শ্রীহট্ট সম্মিলনীর সাথে যুক্ত, সভানেত্রী কৃষ্ণা দাশগুপ্তের ছোট ভাই
৮ দেশে ২৫ ধরনের ব্যবসা, লস এঞ্জেলেসে ‘কেপিসি সিটি’, পূর্বাচলে ১৪২ তলার টাওয়ার
ওবামা-রিগ্যান-বুশ-ক্লিনটনের ডিনার সঙ্গী, দত্তরাইলে গড়ছেন বিশ্বমানের মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
শ্রীহট্টের মাটি থেকে বিশ্বমঞ্চে: ড.কালী প্রদীপ চৌধুরী

সন্তোষ চন্দ: কালী প্রদীপ চৌধুরী শুধু একজন বিশ্ববরেণ্য অর্থোপেডিক সার্জন বা সফল উদ্যোক্তা নন, তিনি বাঙালির আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। জন্ম বাংলাদেশের সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার ঐতিহাসিক ঢাকা দক্ষিণ দত্তরাইল গ্রামে। তিনি এককালের প্রতাপশালী জমিদার কালিপ্রসন্ন দত্তচৌধুরীর সন্তান। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার লস এঞ্জেলেসে স্থায়ী হলেও শিকড়ের টান তাঁকে বারবার ফিরিয়ে আনে বাংলাদেশে।
শ্রীহট্টের সাথে নাড়ির যোগ
ড.চৌধুরী প্রবাসে থেকেও শ্রীহট্টের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষায় সদা সক্রিয়। তিনি শ্রীহট্ট সম্মিলনীর সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। শ্রীহট্ট সম্মিলনীর বর্তমান সভানেত্রী কৃষ্ণা দাশগুপ্ত সম্পর্কে তাঁর বড় বোন। পারিবারিক বন্ধনের পাশাপাশি বৃহত্তর সিলেটবাসীর কল্যাণে দুই ভাই-বোন একসঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন।
শিক্ষাজীবন: সিলেট থেকে বিশ্ব
প্রাথমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক: ছেলেবেলা কেটেছে দত্তরাইল গ্রামেই। সিলেটের ঐতিহ্যবাহী মুরারিচাঁদ কলেজ, এমসি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন।
এমবিবিএস: কলকাতার স্বনামধন্য ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন।
উচ্চতর ডিগ্রি: থেমে থাকেননি সেখানেই। মালয়েশিয়া, ইংল্যান্ড, কানাডা ও আমেরিকা থেকে অর্থোপেডিক সার্জারিতে একাধিক ফেলোশিপ ও উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করেন। চিকিৎসক হিসেবে তাঁর হাত ধরে বহু মানুষ নতুন জীবন পেয়েছেন।

৮ ডলারের জেদ: আমেরিকার মাটিতে সংগ্রাম
নতুন কিছু করার তীব্র বাসনা নিয়ে পকেটে মাত্র ৮ ডলার সম্বল করে আমেরিকার মাটিতে পা রাখেন তরুণ কালী প্রদীপ। স্বপ্ন ছিল বড় কিছু করার। কিন্তু শুরুতেই হোঁচট। লস এঞ্জেলেসের একটি হাসপাতালে কাজ চাইতে গেলে কর্তৃপক্ষ তাঁকে ফিরিয়ে দেয়। বিদেশ-বিভুঁইয়ে একজন নবাগত বাঙালি যুবকের জন্য সেটা ছিল বড় ধাক্কা।
কিন্তু জেদ চেপে বসে তাঁর। ঠিক করলেন, এই হাসপাতালেই চাকরি করবেন। শুরু হলো লড়াই। দীর্ঘ ১১ মাস ধরে প্রতিদিন হাসপাতালের দরজায় ধর্ণা দিয়েছেন, আবেদন করেছেন, নিজের যোগ্যতা প্রমাণের চেষ্টা করেছেন। শেষ পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ তাঁকে সুযোগ দিতে বাধ্য হয়।
যে চ্যালেঞ্জ ইতিহাস গড়ল
চাকরি পাওয়ার কয়েক মাস পরের ঘটনা। একদিন হাসপাতালের অ্যাডমিনিস্ট্রেটরকে তিনি চ্যালেঞ্জ করে বসলেন, ‘এই হাসপাতাল আমি একদিন কিনে নেব।’ উপস্থিত সবাই হেসে উঠেছিল। একজন অভিবাসী চিকিৎসকের মুখে এমন কথা উপহাসেরই যোগ্য। অ্যাডমিনিস্ট্রেটরও মাঝেমধ্যে তাঁকে খোঁচা দিয়ে বলতেন, ‘কি হে, হাসপাতাল কবে কিনছো?’
সময় গড়ালো। কালী প্রদীপ চৌধুরী চিকিৎসক হিসেবেই থেমে থাকলেন না। ধীরে ধীরে ব্যবসার জগতে পা রাখলেন। কঠোর পরিশ্রম, দূরদর্শিতা আর অদম্য মনোবল দিয়ে একে একে গড়ে তুললেন নিজের সাম্রাজ্য। ১৩ বছর পর সেই অ্যাডমিনিস্ট্রেটর অবাক বিস্ময়ে দেখলেন, সেদিনের সেই বাঙালি যুবক সত্যি সত্যি গোটা হাসপাতালটি কিনে নিয়েছেন। সেই কেনার মধ্য দিয়েই জন্ম নেয় ‘কেপিসি গ্রুপ’।

