বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন। ঢাকা: ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে যখন দিল্লি ও ঢাকার মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন তুঙ্গে, তখনই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করলেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। তাঁর স্পষ্ট বার্তা — অতীত নিয়ে পড়ে থাকলে দুই দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়, তাকাতে হবে ভবিষ্যতের দিকে।
মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকার সচিবালয়ে বাংলাদেশের পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ড. আব্দুল মঈন খান এবং প্রতিমন্ত্রী মির শাহ আলমের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন ভারতীয় হাইকমিশনার। বৈঠকে গ্রামোন্নয়ন, সমবায় আন্দোলন, দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং দুই দেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় যৌথ উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। কীভাবে ভারতের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের পল্লী অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করা যায়, তা নিয়েও কথা হয়।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, “বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক কেবল দুটি সরকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি দুই দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের সম্পর্ক, হৃদয়ের সম্পর্ক। এই সম্পর্কে আবেগ আছে, ইতিহাস আছে, সংস্কৃতির মিল আছে।”
তিনি আরও বলেন, “এই সম্পর্কে অতীত নিয়ে আটকে থাকার কোনও সুযোগ নেই। অতীত নিয়ে আটকে থাকলে আমরা সুন্দর ভবিষ্যতের দিকে এগোব কীভাবে? দুই দেশের মধ্যে কিছু মতের অমিল, কিছু প্রতিবন্ধকতা থাকবেই। সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই সব প্রতিবন্ধকতা মাথায় রেখেই আমাদের ভবিষ্যতের পথে হাঁটতে হবে। সাধারণ মানুষের উন্নতিই আমাদের শেষ কথা হওয়া উচিত।”
বাংলাদেশের বর্তমান অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে অত্যন্ত কৌশলে সেই প্রসঙ্গ এড়িয়ে যান হাইকমিশনার। তিনি বলেন, “অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে আমার কোনও মন্তব্য করা উচিত নয়। আমি করতেও চাই না। বাংলাদেশের মানুষ অত্যন্ত সচেতন। তাঁরা সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে যে সরকারকে নির্বাচিত করবেন, তাঁরাই ঠিক করবেন দেশের মানুষের জন্য কোনটি ভালো।”
মানুষে মানুষে যোগাযোগের ওপর বিশেষ জোর দিয়ে তিনি বলেন, “সরকার বদলায়, কিন্তু মানুষ থেকে যায়। দুই দেশের সরকার যে সিদ্ধান্তই নিক না কেন, তার সরাসরি প্রভাব পড়ে দুই দেশের সাধারণ মানুষের ওপর। তাই দুই দেশেরই দায়িত্ব হল সাধারণ মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করা।”
অন্যদিকে, এই বৈঠকের আবহেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ খবর সামনে এসেছে। সম্প্রতি একটি মহলে জল্পনা ছড়িয়েছিল যে, খুব শীঘ্রই ভারত সফরে আসতে পারেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেই জল্পনায় জল ঢেলে দিয়েছে বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রক।
মন্ত্রকের আধিকারিক এ কে এম শহিদুল করিম স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, “প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ প্রয়োজন। আমরা এখনও সেই পরিবেশ তৈরি হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করছি।” একই সঙ্গে তিনি কড়া ভাষায় বলেন, “শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের জন্য ভারতের কাছে আমরা যে আবেদন জানিয়েছি, সেই বিষয়ে ভারতকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”
শুধু শেখ হাসিনাই নন, ছাত্রনেতা ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত দুই ব্যক্তি বর্তমানে ভারতে রয়েছে বলে দাবি করেছে ঢাকা। তাদেরও দ্রুত বাংলাদেশের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য দিল্লির কাছে আবেদন জানানো হয়েছে।
কূটনৈতিক মহলের মতে, প্রত্যর্পণ ইস্যুতে ঢাকা যতটা কঠোর অবস্থান নিচ্ছে, দিল্লি ততটাই ধীরে চলো নীতি নিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভারতীয় হাইকমিশনারের ‘ভবিষ্যতের দিকে তাকানোর’ বার্তা অত্যন্ত ইঙ্গিতপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে।












