রিদিম ওয়েভের উদ্যোগে বাংলা আগমনী গানের কর্মশালা ও বিশেষ সঙ্গীতানুষ্ঠান
বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন। কলকাতা: শরৎ আসে, কাশফুল দোলে, শিউলির গন্ধে ভরে ওঠে চারদিক—আর বাঙালির হৃদয়ে বেজে ওঠে এক চিরপরিচিত সুর, “মা আসছেন”। বাংলা আগমনী গান সেই বহু প্রাচীন সঙ্গীতধারারই এক অনন্য প্রকাশ, যার মধ্য দিয়ে উমার মর্ত্যে আগমন, মেনকার আকুলতা, গিরিরাজের আবেগ এবং দেবী দুর্গার বন্দনার কথা সুর ও কথার মেলবন্ধনে ফুটে ওঠে। দীর্ঘকাল ধরে বাঙালির সাংস্কৃতিক ও সঙ্গীতজীবনে আগমনী গান এক বিশেষ আবেগ ও আলোড়নের সৃষ্টি করে এসেছে।
এই ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে এ বছর দুর্গাপুজোর প্রাক্কালে এক অভিনব উদ্যোগ গ্রহণ করল নবগঠিত সাংস্কৃতিক সংস্থা রিদিম ওয়েভ। মধ্যমগ্রামের শিল্প সুষমা আর্ট গ্যালারিতে আয়োজিত হয় বাংলা আগমনী গানের বিশেষ কর্মশালা ও সঙ্গীতানুষ্ঠান। রিদিম ওয়েভের কর্ণধার শ্রী মৈনাক দাস তাঁর বক্তব্যে জানান, এটিই তাঁদের প্রথম প্রয়াস। মা দুর্গার আশীর্বাদ এবং শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণদেব ও শ্রীশ্রী সারদামায়ের আশীর্বাদকে পাথেয় করে রিদিম ওয়েভের পথচলা শুরু হল বাংলা আগমনী গানের কর্মশালা ও পরিবেশনার মধ্য দিয়ে।
এই উদ্যোগের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিলেন কলকাতার দুই বিশিষ্ট দ্বৈতকণ্ঠ শাস্ত্রীয় ও উপশাস্ত্রীয় সঙ্গীতশিল্পী, আকাশবাণী ও দূরদর্শনের এ-গ্রেড শিল্পী অনির্বাণ দাস ও দীপ্তম সিনহা বিশ্বাস। দীর্ঘদিনের সাধনা, সঙ্গীতশিক্ষা, মঞ্চ-অভিজ্ঞতা এবং ভারতীয় শাস্ত্রীয় ও উপশাস্ত্রীয় সঙ্গীতের গভীর দখলের জন্য তাঁরা ইতিমধ্যেই সঙ্গীতমহলে একটি স্বতন্ত্র পরিচয় প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁদের যুগল পরিবেশনা কণ্ঠের মেলবন্ধন, রাগসঙ্গীতের গভীরতা এবং ভাবপ্রকাশের আন্তরিকতার জন্য শ্রোতাদের কাছে বিশেষভাবে সমাদৃত।

অনির্বাণ দাস ও দীপ্তম সিনহা বিশ্বাসের তত্ত্বাবধানেই অনুষ্ঠিত হয় আগমনী গানের বিশেষ কর্মশালা। কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী সঙ্গীতশিক্ষার্থী ও সঙ্গীতপ্রেমীরা তাঁদের কাছ থেকে শেখার সুযোগ পান আগমনী গানের নানা দিক, পরিবেশনরীতি এবং সঙ্গীতের অন্তর্নিহিত ভাবসম্পদ। বিশেষ আকর্ষণ ছিল তাঁদের পরিবেশিত ও শেখানো কয়েকটি অপেক্ষাকৃত অজানা এবং ব্যতিক্রমী সুর-রচনা, যা উপস্থিত সঙ্গীতশিক্ষার্থী ও শ্রোতাদের কাছে এক নতুন অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে।
কর্মশালার পরিবেশ ছিল অত্যন্ত নিবিড় ও আন্তরিক। শিল্পী ও শ্রোতার মধ্যে তৈরি হয়েছিল এক সুন্দর সেতুবন্ধন। সঙ্গীত যে শুধুমাত্র পরিবেশনার বিষয় নয়, বরং শিক্ষা, সাধনা ও অনুভবেরও বিষয়—এই উপলব্ধিই যেন আরও একবার স্পষ্ট হয়ে ওঠে এই কর্মশালার মধ্য দিয়ে।
অনুষ্ঠানের মাঝেই Edit4 Studios-এর পক্ষ থেকে অনির্বাণ দাস ও দীপ্তম সিনহা বিশ্বাসের কণ্ঠে একটি নতুন গীত প্রকাশিত হয়। এই উপলক্ষে Edit4 Studios ও Satyadeb Music Academy-এর কর্ণধার শ্রীমতী পারমিতা চট্টোপাধ্যায় এবং তাঁর পুত্র শ্রীমান সৌমদীপ তাঁদের বক্তব্য ও শুভেচ্ছাবার্তা প্রদান করেন। নতুন সৃষ্টিকে ঘিরে উপস্থিত সকলের মধ্যে তৈরি হয় বিশেষ উৎসাহ ও আনন্দের আবহ।
কর্মশালার পর একই মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় একটি বিশেষ আগমনী সঙ্গীতানুষ্ঠান। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, শিল্প সুষমা আর্ট গ্যালারি, মধ্যমগ্রামে অনুষ্ঠিত এই পরিবেশনায় মূল শিল্পী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অনির্বাণ দাস ও দীপ্তম সিনহা বিশ্বাস। তাঁরা পরিবেশন করেন বিভিন্ন ধরনের বাংলা আগমনী গান, মা দুর্গার বন্দনা এবং নির্বাচিত বন্দিশ। তাঁদের কণ্ঠের অসাধারণ মেলবন্ধন, সুরের প্রতি নিষ্ঠা এবং পরিবেশনার গভীর আবেগ শ্রোতাদের মুগ্ধ করে। একদিকে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের দৃঢ় ভিত, অন্যদিকে আগমনী গানের আবেগ ও বাঙালির শারদীয় অনুভূতিকে তাঁরা যে দক্ষতায় একসূত্রে বেঁধেছেন, তা সন্ধ্যাটিকে করে তোলে বিশেষ স্মরণীয়।
শ্রোতাদের মধ্যেও অনুষ্ঠানের প্রতি ছিল প্রবল উৎসাহ। পরিবেশনা শেষে অনেকেই তাঁদের ভালো লাগা ও অভিজ্ঞতার কথা শিল্পী এবং আয়োজকদের সঙ্গে ভাগ করে নেন। শরৎ ও দুর্গোৎসবের প্রাক্কালে এমন একটি সঙ্গীতসন্ধ্যা উপস্থিত সকলের মনে যেন আগামীর উৎসবের আনন্দকে আরও গভীর করে তোলে।

সঙ্গীতের এই আয়োজনকে সমৃদ্ধ করেন তরুণ ও উদীয়মান শিল্পীরাও। তবলায় সঙ্গত করেন শ্রী মৈনাক দাস। একজন তরুণ শিল্পী হিসেবে সঙ্গীতের প্রতি তাঁর নিষ্ঠা, অধ্যবসায় এবং শেখার আগ্রহ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। নিজের বাদ্যচর্চাকে আরও নিবিড়ভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার যে প্রচেষ্টা তিনি চালিয়ে যাচ্ছেন, তা প্রশংসার দাবি রাখে। অনুষ্ঠানের এই দায়িত্বশীল ভূমিকার পাশাপাশি রিদিম ওয়েভকে সামনে রেখে তাঁর সাংস্কৃতিক উদ্যোগও প্রশংসিত হয়েছে। উপস্থিত সকলেই মৈনাক দাসের ভবিষ্যৎ সঙ্গীতযাত্রার জন্য আশীর্বাদ ও শুভকামনা জানান।
হারমোনিয়ামে সঙ্গত করেন আর এক উদীয়মান নবীন শিল্পী সুরজ শর্মা। তাঁর আন্তরিক ও সংবেদনশীল সঙ্গত মূল পরিবেশনাকে আরও সমৃদ্ধ করে। পাশাপাশি দুর্গাপুজো ও শরৎকালকে কেন্দ্র করে একটি বিশেষ ভাষ্য পাঠ করেন সম্পদ পাত্র, যা সমগ্র অনুষ্ঠানের ভাব ও আবহের সঙ্গে সুন্দরভাবে মিশে যায়।
অনির্বাণ দাস, দীপ্তম সিনহা বিশ্বাস, মৈনাক দাস, সুরজ শর্মা ও সম্পদ পাত্রের সম্মিলিত পরিবেশনা শ্রোতাদের মনে এক অন্যরকম অনুভূতির জন্ম দেয়। আসন্ন দুর্গোৎসবের আবহে বাংলা আগমনী গানের এই পরিবেশনা যেন শারদীয় আনন্দের আগমনী বার্তাকেই আরও স্পষ্ট করে তোলে।
রিদিম ওয়েভের এই প্রথম প্রয়াসে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়—ঐতিহ্যকে শুধু সংরক্ষণ নয়, শেখানো, চর্চা করা এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার আন্তরিক উদ্যোগ। বাংলা আগমনী গানের মতো সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ধারাকে কেন্দ্র করে এমন কর্মশালা ভবিষ্যতে আরও বৃহত্তর পরিসরে অনুষ্ঠিত হবে—এমন প্রত্যাশাই স্বাভাবিক।
অনুষ্ঠানের শেষে রিদিম ওয়েভের পথচলা আরও সুদৃঢ় ও দীর্ঘ হোক—এই শুভেচ্ছা ও আশীর্বাদ জানান উপস্থিত শিল্পী, সঙ্গীতপ্রেমী, শিক্ষার্থী ও দর্শকরা।
সবশেষে, এই আয়োজনকে সফল করে তোলার জন্য রিদিম ওয়েভের সমস্ত সদস্য ও সকল সহযোগীকে আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন রিদিম ওয়েভের কর্ণধার মৈনাক দাস। তাঁর উদ্যোগে শুরু হওয়া এই নতুন সাংস্কৃতিক পথচলা বাংলা গান, বিশেষত বাংলা আগমনী গানের চর্চা ও প্রসারে আগামী দিনে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে—এই প্রত্যাশাই রইল।












