্জলি বলেছিলেন, যোগ হল মনের চঞ্চলতা থামানোর বিজ্ঞান। ২১ জুনের পর ভারতে বর্ষা নামে। প্রকৃতি ধুয়ে মুছে নতুন হয়। কৃষকরা নতুন বীজ বোনে। যোগও মানুষের জীবনে নতুন বীজ বোনার বিজ্ঞান। পুরনো রাগ, জড়তা, রোগ ঝেড়ে ফেলে শরীর-মনকে নতুন করে শুরু করা।
পৌরাণিক কথা আছে, এই দিনেই আদিযোগী শিব প্রথম সাতজন ঋষিকে যোগের জ্ঞান দিয়েছিলেন। তাঁদের বলা হয় সপ্তর্ষি। তাই আধ্যাত্মিক দিক থেকেও ২১ জুনের গুরুত্ব অপরিসীম।
আজ বিশ্বের উৎসব
২০১৫ সালের প্রথম দিন নয়া দিল্লির রাজপথে ৩৫ হাজার মানুষ, ৮৪টা দেশের প্রতিনিধি একসঙ্গে ৩৫ মিনিট যোগ করেছিলেন। গিনেস বইতেও নাম উঠেছিল। আজ ১৯০টার বেশি দেশে ২১ জুন পালিত হয়। আইফেল টাওয়ারের নিচে, সিডনির অপেরা হাউসের সামনে, মিশরের পিরামিডের পাশে – সব জায়গায় মানুষ যোগ করে।
সংস্কৃতি কর্মীদের মতে, নরেন্দ্র মোদীর একটা প্রস্তাব কীভাবে গোটা পৃথিবীর সংস্কৃতি হয়ে উঠল তার প্রমাণ ২১ জুন। এই দিন যোগ করলে মানুষ শুধু শরীরের জড়তা কাটায় না, প্রকৃতির ছন্দের সঙ্গেও এক হয়ে যায়।












