বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন: আজ পাঁচই জুন, বিশ্ব পরিবেশ দিবস। তাপমাত্রা বাড়ছে, বৃষ্টির দেখা মিলছে কম, বাতাসে বাড়ছে দূষণ। এই কঠিন বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে চুপ করে থাকেনি শিলচরের সম্মিলিত সাংস্কৃতিক মঞ্চ। দিনটিকে তাঁরা কেবল পালন করলেন না, পালন করলেন দায়িত্ববোধ দিয়ে। এবারের মূল বার্তা তাঁরা ঠিক করলেন “সবুজে বাঁচুক আগামী প্রজন্ম”। অর্থাৎ, ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত রাখতে হলে আজ থেকেই গাছ রোপণ করতে হবে।

ভোর থেকেই শহরের বিভিন্ন প্রান্তে দেখা গেল এক অন্যরকম ছবি। মঞ্চের কর্মীরা হাতে গাছের চারা নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। তাঁদের উদ্দেশ্য স্পষ্ট যত বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানো যায়। স্কুলের সামনে, বাজারের মোড়ে, অফিসপাড়ায় যেখানেই মানুষের ভিড়, সেখানেই তাঁরা দাঁড়ালেন। প্রতিটি চারা তুলে দেওয়ার সঙ্গে মানুষকে মনে করিয়ে দিলেন, একটি গাছ মানে শুধু কাঠ নয়, একটি গাছ মানে বিশুদ্ধ বাতাস, মানে আগামীর নিঃশ্বাস।

মঞ্চের ভাবনা খুব সহজ। বক্তৃতা-সেমিনারে সচেতনতা তৈরি হয়, কিন্তু পৃথিবী বাঁচে গাছ রোপণে। তাই এবার তাঁরা “কথা কম, কাজ বেশি” নীতিতে বিশ্বাসী হলেন। শহরজুড়ে চলল বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি। পাশাপাশি সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের হাতে তুলে দেওয়া হল গাছের চারা। কারণ মঞ্চ মনে করে, সমাজের নেতৃত্বস্থানীয় মানুষেরা এগিয়ে এলে গোটা শহর একসঙ্গে জেগে উঠবে।

আজকের এই কর্মসূচিতে অংশ নিলেন শিলচরের পাঁচজন সম্মানীয় ব্যক্তিত্ব। তাঁদের হাতে চারা তুলে দিয়ে মঞ্চ বোঝাতে চাইল, পরিবেশ রক্ষা শুধু স্বেচ্ছাসেবীদের দায়িত্ব নয়, এটা সকলের দায়িত্ব। চারা গ্রহণ করেন শিলচরের অ্যাডিশনাল কমিশনার অন্তু বরদলৈ, অ্যাডিশনাল সিজিএম সুবর্ণজ্যোতি দেব, বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি দুলাল মিত্র, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের প্রান্ত সভাপতি শান্তনু নায়েক এবং শিলচর পুর নিগমের সৌরভ দেব। চারা হাতে নিয়ে তাঁরাও প্রতিশ্রুতি দিলেন, নিজ ক্ষেত্র থেকে সবুজায়নের বার্তা ছড়িয়ে দেবেন।
মঞ্চের পক্ষে মাঠে ছিলেন সহ-সভাপতি সুবীর ভট্টাচার্য, সন্তোষ চন্দ, দেবরাজ ভট্টাচার্য, শায়ন রায় কুটন ও শৈবাল গুপ্ত। তীব্র রোদ মাথায় নিয়ে তাঁরা সাধারণ মানুষের হাতে চারা তুলে দিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্যে ছিল আবেগ, সঙ্গে ছিল বাস্তবতার শিক্ষা। তাঁরা বললেন, আমরা কেউ চিরকাল থাকব না। কিন্তু আমাদের রোপণ করা একটি গাছ শত বছর ধরে ছায়া দেবে, ফল দেবে, অক্সিজেন জোগাবে। এটাই তো আমাদের আসল উত্তরাধিকার।

কর্মসূচির ফাঁকে রাস্তায় বেরিয়ে মঞ্চের সদস্যরা একটি বেদনাদায়ক দৃশ্যের মুখোমুখি হন। শহরের বিভিন্ন রাস্তার পাশে দেখা যায় কেটে রাখা গাছের গুঁড়ি। গাছ কাটা হয়েছে বহু দিন আগেই, কিন্তু কাটা অংশগুলো আজও সরানো হয়নি। অফিস পাড়ার রাস্তার পাশেও পড়ে আছে বড় বড় গাছের অবশেষ। আজকের মতো একটি দিনে চোখের সামনে এই দৃশ্য মঞ্চের সদস্যদের মনে গভীর বেদনার জন্ম দেয়। তাঁরা দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, একদিকে আমরা গাছ রোপণ করছি, অন্যদিকে রাস্তার ধারে কাটা গাছ অবহেলায় পড়ে থাকছে। এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। মঞ্চ আশা প্রকাশ করে, সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে দ্রুত সচেতন হবেন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে মঞ্চের সহ-সভাপতি সুবীর ভট্টাচার্য কৃতজ্ঞতা জানালেন শিলচর বনবিভাগকে। তাঁদের সরবরাহ করা উন্নত মানের চারা এবং আন্তরিক সহযোগিতা ছাড়া এই কর্মসূচি সফল হতো না। বনবিভাগের কর্মীদের সহায়তাই আজ শহরের নানা প্রান্তে সবুজের স্পর্শ পৌঁছে দিতে সাহায্য করেছে।
দিনের শেষে মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক অজয়কুমার রায় শিলচরবাসী ও শুভানুধ্যায়ীদের ধন্যবাদ জানালেন। তিনি বললেন, আপনাদের সমর্থন আছে বলেই আমরা কাজ করার সাহস পাই। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক মঞ্চ আগামীতেও পরিবেশ রক্ষা সহ সমাজের সকল ভালো কাজে নিজেকে যুক্ত রাখবে। তবে এই পথ চলা একার নয়। শিলচরকে সত্যিকারের সবুজ শহর হিসেবে গড়ে তুলতে প্রতিটি মানুষকে নিজের জায়গা থেকে এগিয়ে আসতে হবে। বিদায় বেলায় মঞ্চের পক্ষ থেকে সকলের কাছে আহ্বান আজকের দিনটিকে শুধু শুভেচ্ছা জানিয়ে শেষ করবেন না। বাড়ির আঙিনায়, পাড়ার খালি জায়গায়, রাস্তার ধারে — যেখানেই একটু ফাঁকা জায়গা দেখবেন, সেখানেই একটি গাছ রোপণ করুন। তাকে যত্ন করুন, বড় হতে দিন। কারণ পৃথিবী আমাদের মায়ের মতো। মা সুস্থ থাকলে সন্তানও সুস্থ থাকে। তাই মা পৃথিবীকে সুস্থ রাখার দায়িত্ব আমাদের সকলের। সময় আর নষ্ট না করে, এখনই সময় গাছের পাশে দাঁড়ানোর।












