ব্রিগেডে কোরবানির ঈদ, রাস্তায় জমায়েত বন্ধ
বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন: পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এবার রেড রোডের বদলে ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে অনুষ্ঠিত হলো কোরবানির ঈদের নামাজ। বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে আটটায় নামাজ শুরু হয়। রাস্তা আটকে ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং প্রকাশ্যে পশু জবাইয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে রাজ্যের নতুন বিজেপি সরকার।
১৯৫০ সালের প্রাণিসম্পদ আইন কঠোরভাবে কার্যকর করা হয়েছে। এই আইনে গরু, মহিষ, ষাঁড় জবাইয়ের জন্য বয়স ও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত শংসাপত্র বাধ্যতামূলক। শুধু পৌরসভা নির্ধারিত কসাইখানাতেই পশু কাটা যাবে। প্রকাশ্যে জবাই সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ঈদের দিন কলকাতাসহ রাজ্যের বিভিন্ন মসজিদের বাইরে ছিল কড়া পুলিশি নজরদারি। টিপু সুলতান মসজিদ, নরেন্দ্রপুরের মসজিদগুলোর বাইরে মোতায়েন ছিল পুলিশ ও সিআরপিএফ।সরকারের কড়া অবস্থানের প্রভাবে এবার গরুর বাজারে বড় ভাঁটা পড়েছে। ভয়ে অনেকেই এবার গরু কেনাবেচা করেননি। রাস্তা আটকে নামাজ বন্ধের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আগেই কলকাতায় বিক্ষোভ হয়েছিল। রেড রোড সেনাবাহিনীর অধীনে থাকায় গত বছরই নামাজ নিয়ে আপত্তি উঠেছিল। এবার সেনাবাহিনীর অনুমতি নিয়ে ব্রিগেডকে বেছে নেওয়া হয়। পর্যাপ্ত পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবক মোতায়েন ছিল।
‘ক্যালকাটা খিলাফত কমিটি’র সভাপতি ও তৃণমূল নেতা জাভেদ আহমেদ খান বলেন, “ব্রিগেডে অনেকটা জায়গা। নিয়ম মেনে সব ব্যবস্থা হয়েছে। কোনো সমস্যা নেই।” এবার ব্রিগেডে কোনো নেতা-মন্ত্রীকে দেখা যায়নি। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ও সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী শুধু সামাজিক মাধ্যমে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
নামাজ পড়তে আসা মোহম্মদ সোহেল বলেন, “২৫ বছর ধরে রেড রোডে নামাজ পড়তাম। ব্রিগেডে জায়গা বেশি, ট্র্যাফিকের সমস্যা হবে না। কিন্তু রেড রোড থেকে ঈদের অনুষ্ঠান সরছে শুনে খারাপ লেগেছিল।” অনিশ্চয়তার কারণে তিনি এবার পাড়ার মসজিদেই নামাজ পড়েছেন।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার খলিল আহমেদ বলেন, “এই প্রথম ঈদের নামাজকে কেউ রাজনৈতিক কারণে ব্যবহার করেনি। এটাই পজিটিভ দিক।”
তপসিয়ার টালিখোলা মসজিদ এলাকায় এবার ঈদের চিত্র ভিন্ন। সম্প্রতি এখানকার একটি ভবনে আগুন লেগে দুই শ্রমিকের মৃত্যু হয়। বেআইনি নির্মাণের অভিযোগে ভবন ভাঙার নির্দেশ দেয় সরকার। হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ থাকলেও বাসিন্দাদের ঘর ছাড়তে হয়েছে। স্থানীয় আতর বিক্রেতা মোহাম্মদ জুনেইদ বলেন, “অন্যান্য বছর এই রাস্তায় ভিড় হতো, এবার লোক কম।”
