,

কনসার্ট অর্থনীতির নতুন রাজধানী হতে চলেছে অসম, ৫ বছরে ৭০০ কোটির সম্ভাবনা, পোস্ট ম্যালোনের শো-তেই ৪৩ কোটির প্রভাব

বিশেষ প্রতিবেদন। গুয়াহাটি: লাইভ মনোরঞ্জন আর সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতায় ভারতের অন্যতম শীর্ষ প্ল্যাটফর্ম বুকমাইশো অসম পর্যটন উন্নয়ন নিগম লিমিটেড ও ইওয়াই-পার্থেননের সঙ্গে যৌথভাবে ‘দ্য অসম ব্লুপ্রিন্ট টার্নিং লাইভ মিউজিক ইকোনমি ইনটু এ ট্যুরিজম মাল্টিপ্লায়ার’ নামের রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। গুয়াহাটিতে পোস্ট ম্যালোনের প্রথম একক ভারত সফরের কনসার্টকে ভিত্তি করে তৈরি এই রিপোর্টে অসমের লাইভ মনোরঞ্জন খাতের অর্থনৈতিক,…

বিশেষ প্রতিবেদন। গুয়াহাটি: লাইভ মনোরঞ্জন আর সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতায় ভারতের অন্যতম শীর্ষ প্ল্যাটফর্ম বুকমাইশো অসম পর্যটন উন্নয়ন নিগম লিমিটেড ও ইওয়াই-পার্থেননের সঙ্গে যৌথভাবে ‘দ্য অসম ব্লুপ্রিন্ট টার্নিং লাইভ মিউজিক ইকোনমি ইনটু এ ট্যুরিজম মাল্টিপ্লায়ার’ নামের রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। গুয়াহাটিতে পোস্ট ম্যালোনের প্রথম একক ভারত সফরের কনসার্টকে ভিত্তি করে তৈরি এই রিপোর্টে অসমের লাইভ মনোরঞ্জন খাতের অর্থনৈতিক, পর্যটন, কর্মসংস্থান ও সাংস্কৃতিক প্রভাব খতিয়ে দেখা হয়েছে। রিপোর্ট বলছে, সুপরিকল্পিত ইকোসিস্টেম, পর্যটন পরিকাঠামোর উন্নতি আর দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের মাধ্যমে লাইভ মনোরঞ্জনকে শুধু সাংস্কৃতিক আয়োজনে সীমাবদ্ধ না রেখে টানা অর্থনৈতিক অগ্রগতির শক্তিশালী ইঞ্জিন বানানো সম্ভব। এভাবে বড় মাপের লাইভ ইভেন্টের ধারাবাহিক আয়োজন করা গেলে আগামী পাঁচ বছরে অসমে ৭০০ কোটি টাকার বেশি সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রভাব তৈরি হবে। ২০২৫-এর ডিসেম্বরে হওয়া পোস্ট ম্যালোনের কনসার্টকে কেস স্টাডি করে দেখা গেছে, শো-টি মোট ৪৩ কোটি টাকার বেশি অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলেছে। এর মধ্যে দর্শকদের সরাসরি খরচের মাধ্যমে ৩২ কোটি টাকা অসমের অর্থনীতিতে ঢুকেছে, আর জিএসটি বাবদ প্রায় ৫ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। সেই সময় বিমান পরিষেবায় বড় বিপর্যয় থাকা সত্ত্বেও কনসার্টে প্রায় ২০ হাজার দর্শক হাজির ছিলেন। তার মধ্যে ৫৩ শতাংশই ছিলেন গুয়াহাটির বাইরে থেকে। ভারতের ২০০-র বেশি শহর-জনপদের মানুষ গুয়াহাটিতে এসে পোস্ট ম্যালোনের শো উপভোগ করেছেন। রিপোর্ট অনুযায়ী, কনসার্টের টিকিটে প্রতি ১০০ টাকা খরচের বিপরীতে দর্শকরা থাকা-খাওয়া, যাতায়াত, শপিং আর স্থানীয় পরিষেবায় অতিরিক্ত ৮৯৯ টাকা খরচ করেছেন। কনসার্টের সপ্তাহান্তে গুয়াহাটির হোটেলে ঘর ভরাট বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ, স্থানীয় পরিবহণ পরিষেবার চাহিদা বেড়েছে ৫০ শতাংশের বেশি, রেস্তোরাঁ-ক্যাফেতে ক্রেতা বেড়েছে ৩৩ শতাংশের বেশি আর খুচরো দোকানে ক্রেতার উপস্থিতি বেড়েছে ৩০ শতাংশের বেশি। কনসার্ট ঘিরে আঞ্চলিক পর্যটনও লাভবান হয়েছে। শো-তে আসা দর্শকরা কাজিরাঙা জাতীয় উদ্যান, মাজুলি দ্বীপ, কামাখ্যা মন্দির আর শিবসাগরের মতো জায়গা ঘুরেছেন। ফলে উত্তর-পূর্বের প্রবেশদ্বার হিসেবে গুয়াহাটির গুরুত্ব আরও বেড়েছে। রিপোর্টে উঠে এসেছে, ২০২৫ সালে গুয়াহাটিতে লাইভ অনুষ্ঠানে দর্শক উপস্থিতি ১৮৮ শতাংশ বেড়েছে এবং ওই বছর শহরে ৫৫টি টিকিটভিত্তিক লাইভ অনুষ্ঠান হয়েছে। শিলং-কে সঙ্গে নিয়ে গুয়াহাটি ধীরে ধীরে বড় মাপের লাইভ মনোরঞ্জনের গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হয়ে উঠছে। এটা শুধু উত্তর-পূর্বে সীমাবদ্ধ নয়, গোটা দেশেই মেট্রোর বাইরের শহরগুলো বিশ্বমানের লাইভ অভিজ্ঞতার কেন্দ্র হয়ে উঠছে যার প্রভাব পর্যটন, আতিথেয়তা, পরিবহণ আর স্থানীয় ব্যবসায় স্পষ্ট। দর্শকদের খরচের পাশাপাশি পোস্ট ম্যালোনের এই কনসার্ট কর্মসংস্থান আর স্থানীয় ব্যবসায় বড় ভূমিকা রেখেছে। নিরাপত্তা, আতিথেয়তা, প্রোডাকশন, লজিস্টিক্স আর ভেন্যু ম্যানেজমেন্ট সহ নানা খাতে প্রায় ২৫০০ জন কর্মীকে নিয়োগ করা হয়। মঞ্চ নির্মাণ, ব্র্যান্ডিং, পরিকাঠামো, খাবার-পানীয়, সংযোগ ব্যবস্থা, ডিজিটাল পেমেন্ট আর টেকসই পরিচালনার কাজে স্থানীয় ব্যবসায়ী-বিক্রেতারাও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। অসমকে লাইভ মনোরঞ্জনের গন্তব্য বানাতে সাহায্য করছে রাজ্য সরকারের কনসার্ট ট্যুরিজম নীতি, এটিডিসির ওয়ান উইন্ডো পরিষেবা, পরিকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ, আতিথেয়তা খাতের সম্প্রসারণ আর স্থানীয় প্রতিভা ও বিক্রেতা ইকোসিস্টেমের ধারাবাহিক বিকাশ। এই পরিস্থিতিতে বুকমাইশো মনে করছে, আগামী পাঁচ বছরে গুয়াহাটি শক্তিশালী আঞ্চলিক লাইভ মনোরঞ্জন কেন্দ্র হয়ে উঠবে। বর্ধিত পরিকাঠামো, বাড়তে থাকা প্রোডাকশন সক্ষমতা আর টেকসই ইকোসিস্টেমের সাহায্যে এই খাত রাজ্যে ৭০০ কোটির বেশি সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারবে। এটিডিসির ম্যানেজিং ডিরেক্টর কুমার পদ্মপানি বরা, আইআরএস বলেন, অসমের জন্য কনসার্ট অর্থনীতি শুধু মনোরঞ্জন নয়, পর্যটন, সংস্কৃতি, যুব সমাজের অংশগ্রহণ আর অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে একসাথে এগিয়ে নেওয়ার মাধ্যম। লক্ষ্য এমন সহায়ক পরিবেশ গড়ে তোলা যেখানে বড় মাপের অনুষ্ঠান নিয়মিত আয়োজনের সুযোগে বদলাবে, রাজ্যে পর্যটক আসবে, স্থানীয় কর্মসংস্থান তৈরি হবে আর জাতীয়-আন্তর্জাতিক মঞ্চে অসম আরও উজ্জ্বল হবে। বুকমাইশো লাইভ ইভেন্টসের চিফ বিজনেস অফিসার নমন পুগালিয়া বলেন, ভারতের লাইভ মনোরঞ্জন শিল্পের পরবর্তী অগ্রগতি নির্ভর করবে নতুন সাংস্কৃতিক-মনোরঞ্জন কেন্দ্র গড়ে ওঠার ওপর। সেই যাত্রায় উত্তর-পূর্ব সবচেয়ে সম্ভাবনাময় অঞ্চল, যেখানে সমৃদ্ধ সঙ্গীত ঐতিহ্য, উৎসাহী দর্শক আর দ্রুত বিকশিত ইকোসিস্টেমের মিলন ঘটেছে। পোস্ট ম্যালোনের কনসার্ট দেখিয়েছে আন্তর্জাতিক মানের লাইভ অনুষ্ঠান কীভাবে ভেন্যুর বাইরে গিয়ে পর্যটন, আতিথেয়তা, স্থানীয় ব্যবসা আর কর্মসংস্থানে প্রভাব ফেলে। সরকার, শিল্প আর স্থানীয় অংশীদাররা একসাথে কাজ করলে কী ধরনের সম্ভাবনার দরজা খোলে তাও এই কনসার্ট প্রমাণ করেছে। ইওয়াই-পার্থেননের পার্টনার ও মিডিয়া-এন্টারটেইনমেন্ট বিভাগের প্রধান রাঘব আনন্দ বলেন, লাইভ অনুষ্ঠান শক্তিশালী অর্থনৈতিক গুণক প্রভাব তৈরি করছে আর আতিথেয়তা, পরিবহণ, খুচরো বাণিজ্য ও স্থানীয় পরিষেবায় ব্যবসার ঢেউ তুলছে। অসমকে আলাদা করছে শুধু অর্থনৈতিক প্রভাব নয়, তার পেছনে গড়ে ওঠা সমন্বিত ইকোসিস্টেম। স্পষ্ট নীতিগত দিকনির্দেশনা, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়, পরিকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ আর ফলাফল মূল্যায়নের প্রতি দায়বদ্ধতা এর অংশ। লাইভ মনোরঞ্জনকে সাময়িক প্রদর্শনী না দেখে অর্থনৈতিক পরিকাঠামোর অংশ ভাবলে তা পর্যটন, কর্মসংস্থান আর আঞ্চলিক অগ্রগতির বারবার কাজে আসা শক্তিশালী ইঞ্জিনে বদলাবে। রিপোর্টের বড় পর্যবেক্ষণ, সফল কনসার্ট অর্থনীতি বিচ্ছিন্ন শো দিয়ে গড়ে ওঠে না, ভিত তৈরি হয় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ আর দক্ষ ইকোসিস্টেম দিয়ে। প্রগতিশীল নীতি, পরিকাঠামোর উন্নতি, আতিথেয়তা খাতের সম্প্রসারণ, এটিডিসির ওয়ান উইন্ডো আর স্থানীয় প্রতিভা-বিক্রেতা ইকোসিস্টেমে টানা বিনিয়োগের ফলে অসম ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ লাইভ মনোরঞ্জনের গন্তব্য হয়ে উঠছে। এই সব পদক্ষেপ ভারতের অভিজ্ঞতাভিত্তিক অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে রাজ্যকে দ্রুত বাড়তে থাকা মনোরঞ্জন করিডোরে বদলাতে সাহায্য করছে। এই অগ্রগতির প্রভাব ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। পোস্ট ম্যালোনের ঐতিহাসিক শো-এর পর ২০২৬-এর ১৭ নভেম্বর অসমে আসছে কিংবদন্তি রক ব্যান্ড গানস এন রোজেস, যা আন্তর্জাতিক কনসার্ট আয়োজনের মানচিত্রে রাজ্যের বাড়তে থাকা গুরুত্ব আরও জোরদার করবে। ভারতের অভিজ্ঞতাভিত্তিক অর্থনীতি যখন প্রথাগত মেট্রোর গণ্ডি ছাড়িয়ে ছড়াচ্ছে, অসমের এই যাত্রা দেখাচ্ছে লাইভ মনোরঞ্জন কীভাবে পর্যটন, কর্মসংস্থান আর অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে দ্রুত এগিয়ে নিতে পারে। পাশাপাশি দেশের অন্য উদীয়মান গন্তব্যগুলোর জন্যও এটা কার্যকরী মডেল হয়ে উঠছে। বুকমাইশো-র প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও আশীষ হেমরাজানি বলেন, অসম পর্যটনের সঙ্গে বোঝাপড়ার চুক্তি করার সময় শুধু অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনা ছিল না, লক্ষ্য ছিল পুরো ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা। বড় মাপের লাইভ মনোরঞ্জন রাজ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনৈতিক গুণক উপাদানগুলোর একটি। এটা হোটেল ভরাট করে, স্থানীয় ব্যবসাকে চাঙ্গা করে আর অল্প সময়ে দক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি করে। অসমের সঙ্গে পাঁচ বছরের রোডম্যাপ এই ভাবনা থেকেই তৈরি, রাজ্যকে বিশ্বমানের লাইভ অভিজ্ঞতার ধারাবাহিক গন্তব্য আর উত্তর-পূর্বকে ভারতের পরবর্তী বড় মনোরঞ্জন করিডোর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *