‘যুবসমাজের ভবিষ্যৎ রক্ষায় মাদক থেকে দূরে থাকুন’, নেহরু কলেজে বার্তা রাজ্যপাল লক্ষ্মণ প্রসাদ আচার্যের
জনসংযোগ। শিলচর : মাদকের বিরুদ্ধে সচেতনতার বার্তা নিয়ে কাছাড়ের লক্ষিপুর সমষ্টির পয়লাপুলে যেন তৈরি হল এক অন্য রকমের জনজোয়ার। বৃহস্পতিবার নেহরু কলেজ থেকে ‘নেশামুক্ত ভারত সংকল্প পদযাত্রা’র সূচনা করলেন অসমের রাজ্যপাল লক্ষ্মণ প্রসাদ আচার্য। রাজ্যপালের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, সরকারি আধিকারিক এবং নাগরিক সমাজের সদস্যসহ দুই হাজারেরও বেশি মানুষ পদযাত্রায় পা মেলান।
নেহরু কলেজে জনসভা দিয়ে শুরু হয় দিনের কর্মসূচি। সেখান থেকেই পয়লাপুল চৌরাস্তা মোড়ে দিকে এগিয়ে যায় সচেতনতার পদযাত্রা। উল্লেখ্য, রাজ্যজুড়ে ১০টি জেলায় চলা এই অভিযান আগামী ২ অক্টোবর পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।
নেহরু কলেজের সভায় রাজ্যপাল লক্ষ্মণ প্রসাদ আচার্যের বার্তার কেন্দ্রে ছিল যুবসমাজ। তিনি বলেন , মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু কোনও একটি ব্যক্তি বা পরিবারের লড়াই নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সমাজের ভবিষ্যৎ। তাই সরকারি অনুষ্ঠানের গণ্ডি পেরিয়ে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যুব সংগঠন এবং স্থানীয় মানুষকে সঙ্গে নিয়ে এই সচেতনতা অভিযানকে ধারাবাহিক সামাজিক উদ্যোগে পরিণত করার আহ্বান জানান তিনি।

ছাত্রছাত্রী এবং যুবকদের উদ্দেশে রাজ্যপাল বলেন, মাদক থেকে দূরে থেকে নিজেদের সময় ও শক্তিকে শিক্ষা, খেলাধুলা, যোগাভ্যাস, সংস্কৃতি, দক্ষতা উন্নয়ন, উদ্ভাবন এবং সমাজসেবার কাজে ব্যবহার করতে হবে। তিনি বলেন মাদকের ক্ষতি শুধু মাদক গ্রহণকারী ব্যক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না তার অভিঘাত পৌঁছে যায় পরিবার এবং বৃহত্তর সমাজে। তাই সচেতনতার পাশাপাশি মাদকাসক্তদের কাউন্সেলিং, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও জরুরি। একই সঙ্গে মাদক পাচারের সঙ্গে যুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষেও সওয়াল করেন তিনি।
লক্ষীপুরের পয়লাপুলের কর্মসূচিতে ছাত্রছাত্রী এবং সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে খুশি রাজ্যপাল বলেন, এই অংশগ্রহণ কর্মসূচিকে প্রকৃত অর্থেই জনসম্পৃক্ত করে তুলেছে। পয়লাপুল থেকে ওঠা মাদকের বিরুদ্ধে সচেতনতার বার্তা গ্রাম থেকে পাড়া, স্কুল থেকে পরিবার সর্বত্র পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
এদিনের অনুষ্ঠানে অসম সরকারের খাদ্য, জনবণ্টন, আবাসন ও নগর বিষয়ক এবং সমবায় বিভাগের মন্ত্রী কৌশিক রায় রাজ্যপালকে স্বাগত জানান। তিনি বলেন, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে মাদক পাচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কাছাড়ের গুরুত্ব বিশেষ। মায়ানমার, মণিপুর এবং মিজোরামের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন রুটের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, পাচারকারীরা এই অঞ্চলকে অসমে মাদক নিয়ে আসার পথ হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে।
তবে সেই প্রবণতার বিরুদ্ধে পুলিশ ও প্রশাসনের লাগাতার তৎপরতার কথাও তুলে ধরেন মন্ত্রী। কাছাড় ও অসম পুলিশের নিয়মিত মাদক উদ্ধারের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, পাচারচক্র চিহ্নিত করতে সাধারণ মানুষের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এ দিনের কর্মসূচিতে লক্ষীপুরের ১০৮ বছর বয়সি সুনীলা দাসকে সম্মান জানানোর ঘটনাটিও বিশেষ গুরুত্ব পায়। মন্ত্রী কৌশিক রায় জানান, রাজ্যপালের লক্ষীপুর সফর এবং জেলার প্রবীণতম বাসিন্দাকে সম্মান জানানো থেকে শুরু করে নেহরু কলেজে তাঁর উপস্থিতি পুরো দিনটিই লক্ষীপুর ও কাছাড়ের মানুষের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
