,

শিকড়ের টানে ৯ বছর: ‘সহজ আলাপ’ থেকে ‘আনন্দ-লোক’  লোকায়ত চেতনায় ফকিরার জয়যাত্রা

২০৭ জন প্রশিক্ষার্থীর মঞ্চে আত্মপ্রকাশ, কলকাতার ঋষি চক্রবর্তীর মুগ্ধ করা পরিবেশনা, ১৭ জন গুণীজনকে সংবর্ধনা ও প্রতিকূলতার মধ্যেও সংস্কৃতি বাঁচিয়ে রাখার লড়াই বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন : শিলচর শহরের যুব প্রজন্মের বাংলা গানের দল ‘ফকিরা’ তাদের ৯ বছরের গৌরবময় পথচলা উদযাপন করল লোকায়ত গানের ধারাকে আঁকড়ে ধরেই। প্রতিষ্ঠার দিন থেকেই ফকিরা শুধু মঞ্চে গান গাওয়ার মধ্যে নিজেদের…

২০৭ জন প্রশিক্ষার্থীর মঞ্চে আত্মপ্রকাশ, কলকাতার ঋষি চক্রবর্তীর মুগ্ধ করা পরিবেশনা, ১৭ জন গুণীজনকে সংবর্ধনা ও প্রতিকূলতার মধ্যেও সংস্কৃতি বাঁচিয়ে রাখার লড়াই

বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন : শিলচর শহরের যুব প্রজন্মের বাংলা গানের দল ‘ফকিরা’ তাদের ৯ বছরের গৌরবময় পথচলা উদযাপন করল লোকায়ত গানের ধারাকে আঁকড়ে ধরেই। প্রতিষ্ঠার দিন থেকেই ফকিরা শুধু মঞ্চে গান গাওয়ার মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখেনি। বরং এই সময়ের তরুণ প্রজন্মকে শিকড়ের সঙ্গে পুনরায় সংযোগ ঘটাতে এবং লোকসংস্কৃতির চর্চাকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতায় প্রতিনিয়ত নিজেকে উজাড় করে দিয়েছে এই দলটি। যা আজকের ব্যস্ত ও যান্ত্রিক সময়ে নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। দলের বার্ষিক আয়োজন ‘সহজ আলাপ’ কর্মশালা এবং কর্মশালার শেষে মূল সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা ‘আনন্দ-লোক’ এই দুই আয়োজনের মাধ্যমেই ফকিরা বিগত ৯ বছর ধরে লোকায়ত গানের চর্চাকে প্রসারিত করে চলেছে। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি এবং আগামীতেও হবে না বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন দলের প্রাণপুরুষ লোক শিল্পী সায়ন রায় কুটন এবং দেবরাজ ভট্টাচার্য। গত ১২ জুলাই শিলচরের বঙ্গ ভবনে দিনভর ছিল বর্ণাঢ্য এই আয়োজন।

অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বের সূচনা হয় একেবারে লোকাচার মেনে। শিশু শিল্পীদের হাত ধরে তুলসীগাছে প্রদীপ প্রজ্জ্বলন এবং পাশে সন্ধ্যা আরতির কীর্তনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় ‘আনন্দ-লোক’। একেবারে অন্যরকম এই সূচনা দর্শকদের মনে এক অনাবিল প্রশান্তি এনে দেয়। এরপরই মঞ্চে ওঠে এবারের ‘সহজ আলাপ’ কর্মশালার ২০৭ জন প্রশিক্ষার্থী। ঋষি চক্রবর্তী-র সার্বিক পরিচালনায় ক্ষুদে থেকে তরুণ মিলিয়ে ২০৭ জন প্রশিক্ষার্থী একসঙ্গে ৬টি উদ্বোধনী সংগীত পরিবেশন করে গোটা হল কাঁপিয়ে দেয়। নতুন প্রজন্মের কণ্ঠে লোকগান শুনে উপস্থিত অভিভাবক ও দর্শকরা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। এরপরই ছিল এদিনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব গুণীজন সংবর্ধনা। শিক্ষা, সংস্কৃতি, সাংবাদিকতা ও সমাজসেবার বিভিন্ন বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে নীরবে কাজ করে যাওয়া ১৭ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বকে এদিন সংবর্ধনা জানানো হয় ফকিরার পক্ষ থেকে। সংবর্ধিতরা হলেন সংস্কৃতি কর্মী গোরা চক্রবর্তী, বিশিষ্ট গীতিকার বাপি দত্তরায়, সুরকার ও যন্ত্র শিল্পী ঋষিকেশ চক্রবর্তী, যন্ত্রশিল্পী সৌমেন পালচৌধুরী, সানাই বাদক নলিনী শব্দকর, তবলা শিল্পী পণ্ডিত নিলয় কান্তি দত্ত, সমুদ্র শিহর বিশ্বাস, নাট্যকার শান্তনু পাল, বিশিষ্ট সাংবাদিক তমোজিত ভট্টাচার্য, বিশিষ্ট সাংবাদিক বিকাশ চক্রবর্তী, সমাজসেবী স্বর্ণালি চৌধুরী, সাংবাদিক, তবলা বাদক ও সংস্কৃতিকর্মী সন্তোষ চন্দ, সামাজিক কর্মী দিলু দাস, সামাজিক কর্মী মিঠুন রায়, সাংস্কৃতিক কর্মী ভাস্কর দাস, বিশিষ্ট আইনজীবী ও নাট্যকার অজয় কুমার রায়, সমাজ কর্মী সঞ্জীব রায় এবং সংস্কৃতিকর্মী কানাইলাল দাস।

সাংস্কৃতিক পর্বে নৃত্যেরও ছিল বিশেষ আয়োজন। শুভ্রাংশু নাথ মজুমদার-এর পরিচালনায় নিক্কন সঙ্গীত বিদ্যালয় এবং গায়ত্রী দেব ও আইনজীবী সোনালি দে-র পরিচালনায় নৃতাঞ্জলি সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংস্থার শিল্পীদের পরিবেশিত লোকনৃত্য অনুষ্ঠানে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। রঙিন পোশাকে, ছন্দে ছন্দে লোকনৃত্যের পরিবেশনা দর্শকদের মুগ্ধ করে।

এদিনের মূল আকর্ষণ ছিল কলকাতা থেকে আগত জি-বাংলা খ্যাত সঙ্গীত শিল্পী ঋষি চক্রবর্তী-র বিশেষ পরিবেশনা। শুরুতে ঋষি চক্রবর্তীর হাতে আয়োজক সংস্থার পক্ষ থেকে উত্তরীয়, ফুলের তোড়া এবং স্মারক দিয়ে সম্মান জানানো হয়। শহরের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংস্থার পক্ষ থেকেও শিল্পীকে সম্মান জানান। এদিন মঞ্চে ঋষি চক্রবর্তী প্রমাণ করে দিলেন জাত শিল্পী কাকে বলে। একের পর এক লোকায়ত ও আধুনিক গানের মিশেলে তিনি এমন এক জাদু সৃষ্টি করেন যে বাচ্চা থেকে বয়স্ক সকলেই আসন ছেড়ে গানের তালে নাচতে বাধ্য হন। তার গায়কি, উপস্থাপনা ও দর্শকের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের ক্ষমতা গোটা বঙ্গ ভবনকে এক সুরের বন্ধনে বেঁধে ফেলে। লোক সঙ্গীত যদি প্রাণ দিয়ে গাওয়া যায় এবং যন্ত্র শিল্পীদের প্রকৃত সহযোগিতা থাকে তাহলে দর্শককে নাচতে বাধ্য করা যায় ঋষি চক্রবর্তী সেদিন তার জ্বলন্ত প্রমাণ রেখে গেলেন।

সমগ্র অনুষ্ঠান জুড়ে শিল্পীদের সঙ্গে যন্ত্রসঙ্গীতে অসাধারণ সহযোগিতা করেন নিরুপম বরভুইয়া কিবোর্ডে, সৌমেন পালচৌধুরী বাঁশিতে, সুদর্শন নাথ ব্যাঞ্জোতে, শিবম পাল ও সায়ন্তন ভট্টাচার্য পারকাশনে, শুভ্রাংশু পাল বাংলা ঢোলে, স্বর্ণদীপ দেব অক্টোপ্যাডে এবং সায়ন রায় কুটন নিজে হারমোনিয়ামে। অনুষ্ঠানে মনোমুগ্ধকর সঞ্চালনা করেন সংস্কৃতিকর্মী এবং তবলাবাদক বিপ্লব দে। মঞ্চ সজ্জার দায়িত্বে ছিলেন অঙ্কন কংসবণিক। এদিনের গোটা মঞ্চটি উৎসর্গ করা হয় সদ্য প্রয়াত বিশিষ্ট সংস্কৃতিকর্মী স্বর্গীয় সনজিৎ রায়-এর স্মৃতির উদ্দেশ্যে।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে ‘সহজ আলাপ’ কর্মশালার ২০৭ জন প্রশিক্ষার্থীর হাতে শংসাপত্র তুলে দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। হল ভর্তি দর্শক এদিন আনন্দের সঙ্গে পুরো অনুষ্ঠান উপভোগ করেন।

তবে আনন্দের মাঝেও ছিল বাস্তবতার কঠিন ছবি। শিলচর শহরে লোকসংস্কৃতি নিয়ে কাজ করা কয়েকটি সংগঠনের মধ্যে ফকিরা অন্যতম হলেও আর্থিক দিক থেকে তারা ভীষণভাবে পিছিয়ে। অন্যান্য জেলার মতো বরাক উপত্যকায় সংস্কৃতির প্রচার ও প্রসারের জন্য এগিয়ে আসা কোনো কর্পোরেট কোম্পানি নেই এবং সরকারের পক্ষ থেকেও কোনো আর্থিক সাহায্য পাওয়া যায় না। এই প্রতিকূলতার মধ্যেও মাত্র এক-দুইজন সংস্কৃতিপ্রিয় ব্যক্তির সাহায্য ও নিজেদের উদ্যোগে অনুষ্ঠান করতে হয়। অনুষ্ঠান শেষে দেখা যায় বাজারে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা ঋণ। প্রায় প্রতিটি সাংস্কৃতিক সংগঠনেরই অবস্থা একই। তবুও সায়ন-দেবরাজ যে সাহস ও নিষ্ঠার সঙ্গে বিনাস্বার্থে সংস্কৃতির জন্য কাজ করে যাচ্ছেন তার মূল্যায়ন আগামী প্রজন্মই করবে বলে মনে করেন অনেকেই। নতুন প্রজন্মকে শিকড় চেনাতে এবং লোকসংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে এ ধরনের কর্মশালা ও অনুষ্ঠানের আয়োজন যে কতটা জরুরি তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ফকিরা লোক গানের দলের প্রতিটি সদস্যের অক্লান্ত পরিশ্রম একদিন অবশ্যই সার্থক হবে এই আশাতেই বুক বেঁধে আছেন শিলচরের অসংখ্য সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *