,

বিশ্ব পরিবেশ দিবস: একদিনের স্লোগান নয়, প্রতিদিনের দায়িত্ব

বিশেষ প্রতিবেদন: ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস। ১৯৭২ সালের এই দিনে সুইডেনের স্টকহোমে প্রথম মানব পরিবেশ সম্মেলন বসেছিল। তারপর থেকে জাতিসংঘের উদ্যোগে সারা পৃথিবী একটা দিন পালন করে। কিন্তু একটা দিন পালন করলেই কি পৃথিবী বাঁচবে? একদিনের নাটক, বাকি দিনের উদাসীনতা ৫ জুন আসলেই দেখা যায় বিভিন্ন সংস্থা, সরকারের পক্ষ থেকে একদিনের জন্য এই দিবসটি…

বিশেষ প্রতিবেদন: ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস। ১৯৭২ সালের এই দিনে সুইডেনের স্টকহোমে প্রথম মানব পরিবেশ সম্মেলন বসেছিল। তারপর থেকে জাতিসংঘের উদ্যোগে সারা পৃথিবী একটা দিন পালন করে। কিন্তু একটা দিন পালন করলেই কি পৃথিবী বাঁচবে?

একদিনের নাটক, বাকি দিনের উদাসীনতা
৫ জুন আসলেই দেখা যায় বিভিন্ন সংস্থা, সরকারের পক্ষ থেকে একদিনের জন্য এই দিবসটি পালন করা হয়। র‍্যালি, সেমিনার, গাছের চারা বিতরণ—সব হয়। ছবি ওঠে, খবর হয়। ৬ জুন থেকেই এক বছরের জন্য সব ভুলে যাওয়া হয়।

এভাবে পৃথিবী বাঁচানো যাবে না। দিবস পালন মানে দায় শেষ হয়ে যায় না। পৃথিবী ৬ জুনও কাঁদে, ১০ জুলাইও গাছ কাটা পড়ে, ২০ ডিসেম্বরও নদী দূষিত হয়। তাই দায়িত্বটা প্রতিদিনের।

পরিবেশের আজকের ছবি
গত ৫০ বছরে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ১.২ ডিগ্রি বেড়েছে। বরফ গলছে দ্রুত। সমুদ্রের জল বাড়ছে। ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্র উপকূলের বহু শহর জলের নিচে চলে যাবে বলে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন।

প্রতি বছর ৮০ লাখ টনের বেশি প্লাস্টিক সমুদ্রে যাচ্ছে। মাছের পেটে, পাখির ঠোঁটে এখন প্লাস্টিক। বাতাসে দূষণের মাত্রা এতটাই বেড়েছে যে প্রত্যেক শহরে শ্বাস নেওয়া কষ্ট। আসাম জুড়ে গুয়াহাটি, শিলচর, ডিব্রুগড়, জোরহাট—কোথাও বাতাস নির্মল নেই।

বন কাটা থামছে না। আমাজন, সুন্দরবন—ফুসফুসগুলো ফাঁকা হচ্ছে। বন গেলে বৃষ্টি কমে, মাটি ধসে, প্রাণী হারায় বাসস্থান। গত এক দশকে পৃথিবী থেকে প্রায় ১০ লাখ প্রজাতির প্রাণী বিলুপ্তির মুখে।

নীরব ঘাতক: শব্দ দূষণ
বায়ু আর জলের পাশাপাশি আজ বড় সমস্যা শব্দ দূষণ। গাড়ির হর্ন, মাইকের চিৎকার, নির্মাণের আওয়াজ, লাউডস্পিকারের গান—চারদিকে শুধু কোলাহল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ৮৫ ডেসিবেলের ওপরে আওয়াজ কানের জন্য ক্ষতিকর। শহরে সেই মাত্রা প্রায় সবসময় ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

ফল কি? মাথা ধরা, ঘুমের সমস্যা, রক্তচাপ বাড়া, বাচ্চাদের মনোযোগ নষ্ট। পশু-পাখিরাও বাদ যাচ্ছে না। পাখি দিক ভুলে যাচ্ছে, মৌমাছি ফুল চিনতে পারছে না। সমুদ্রে জাহাজের আওয়াজে তিমি-ডলফিন দিশা হারাচ্ছে।

দায় কার? একদিন নয়, প্রতিদিনের ভাবনা
যারা পরিবেশ নিয়ে কাজ করছেন, যারা পরিবেশকর্মী, বিজ্ঞানী, স্বেচ্ছাসেবী—তাঁদের কাছে ৫ জুন একটা দিন মাত্র। আসল লড়াইটা তো ৩৬৫ দিনের। গাছ লাগানো, নদী পরিষ্কার করা, দূষণ রোখা—এগুলো বছরে একবারের অনুষ্ঠান হতে পারে না।

আসাম সরকারের একটা বিভাগ রয়েছে আসাম পলিউশন কন্ট্রোল বোর্ড। নাম শুনলে বোঝা যায় দায়িত্ব অনেক। বায়ু দূষণ, জল দূষণ, শব্দ দূষণ—সব দেখার কথা ওদের। কিন্তু সারা বছর ওরা কতটা কাজ করছে, ভাবা দরকার। ৫ জুনে সেমিনার, পোস্টার, র‍্যালি হয়। বাকি ৩৬৪ দিন কারখানার ধোঁয়া, নদীতে বর্জ্য, রাতের বেলায় মাইকের দাপট—কে দেখে?

নিয়ম আছে, যন্ত্র আছে, কর্মীও আছে। তবুও গুয়াহাটি, শিলচর, ডিব্রুগড়ের বাতাসে দূষণের মাত্রা নামছে না। রাত ১০টার পরও মাইক বন্ধ হচ্ছে না। এর মানে কি নিয়ম শুধু কাগজে? তদারকি কি শুধু দিবসের দিনেই?

বিনোদনের নামে অপচয়, বাঁচার নামে উদাসীনতা
সবচেয়ে অবাক লাগে যখন দেখা যায় বিনোদনের জন্য কিছু সংস্কৃতি কর্মী লক্ষ টাকা খরচ করেন, টাকা সংগ্রহ করে। মঞ্চ, আলো, মাইক, শিল্পী—এক রাতের অনুষ্ঠানে কোটি টাকা উড়ে যায়। কিন্তু নিজে বাঁচার জন্য, অন্যকে বাঁচার জন্য এগিয়ে আসছেন না।

অক্সিজেন না থাকলে আমরা বাঁচব কি করে—এই ভাবনাটাই নেই। মঞ্চ বানানোর টাকা দিয়ে যদি একটা বন তৈরি হতো, মাইকের টাকা দিয়ে যদি একটা নদী বাঁচতো, তাহলে আগামী প্রজন্ম অন্তত নিঃশ্বাস নিতে পারতো।

উৎসব হোক, আনন্দ হোক—কিন্তু উৎসবের আগে অস্তিত্বটা তো বাঁচাতে হবে। যে বাতাসে আমরা গান গাই, সেই বাতাসই যদি বিষ হয়ে যায়, তাহলে গানের দাম থাকে কোথায়?

নিজে বাঁচতে নিজেকেই এগিয়ে আসতে হবে
অনেকেই ভাবেন, গাছ লাগানো, নদী বাঁচানো—এটা সরকারের কাজ। আসলে পৃথিবীটা আমাদের সবার। আমরা প্রত্যেকেই নিজে বাঁচার জন্য নিজেই এগিয়ে আসতে হবে। সরকারের দিকে তাকিয়ে বসে থাকলে চলবে না।

সবার আগে গাছ কাটা পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। গাছ মানে শুধু কাঠ নয়, গাছ মানে অক্সিজেন, গাছ মানে বৃষ্টি, গাছ মানে ছায়া। বিশেষ কারণে গাছ কাটতেই হলে একটা গাছের পরিবর্তে পাঁচটি গাছ লাগাতে হবে। একটা কাটলে পাঁচটা লাগানো—এটা নিয়ম হোক, আইন হোক, অভ্যাস হোক।

আপনি সকালে যে চা-টা খান, তার কাপটা কোথায় ফেলছেন? বাজার থেকে যে প্লাস্টিকের ব্যাগটা নিচ্ছেন, ওটা ৫০ বছরেও মাটিতে মিশবে না। অকারণে হর্ন বাজানো, রাত ১০টার পর মাইক চালানো—এগুলোও তো আমরাই করছি। ছোট ছোট অভ্যাসই বড় বিপদ ডেকে আনে।

সমাধানের রাস্তা
১. গাছ কাটা বন্ধ, গাছ লাগানো চালু: গাছ কাটা পুরোপুরি বন্ধ হোক। বিশেষ প্রয়োজনে একটা গাছ কাটলে পাঁচটা গাছ লাগাতেই হবে। রাস্তার ধারে, বাড়ির উঠোনে, স্কুলের মাঠে—জায়গা পেলেই গাছ।
২. প্লাস্টিককে না বলুন: কাপড়ের ব্যাগ, কাগজের ঠোঙা, স্টিলের বোতল—অভ্যাস করুন। প্লাস্টিক ব্যবহার কমানো মানে সমুদ্র বাঁচানো।
৩. জল অপচয় নয়: দাঁত মাজার সময় কল বন্ধ রাখুন। এক ফোঁটা জলও বৃথা যেন না যায়।
৪. শব্দ নিয়ন্ত্রণ করুন: অপ্রয়োজনে হর্ন নয়। রাত ১০টা থেকে সকাল ৬টা—নীরবতা পালন করুন। মাইক, লাউডস্পিকার ব্যবহারে নিয়ম মানুন। কানে হেডফোন দিলে ভলিউম ৬০ শতাংশের নিচে রাখুন।
৫. দায়িত্ব চান, জবাব চান: আসাম পলিউশন কন্ট্রোল বোর্ডের কাছে হিসাব চান। ওরা সারা বছর কী করছে, কত কারখানায় অভিযান চালিয়েছে, কত শব্দ দূষণের মামলা করেছে—জানার অধিকার আমাদের আছে।

শেষ কথা
পরিবেশ দিবস মানে শুধু পোস্টার, মিছিল, স্লোগান নয়। মানে হলো আয়না দেখা। আমরা পৃথিবী থেকে নিচ্ছি, কিন্তু ফেরত দিচ্ছি কতটা?

বাতাস, জল, মাটি, শব্দ—সব দিক থেকেই পৃথিবী আজ অসুস্থ। আজকের পৃথিবী আগামী প্রজন্মের ধার করা সম্পদ। আমরা যদি এখনই না থামি, ওদের জন্য রেখে যাব শুধু ধুলো, দূষণ আর আফসোস।

৫ জুন আসুক, যাক। কিন্তু ৬ জুন থেকে যেন আমরা সবাই একটু দায়িত্বশীল হই। গাছের একটা পাতা ছিঁড়তে গেলেও যেন হাত কেঁপে ওঠে, হর্ন বাজাতে গেলেও যেন একবার ভাবি। কারণ পৃথিবী বাঁচলে আমরাও বাঁচব। পৃথিবী না থাকলে মানুষের অস্তিত্বও থাকবে না।

পরিবেশ বাঁচান, নীরবতা বাঁচান, নিজে বাঁচুন। প্রতিদিন ভাবুন, প্রতিদিন কাজ করুন। একটা গাছ কাটলে পাঁচটা লাগান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *