,

তোমাকে ছাড়া এক বছর: জুবিন, তুমি ভালো আছো তো?

ড.সৌমেন ভারতীয়া (প্যাট্রন-ইন-চিফ, ব্যতিক্রম গ্রুপ) প্রিয় জুবিন, কেমন আছো তুমি? জানি, এই প্রশ্নের উত্তর আর কোনওদিন আমাদের কাছে পৌঁছাবে না। তবু এক বছর পরেও কেন জানি তোমাকে এই প্রশ্নটাই করতে ইচ্ছে করে। মনে হয়, তুমি হয়তো কোথাও আছো- কোনও এক অদৃশ্য মঞ্চে নিজের মতো করে গান গাইছো, সুরের মধ্যে ডুবে আছো। আর আমরা এখানে বসে…

ড.সৌমেন ভারতীয়া (প্যাট্রন-ইন-চিফ, ব্যতিক্রম গ্রুপ)

প্রিয় জুবিন,

কেমন আছো তুমি?

জানি, এই প্রশ্নের উত্তর আর কোনওদিন আমাদের কাছে পৌঁছাবে না। তবু এক বছর পরেও কেন জানি তোমাকে এই প্রশ্নটাই করতে ইচ্ছে করে। মনে হয়, তুমি হয়তো কোথাও আছো- কোনও এক অদৃশ্য মঞ্চে নিজের মতো করে গান গাইছো, সুরের মধ্যে ডুবে আছো। আর আমরা এখানে বসে তোমার কথা বলছি, তোমার গান শুনছি, তোমার স্মৃতির ভেতর দিয়ে তোমাকেই খুঁজে চলেছি।

জুবিন, তোমাকে নিয়ে এত লেখা হচ্ছে! ভাবলে অবাক লাগে- একজন মানুষ চলে যাওয়ার পরও তাঁকে ঘিরে এত কথা কীভাবে জমে থাকতে পারে। এক-দুইটি নয়, একশো নয়-হাজারেরও বেশি বই, স্মৃতিচারণ, প্রবন্ধ, কবিতা ও নানা লেখা তোমাকে ঘিরে প্রকাশিত হয়েছে, এখনও হচ্ছে। কেউ তোমার গান নিয়ে লিখছেন, কেউ তোমার জীবন নিয়ে, কেউ তোমার সঙ্গে কাটানো মুহূর্তের কথা তুলে ধরছেন। কেউ আবার শুধু মনের কথাগুলো তোমার কাছে পৌঁছে দিতে চাইছেন। কখনও কখনও ভাবি, এত মানুষের এত কথা, এত স্মৃতি, এত ভালোবাসা-সব কি কোনওভাবে তোমার কাছে পৌঁছায়?

একজন মানুষ চলে যাওয়ার পরও তাঁকে ঘিরে এত কথা জমে থাকতে পারে-এ কথা সত্যিই বিস্ময় জাগায়। আর সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, সেই ভালোবাসা তোমার চলে যাওয়ার পরও একটুকো ফিকে হয়নি; বরং সময় যত এগিয়েছে, তোমাকে ঘিরে মানুষের মায়া যেন আরও গভীর হয়েছে। তোমার গান নতুন করে শোনা হচ্ছে, পুরোনো পরিবেশনা ফিরে দেখা হচ্ছে, তোমার বলা কথা নতুন করে মনে পড়ছে। মনে হয়, তুমি চলে যাওনি-শুধু আমাদের চোখের আড়ালে চলে গেছো।

কখনও ভাবি, তুমি কি দেখতে পাও সেই মানুষগুলোকে, যারা এখনও তোমার গান শুনে চোখের জল মুছে? শুনতে পাও সেই তরুণ কণ্ঠগুলোকে, যারা তোমার গান গেয়ে তোমাকেই খুঁজে নেয়? অনুভব করতে পারো সেই অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা, যারা তোমাকে কখনও ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন না, অথচ নিজেদের জীবনের খুব কাছের একজন মানুষ বলে মনে করতেন?

তোমার শেষযাত্রার দিন সেই ভালোবাসার যে বহিঃপ্রকাশ আমরা দেখেছি, তা কোনওদিন ভোলার নয়। রাস্তায় মানুষের ঢল, শেষবার তোমাকে দেখার জন্য অগণিত মানুষের অপেক্ষা, চোখের জল, ফুল আর নীরবতা-অসম যেন সেদিন তার নিজের একজনকে বিদায় জানাতে বেরিয়ে এসেছিল। সেই জনসমুদ্রের দিকে তাকিয়ে মনে হয়েছিল, একজন শিল্পী কতটা মানুষের হয়ে উঠলে তাঁর বিদায়ে একটি গোটা ভূখণ্ড এভাবে কেঁদে উঠতে পারে!

তোমার প্রতি এই ভালোবাসা কোনও নির্দিষ্ট বয়স, শ্রেণি বা প্রজন্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তোমার গান যে শুনেছে, কোনও না কোনওভাবে সে তোমার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেছে। কেউ তোমার গানে প্রেম খুঁজে পেয়েছে, কেউ কষ্ট, কেউ নিজের মাটি, কেউ স্বপ্ন। তুমি গান গেয়েছো, আর মানুষ সেই গানের মধ্যে নিজের জীবনকে খুঁজে নিয়েছে। আর আমাদের জন্য, ব্যতিক্রমের জন্য, তুমি ছিলে আরও একটু আলাদা। ব্যতিক্রমের সঙ্গে তোমার সম্পর্ক কোনও একটি অনুষ্ঠান বা একটি মঞ্চের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। আমাদের বহু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তুমি এসেছো, সময় কাটিয়েছো, গান দিয়ে অনুষ্ঠানকে অন্য মাত্রা দিয়েছো। তোমার উপস্থিতি আমাদের কাছে কখনও শুধু একজন জনপ্রিয় শিল্পীর উপস্থিতি ছিল না; সময়ের সঙ্গে তুমি হয়ে উঠেছিলে আমাদের সাংস্কৃতিক পরিবারের একজন আপন মানুষ। তোমার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সেই দিনগুলোর কথা আজ আরও বেশি মনে পড়ে। তখন ভাবিনি, কোনও একটি অনুষ্ঠান, একটি গান কিংবা একটি সাধারণ সাক্ষাৎ একদিন এত মূল্যবান স্মৃতি হয়ে উঠবে। মানুষকে কাছে পাওয়ার সময়ে আমরা হয়তো তার উপস্থিতির গভীরতা বুঝতে পারি না; হারিয়ে ফেলার পর প্রতিটি মুহূর্তই হয়ে ওঠে অমূল্য।

তোমার জীবনও ছিল এক অসাধারণ যাত্রা। অসমের মাটি থেকে উঠে এসে নিজের কণ্ঠ ও সৃষ্টিশীলতা দিয়ে তুমি সংগীতের বৃহত্তর পরিসরে নিজের স্বতন্ত্র জায়গা তৈরি করেছিলে। গায়ক, সুরকার, সংগীত পরিচালক, অভিনেতা-বিভিন্ন পরিচয়ে নিজেকে প্রকাশ করলেও তোমার সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল তোমার নিজস্বতা। তুমি কারও মতো হতে চাওনি। তোমার গানেও ছিল নিজের ভাষা, নিজের অনুভূতি, নিজের উন্মাদনা এবং নিজের মাটির গন্ধ। তোমার কণ্ঠে আমরা অসমকে নতুন করে শুনেছি। তোমার সুরে মানুষ নিজের কথা খুঁজে পেয়েছে। তুমি শুধু গান গাওনি; মানুষের অনুভূতিকে কণ্ঠ দিয়েছো। হয়তো সেই কারণেই তোমাকে হারানোর পরও তোমাকে হারানো যায়নি।

কখনও কখনও মনে হয়, তোমার সঙ্গে যদি আর একবার কথা বলার সুযোগ পেতাম তাহলে কোনও অভিযোগ করতাম না, কোনও প্রশ্নও করতাম না। শুধু তোমার পাশে বসে তোমার গান শুনতাম। হয়তো নীরবতাই তখন অনেক কথা দিত। তোমার গান বাজলে আজও মানুষ থেমে যায়। তোমার ছবি দেখলে চোখ আটকে যায়। তোমার নাম উচ্চারিত হলে কথার মধ্যে হঠাৎ আবেগ নেমে আসে। একজন শিল্পীর জন্য এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে? তোমার চলে যাওয়ার পর বুঝেছি, একজন মানুষকে কাছে পাওয়ার মুহূর্তগুলো কতটা অমূল্য, আর কিছু মানুষকে হারিয়েও কেন হারানো যায় না।

তোমাকে ছাড়া এক বছর কেটে গেল। কিন্তু তোমাকে নিয়ে লেখা শেষ হয়নি, তোমাকে নিয়ে মানুষের কথা শেষ হয়নি, তোমাকে ভালোবাসার মানুষের সংখ্যাও কমেনি। হয়তো কোনওদিন কমবেও না।

তুমি ভালো থেকো, জুবিন। যেখানেই থাকো, গান গেয়ে যেও।

আর যদি কোনওভাবে আমাদের এই কথাগুলো তোমার কাছে পৌঁছায়, শুধু এটুকু জেনে রেখো- তুমি চলে যাওনি। আজও তুমি হাজার হাজার মানুষের বুকের মধ্যে জড়িয়ে আছো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *