বিশেষ প্রতিবেদন। নিউ ইয়র্ক : রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে বিদেশ সফরে থাকা সঙ্ঘ প্রধান মোহন ভাগবত শনিবার নিউ ইয়র্কের বিখ্যাত ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে এক ঐতিহাসিক সভা থেকে ভারতের বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য এবং হিন্দুত্বের আসল সংজ্ঞা নিয়ে বড় বার্তা দিলেন। ‘আমেরিকান হিন্দুজ ফর এনগেজমেন্ট অ্যান্ড ডায়ালগ (AHEAD)’ আয়োজিত ‘ওয়ান ওয়ার্ল্ড ওয়ান হিউম্যানিটি ফেথ’ সম্মেলনের অংশ হিসেবে ‘দ্য ইউনিভার্সাল ওয়াননেস সেলিব্রেশন’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানে আমেরিকার ৩৯টি অঙ্গরাজ্য ও ৮৫০টি শহরের প্রতিনিধি ছাড়াও বিশ্বের ২৯টি দেশের প্রায় ৬ হাজারেরও বেশি আমন্ত্রিত অতিথি ও প্রবাসী ভারতীয়রা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানের মূল বক্তা হিসেবে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে ভাষণ দেন ভাগবত। তিনি ভারতের শাশ্বত রূপ তুলে ধরে বলেন, “ইতিহাস বলছে ভারত সকলকে গ্রহণ করেছে। যারা পৃথিবীর অন্য কোথাও আশ্রয় পাননি তাঁরাও ভারতে এসে ঠাঁই পেয়েছেন। এটাই আমাদের রীতি। বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য ভারতের মজ্জায় মিশে রয়েছে, ভারতের DNA-তেই রয়েছে। বৈচিত্র্য সেই একতাকে আরও অলঙ্কৃত করে তোলে। তাই বৈচিত্র্যকে কেবল মেনে নেওয়া বা সম্মান জানানোই নয়, তাকে উদযাপন করতে হবে।”
এরপরই তাঁর বক্তব্যে ভারতের হিন্দু ও মুসলিম প্রসঙ্গ উঠে আসে। তিনি বলেন, “মুসলিম সম্প্রদায়ের অনেকে আমাকে বলেন, আপনারা হিন্দু সংগঠন পরিচালনা করেন, হিন্দু রাষ্ট্র নির্মাণের স্বপ্ন দেখেন, তাহলে সেখানে কি আমাদের কোনও জায়গা হবে না? আমাদের কি ভারত থেকে বিতাড়িত করা হবে? আমি তাঁদের বলি, এই ভাবনার কোনও স্থান হিন্দুত্বে নেই। হিন্দুত্ব এমন কোনও ভাবনাকে প্রশ্রয়ও দেয় না। আমি মনে করি যদি ভারতের কোনও হিন্দু ভাবে দেশে মুসলমান থাকবে না তাহলে তারই আর হিন্দু থাকা হবে না। আমরাই এই ভাবনাতেই বিশ্বাস করি।”
প্রবাসী ভারতীয়দের দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে তিনি বলেন, “আমাদের কর্তব্য কী? আমরা আমেরিকায় আছি, এখানেই বাস করছি, এখানেই উপার্জন করি। তাই আমাদের খাঁটি আমেরিকানদের মতো আচরণ করা উচিত। প্রথম ও প্রধান কর্তব্য কর্মভূমি আমেরিকার প্রতি অনুগত থাকা।” তিনি আরও বলেন, কর্মভূমির প্রতি দায়িত্ব পালনের পর যদি জন্মভূমি ভারতের প্রতি কিছু করার তাগিদ থাকে তবে তা নিষিদ্ধ নয়, তবে জন্মভূমি মূলত এটাই প্রত্যাশা করে যে সেখান থেকে পাওয়া মূল্যবোধ নিয়ে মানুষ জীবনযাপন করবে।
মানবধর্মের মূল শিক্ষা বোঝাতে গিয়ে তিনি ‘দেব’ বনাম ‘রাক্ষস’ মানসিকতার তুলনা টানেন। তিনি বলেন, যারা শর্ত চাপিয়ে বলে ‘আমাদের কথা মেনে চললে তবেই তোমাদের রক্ষা করব’ তারা রক্ষাকর্তা নয়, প্রকৃতপক্ষে রাক্ষস মানসিকতার পরিচয় দেয়। অন্যদিকে কে কথা শুনল কি শুনল না তার ঊর্ধ্বে উঠে কেবল মানবতা ও ভ্রাতৃত্ববোধের খাতিরে বিশ্বকে টিকিয়ে রাখতে যারা সবাইকে নিয়ে বাঁচে তারাই দেব সমতুল্য।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি একশো বছর পূর্ণ হয়েছে আরএসএসের। সেই লক্ষ্যে ভারতের পাশাপাশি বিশ্বে নিজেদের ভাবধারা ছড়িয়ে দিতে তৎপর হয়েছে সংঘ পরিবার। সেই কারণেই স্থানীয় সময় মঙ্গলবার আমেরিকায় পৌঁছেছেন ভাগবত। আমেরিকায় এসে তিনি ইসকনের প্রতিষ্ঠাতার প্রতিও শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেছেন। মার্কিন সফর শেষ করে কানাডাতেও যাবেন তিনি।
এদিকে এই অনুষ্ঠান ঘিরে গত সপ্তাহখানেক ধরে প্রবল বিতর্ক হয়েছে। নিউ ইয়র্কের ভারতীয় বংশোদ্ভূত মেয়র জোহরান মামদানি বিরোধিতায় সরব হয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “আমার পরিবার আমাকে ভারত সম্পর্কে যে ধারণা দিয়েছে, যে ধারণা নিয়ে আমি বড় হয়েছি, তা হল এটি একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রের বহুত্ববাদী সমাজ। যে সমাজ ভারতে বসবাসকারী প্রত্যেককে সঙ্গে নিয়ে চলে। সেখানে সমাজ থেকে কাউকে দূরে সরিয়ে রাখার দৃষ্টিভঙ্গিতে গড়ে ওঠা একটি আন্দোলনের উত্থান দেখা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।” যদিও অনুষ্ঠান বাতিল করে দেওয়ার এখতিয়ার নিউ ইয়র্ক শহর প্রশাসনের নেই বলেও জানান তিনি। এর আগে মামদানির বক্তব্যের প্রতিক্রিয়াও দিয়েছিল আরএসএস।
ভাগবতের এই বক্তব্যের পর রাজনৈতিক মহলে প্রতিক্রিয়া এসেছে। রাজ্যসভা সাংসদ কপিল সিব্বল সমাজমাধ্যমে লেখেন, “বিদেশে গিয়ে ভালো ভালো কথা বলছেন। কিন্তু দেশের মাটিতে চুপ। শুধু মুখে বলে কিছু হয় না, কাজই কথা বলে।” আবার শিন্দে সেনার সাংসদ শাইনা এনসি স্বাগত জানিয়েছেন সংঘপ্রধানের বার্তাকে। তাঁর মতে, ভাগবতের বার্তায় ‘সকলের প্রতি ন্যায়বিচারের’ কথা তুলে ধরা হয়েছে, কিন্তু কাউকে ‘তোষণের কথা বলা হয়নি’।