কাছাড়: সৌহার্দ্যের বার্তায় শান্তিপূর্ণ ঈদ
ত্যাগ ও সহমর্মিতার বার্তা দিয়ে কাছাড় জেলায় শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হলো ঈদ-উল আযহা। শিলচরের টিকরবস্তি ঈদগাহ, কাঁঠাল পয়েন্ট মসজিদ, বেরেঙ্গা ঈদগাহ, কনকপুর ঈদগাহসহ জেলার বিভিন্ন মসজিদ ও ঈদগাহে হাজারো মুসল্লি নামাজ আদায় করেন।
হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের আবেগকে সম্মান জানিয়ে জেলার বেশিরভাগ জায়গায় গরু কোরবানি পরিহার করে বিকল্প বৈধ পশু কোরবানি দেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া দিয়েছেন মুসলিম সমাজ।
টিকরবস্তি ঈদগাহে নামাজ পড়ান মওলানা মকবুল হোসেন। কাঁঠাল পয়েন্ট মসজিদে নামাজ পরিচালনা করেন হজরত মওলানা আব্দুল ওয়াহিদ বড়ভূঁইয়া। বেরেঙ্গা ঈদগাহে মওলানা ইমদাদুর রহমান লস্কর এবং কনকপুর ঈদগাহে আলহাজ সাকির আহমেদ নামাজ পড়ান।
নামাজের আগে ইমামরা ঈদ-উল আযহার তাৎপর্য তুলে ধরে শান্তি, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ বজায় রাখার আহ্বান জানান। নামাজ শেষে দেশ ও জাতির মঙ্গল কামনায় বিশেষ দোয়া হয়। মুসল্লিরা কোলাকুলি ও শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।
ঈদ উপলক্ষে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে দিনভর নজরদারি চালায় পুলিশ। ছোটখাটো দু-একটি বিক্ষিপ্ত ঘটনা ছাড়া গোটা জেলায় নির্বিঘ্নে উৎসব পালিত হয়েছে।
ঢাকা: কোরবানি করতে গিয়ে শতাধিক আহত, ফরিদপুরে সংঘর্ষ
বকরি ঈদের দিন কোরবানির পশু জবাই করতে গিয়ে জখম হয়েছেন শতাধিক মানুষ। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ, পঙ্গু হাসপাতালসহ বিভিন্ন চিকিৎসাকেন্দ্রে তাঁদের ভর্তি করা হয়েছে।
ঢাকায় কোরবানির গরুর লাথি, শিংয়ের গুঁতা খেয়ে এবং মাংস কাটাকাটির সময় জখম হয়েছেন অনেকে। বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকেল ৩টার মধ্যে ৮০ জন জখম ব্যক্তি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নেন। গুরুতর আহত ২০ জনকে পঙ্গু হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে।
আহত ব্যক্তিরা রাজধানীর নারিন্দা, ওয়ারি, লালবাগ, কোতোয়ালি, সূত্রাপুর, চকবাজার, হাজারিবাগ, বংশাল, সবুজবাগ, উত্তরা, বাড্ডা, ধানমণ্ডি, কলাবাগান, মিরপুর ও পল্লবীসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে এসেছেন।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. কলিন্স মল্লিক জানান, অধিকাংশই কোরবানির পশু জবাই ও মাংস কাটাকাটির সময় অসাবধানতার কারণে আঘাত পেয়েছেন। কেউ গরুর লাথি ও শিংয়ের আঘাতে আহত হয়েছেন, আবার কেউ মাংস কাটতে গিয়ে ধারালো অস্ত্রের আঘাত পেয়েছেন।
চিকিৎসা কর্মীরা জানান, প্রতিবছর ঈদুল আজহায় কোরবানির সময় এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলেও এবারের ঘটনায় আহতের সংখ্যা বেশি।
এদিকে ফরিদপুরের ভাঙ্গায় ভাগে কেনা গরু কোরবানির মাংস মসজিদ এলাকায় বসে ভাগ করা হবে, নাকি বাড়িতে বসে ভাগ করা হবে, এই নিয়ে সংঘর্ষে ২০ জন জখম হয়েছেন।












