আসামের বাঙালির অধিকার রক্ষার সংগ্রামে তাঁর অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে
বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন। শিলচর: ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৫—আসাম আন্দোলনের উত্তাল সময়ে ‘সারা আসাম ছাত্র সংস্থা’ (AASU)-র নেতৃত্বে যে আন্দোলন গোটা আসামে ছড়িয়ে পড়েছিল, তার অভিঘাতে আসামের বাঙালি জনগোষ্ঠীর নাগরিক অধিকার, নিরাপত্তা, ভাষা ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব গভীর সংকটের মুখে পড়ে। সেই কঠিন সময়ে বাঙালি-সহ সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নাগরিক অধিকার রক্ষার লক্ষ্যে যে কয়েকটি শক্তি সংগঠিতভাবে কাজ করেছিল, তাদের মধ্যে ‘নাগরিক অধিকার রক্ষা কমিটি, আসাম’ ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন। এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন গুয়াহাটি হাইকোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী কালিপদ সেন।
১৯৮৫ সালের ১৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর নেতৃত্বে কেন্দ্র ও আসাম আন্দোলনের নেতৃবৃন্দের মধ্যে ‘আসাম চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার রক্ষার প্রশ্নে ‘নাগরিক অধিকার রক্ষা কমিটি’ এবং সংশ্লিষ্ট শক্তিগুলি রাজনৈতিক পরিসরে নিজেদের সংগঠিত করার উদ্যোগ নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৮৫ সালে আত্মপ্রকাশ করে ‘সংযুক্ত সংখ্যালঘু মোর্চা’ (United Minorities Front—UMF)। কালিপদ সেন ছিলেন এই রাজনৈতিক শক্তির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। ১৯৮৫ সালের নির্বাচনে সংযুক্ত সংখ্যালঘু মোর্চা ১৭টি বিধানসভা আসন এবং ১টি লোকসভা আসনে জয়লাভ করে।
এই সাফল্য আসামের সংখ্যালঘু ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই আসামের রাজনীতিতে সহিংসতা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার পরিবেশ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। ১৯৮৬ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর গুয়াহাটিতে কালিপদ সেন আততায়ীদের গুলিতে নিহত হন। তৎকালীন সরকারি নথিতেও তাঁর হত্যাকাণ্ডের উল্লেখ রয়েছে এবং উগ্রপন্থীদের সংশ্লিষ্টতার সন্দেহের কথা নথিভুক্ত হয়েছিল।
কালিপদ সেনের হত্যার প্রতিবাদে আসামের বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। তাঁর মৃত্যু আসামের বাঙালির নাগরিক অধিকার ও নিরাপত্তার প্রশ্নকে আরও একবার সামনে নিয়ে আসে। পরবর্তীকালে বিভিন্ন লেখালেখি ও রাজনৈতিক নথিতেও তাঁকে নাগরিক অধিকার রক্ষা কমিটি ও সংযুক্ত সংখ্যালঘু মোর্চার অন্যতম প্রধান নেতা হিসেবে স্মরণ করা হয়েছে।
৪০তম মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি
কালিপদ সেনের ৪০তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আজ, ১৭ সেপ্টেম্বর, ‘নাগরিক অধিকার রক্ষা কমিটি, আসাম’-এর উদ্যোগে শিলচরের CTVO কার্যালয়ে এক শ্রদ্ধাঞ্জলি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন নাগরিক অধিকার রক্ষা কমিটির উপদেষ্টা এবং আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য ড. তপোধীর ভট্টাচার্য। সভায় সংগঠনের বিভিন্ন কর্মকর্তা কালিপদ সেনের জীবন, সংগ্রাম এবং আসামের বাঙালিদের নাগরিক অধিকার রক্ষায় তাঁর ভূমিকার কথা তুলে ধরেন।
বক্তব্য রাখেন নাগরিক অধিকার রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক কিশোর ভট্টাচার্য, সচিব প্রধান সাধন পুরকায়স্থ, অন্যতম কর্মকর্তা মজনুল হক মজুমদার-সহ অন্যান্যরা।
সভাপতির ভাষণে ড. তপোধীর ভট্টাচার্য আসাম আন্দোলনের সেই ভয়াবহ দিনগুলির কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, সেই সময় বহু বাঙালি পরিবারকে নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হতে হয়েছিল। আন্দোলনের সময় একাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন; তাঁদের মধ্যে ড.অঞ্জন চক্রবর্তী ও রবি মিত্রের নামও স্মরণ করা হয়।
ড. ভট্টাচার্য বলেন, আসামের বাঙালির নাগরিক অধিকার রক্ষার আন্দোলনে কালিপদ সেন যে ভূমিকা পালন করেছিলেন, তা ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর সময়ের অভিজ্ঞতা এবং তাঁর সহযোদ্ধাদের রেখে যাওয়া আদর্শ থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমান প্রজন্মকে গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক অধিকারের প্রশ্নে আরও সংগঠিত হতে হবে।
শ্রদ্ধাঞ্জলি সভা থেকে বক্তারা শহীদ কালিপদ সেন-সহ সেই সময়ের সকল সংগ্রামী মানুষের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং নাগরিক অধিকার, ভাষা ও সাংস্কৃতিক অধিকারের সুরক্ষায় ঐক্যবদ্ধ গণতান্ত্রিক সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
নাগরিক অধিকার রক্ষা কমিটি আসামের প্রধান সচিব সাধন পুরকায়স্থ এ খবর জানান।