বিশ্বজোড়া কেপিসি সাম্রাজ্য: এক নজরে
কেপিসি গ্রুপ আজ বিশ্বের প্রায় ৮টি দেশে স্বাস্থ্যসেবা, ওষুধ শিল্প, শিক্ষা, রিয়েল এস্টেট, চা-বাগান, পারমাণবিক শক্তিসহ ২৫ ধরনের ব্যবসা সফলভাবে পরিচালনা করছে।
১. স্বাস্থ্যসেবা খাতে বিপ্লব
কেপিসি হেলথ: দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় এই হেলথ কেয়ার গ্রুপের অধীনে রয়েছে একাধিক হাসপাতাল, ক্লিনিক ও মেডিকেল সেন্টার। আমেরিকার স্বাস্থ্যখাতে কেপিসি এখন একটি বিশ্বস্ত নাম।
মেডিকেল কলেজ: যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতে ১০০০ শয্যা বিশিষ্ট ২৬টি বিশ্বমানের মেডিকেল কলেজ পরিচালনা করছে কেপিসি গ্রুপ। এর মধ্যে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের যাদবপুরে অবস্থিত কেপিসি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল অন্যতম।
হাসপাতালের সংখ্যা: ২০২০ সালের হিসাব অনুযায়ী, এককভাবে কেপিসি গ্রুপের অধীনে হাসপাতালের সংখ্যা ৭০টি ছাড়িয়ে গেছে।
২. রিয়েল এস্টেট ও অবকাঠামো
বিশাল বাড়ি: ক্যালিফোর্নিয়ায় সাড়ে ৩ কিমি আয়তনের দৃষ্টিনন্দন বাড়িতে বসবাস করেন ড.চৌধুরী।

জমির পরিমাণ: শুধু আমেরিকাতেই কেপিসি গ্রুপের আছে ৭,০০০ একর জমি। আছে ৩০ লাখ বর্গফুটের বিশাল বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান।
কর্মসংস্থান: তাঁর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২০ হাজার মানুষ কাজ করেন।
৩. চা-বাগান থেকে নিউক্লিয়ার প্লান্ট
চা-বাগান: ভারতে কেপিসি গ্রুপের মালিকানায় রয়েছে ১৬টি চা-বাগান। এর মধ্যে একটির আয়তন ৫০,০০০ একর।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র: ইউক্রেনে আছে তাঁর নিজস্ব নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট। একজন বাঙালি ব্যবসায়ীর জন্য যা রীতিমতো অবিশ্বাস্য অর্জন।
বিশ্বনেতাদের ঘনিষ্ঠজন
ব্যবসা ও চিকিৎসার বাইরেও বিশ্ব রাজনীতির শীর্ষ ব্যক্তিদের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, রোনাল্ড রিগ্যান, জর্জ বুশ সিনিয়র, জর্জ ডব্লিউ বুশ এবং সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন তাঁর নিয়মিত ডিনার সঙ্গী। এই সখ্যতাই প্রমাণ করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ও প্রভাব কতটা সুদূরপ্রসারী।