কাছাড়ের জেলা আয়ুক্ত রাহুল কুমার গুপ্তা বলেন, যুবসমাজের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি স্কুল, পরিবার, সামাজিক সংগঠন, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলির মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর উপর প্রশাসন জোর দিচ্ছে। তাঁর মতে, মাদকাসক্তি প্রতিরোধ কোনও এক দিনের কর্মসূচি নয়, স্থানীয় স্তরে লাগাতার কাজের মাধ্যমেই এর বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। ছাত্রছাত্রীদেরও এই কাজে সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
কাছাড়ের সিনিয়র পুলিশ সুপার পার্থ প্রতিম দাস জেলায় মাদক পাচারের বিরুদ্ধে পুলিশের ধারাবাহিক অভিযানের কথা তুলে ধরেন। মাদকদ্রব্যের গতিবিধি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য কোনও তথ্য থাকলে তা পুলিশকে জানানোর জন্য সাধারণ মানুষের কাছে আবেদন জানান তিনি। পুলিশ ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত সহযোগিতার মাধ্যমেই অবৈধ মাদক ব্যবসাকে স্থানীয় সমাজে শিকড় গাড়তে দেওয়া যাবে না বলে জানান পুলিশ সুপার।
মাদকাসক্তির প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে অবদান রাখা বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা এবং ব্যক্তিকে এ দিন রাজ্যপালের পক্ষ থেকে সম্মানিত করা হয়। পদযাত্রার আগে নেহরু কলেজ চত্বরে মহাত্মা গান্ধীর মূর্তিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন রাজ্যপাল। এরপর শুরু হয় পদযাত্রা। পয়লাপুল চৌরাস্তা মোড়ের দিকে এগিয়ে যাওয়া মিছিলে ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে পা মেলান শিক্ষক, সরকারি আধিকারিক এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।

এর আগে লক্ষীপুরের ছোট মামদা গাঁও পঞ্চায়েতের অন্তর্গত কৃষ্ণনগরে ১০৮ বছর বয়সি সুনীলা দাসের বাড়িতে যান রাজ্যপাল। অসমের রাজ্যপালের ‘বরিষ্ঠ নাগরিক সম্মান’ উদ্যোগের অধীনে তাঁকে সম্মান জানান তিনি। অনুষ্ঠানে মন্ত্রী কৌশিক রায়ও উপস্থিত ছিলেন। প্রয়াত বিহারী দাসের স্ত্রী সুনীলা দাসকে ঐতিহ্যবাহী অসমীয়া গামছা, শাড়ি, চাদর, ছাতা এবং ফলের ঝুড়ি দিয়ে সম্মান জানানো হয়। রাজ্যপাল তাঁর হাতে ৫১ হাজার টাকার একটি চেক তুলে দেন এবং তাঁর সুস্থতা ও মঙ্গল কামনা করেন।
এর পর সুনীলা দাসের পরিবারের সদস্যরা রাজ্যপাল, মন্ত্রী কৌশিক রায়, কাছাড়ের জেলা আয়ুক্ত এবং জেলার পুলিশ প্রধানকে ঐতিহ্যবাহী অসমীয়া গামছা দিয়ে সম্মান জানান। অনুষ্ঠানে গাঁও পঞ্চায়েত সভাপতি রাজেশ দাসও উপস্থিত ছিলেন। পয়লাপুলের পদযাত্রায় অংশ নেওয়া তরুণ প্রজন্মের কাছে দিনটি ছিল সচেতনতার এক নতুন বার্তা বহন করার দিন। শিক্ষক ও সরকারি আধিকারিকদের পাশে নিয়ে ছাত্রছাত্রীরা হাতে হাত মিলিয়ে হাঁটেন মাদকমুক্ত সমাজের আহ্বান নিয়ে। আগামী ২ অক্টোবর পর্যন্ত রাজ্যের অন্যান্য জেলাতেও এই অভিযান চলবে। আয়োজকদের আশা, পয়লাপুলের এই বার্তা আগামী দিনে আরও বেশি সংখ্যক যুবক-যুবতীর কাছে পৌঁছে যাবে এবং সমাজের তৃণমূল স্তরে মাদকবিরোধী সচেতনতা আরও জোরদার হবে।
অনুষ্ঠানে অসম সরকারের খাদ্য, জনবণ্টন, আবাসন ও নগর বিষয়ক এবং সমবায় বিভাগের মন্ত্রী কৌশিক রায়, কাছাড়ের জেলা আয়ুক্ত রাহুল কুমার গুপ্তা , আইএএস, পুলিশ সুপার পার্থ প্রতিম দাস, লক্ষীপুর সম- জেলা আয়ুক্ত ধ্রুবজ্যোতি পাঠক, এসিএস, অতিরিক্ত জেলা আয়ুক্ত জাগৃতি কালওয়ার, এসিএস, সহকারী আয়ুক্ত তথা ভারপ্রাপ্ত উপ সঞ্চালক তথ্য ও জনসংযোগ বিভাগের বরাক উপত্যকার আঞ্চলিক কার্যালয় শিলচর, অরুণাভ চৌধুরী, এসিএস, মাননীয় রাজ্যপালের জনসংযোগ আধিকারিক লাকি বিশ্বাস, নেহরু কলেজের অধ্যক্ষ ড. এল. ভারতী সিংহ-সহ অন্যান্য সরকারি আধিকারিক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। নেহরু কলেজের সমগ্র অনুষ্ঠানটি দক্ষতার সাথে সঞ্চালনা করেন বিপ্লব বিশ্বাস,এদিনে তার দৃপ্ত সঞ্চালনা অনুষ্ঠানটিকে এক অন্যমাত্রা এনে দেয়।