আমেরিকার বুকে বাঙালির নামে শহর ও সড়ক
ড.কালী প্রদীপ চৌধুরীর সম্মানে যুক্তরাষ্ট্রের লস এঞ্জেলসে ৫৫ কিমি দীর্ঘ একটি সড়কের নামকরণ করা হয়েছে ‘কেপিসি রোড’। এখানেই শেষ নয়। লস এঞ্জেলসেই তাঁর নামে গড়ে উঠেছে একটি শহর, যার নাম ‘কেপিসি সিটি’। প্রবাসে একজন বাঙালির জন্য এর চেয়ে বড় সম্মান আর কী হতে পারে!
মাতৃভূমির প্রতি দায়বদ্ধতা: স্বপ্নের প্রকল্প
বিলিয়ন ডলারের মালিক হয়েও ভোলেননি জন্মভূমির কথা। দত্তরাইল গ্রামে তাঁর উদ্যোগে গড়ে উঠেছে ৩টি কলেজ। এর মধ্যে একটিতে ৫টি বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু আছে। কিন্তু তাঁর স্বপ্ন আরও বড়।
১. দত্তরাইলে বিশ্বমানের মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
বাংলাদেশে বর্তমানে একটিমাত্র মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এই অভাব পূরণে ড.চৌধুরী সিদ্ধান্ত নেন, নিজ গ্রামে পৈতৃক ৩৫ একর জমির উপর গড়ে তুলবেন আন্তর্জাতিক মানের মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।
তবে শুরুটা সহজ ছিল না। জাতীয় পর্যায়ের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা চেয়েছিলেন প্রকল্পটি ঢাকায় হোক। অন্যদিকে স্থানীয় ভূমিদস্যুরা নিজেদের স্বার্থহানির ভয়ে এর বিরোধিতা করে। নানা বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে অবশেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরাসরি হস্তক্ষেপ করেন। তাঁর নির্দেশে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এবং অর্থমন্ত্রীর সহোদর সাবেক রাষ্ট্রদূত একেএম আব্দুল মোমেন এই প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব নেন।
সিদ্ধান্ত হয়, জমিদার বাড়ির পৈতৃক সম্পত্তির উপরই হবে এই বিশ্ববিদ্যালয়। ড.কালী প্রদীপ চৌধুরী ও তাঁর সহোদরা তৃঞ্চা দত্তের বিশ্বাস, এই বিশ্ববিদ্যালয় চালু হলে দেশ-বিদেশ থেকে রোগীরা চিকিৎসা নিতে ছুটে আসবেন দত্তরাইলে। কালিপ্রসন্ন দত্ত চৌধুরীর জনসেবার স্বপ্ন বড় পরিসরে বাস্তবায়িত হবে।

২. কেপিসি টাওয়ার: আকাশছোঁয়া অহঙ্কার
ঢাকার পূর্বাচলে নির্মিত হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আকাশচুম্বী ভবন ‘ড.কালী প্রদীপ চৌধুরী টাওয়ার, দত্তরাইল’ বা ‘কেপিসি টাওয়ার’। ১৪২ তলা বিশিষ্ট এই আইকনিক টাওয়ার নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৩২,০০০ কোটি টাকা। নির্মাণ শেষ হলে এটি হবে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম উঁচু ভবন।
জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই টাওয়ারের উদ্বোধন করার কথা ছিল। কেপিসি টাওয়ারের কাজ শেষ হলেই দত্তরাইলে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মাণ কাজ পুরোদমে শুরু হবে।
শেষ কথা: অনুপ্রেরণার অন্য নাম
‘বাঙালি ব্যবসা পারে না’, ‘বাঙালি ঝুঁকি নিতে জানে না’— প্রচলিত এই মিথগুলোকে গুঁড়িয়ে দিয়েছেন ড. কালী প্রদীপ চৌধুরী। ৮ ডলার পকেটে নিয়ে অচেনা দেশে পাড়ি জমানো এক যুবক শুধু নিজের ভাগ্যই বদলাননি, বদলে দিয়েছেন বাঙালি সম্পর্কে বিশ্বের ধারণা।
দানশীলতা ও সমাজসেবায়ও তিনি অগ্রগণ্য। বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত থেকে আর্তমানবতার সেবা করে যাচ্ছেন নিরন্তর। মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও কেপিসি টাওয়ারসহ সব কাজে তিনি এলাকাবাসীর সর্বাত্মক সহযোগিতা কামনা করেছেন।
সিলেটের এককালের দাপুটে জমিদার পরিবারের এই সন্তান আজ বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন। তাঁর জীবন নতুন প্রজন্মকে শেখায়, স্বপ্ন দেখতে জানলে, জেদ আর পরিশ্রম থাকলে শূন্য থেকেও বিশ্ব জয় করা সম্ভব। ড.কালী প্রদীপ চৌধুরী তাই শুধু একটি নাম নন, তিনি একটি প্রতিষ্ঠান, একটি অনুপ্রেরণা।













