,

পশ্চিমবঙ্গে পালাবদলের পর সীমান্ত সুরক্ষায় নতুন সমীকরণ: অসম-বাংলা-কেন্দ্র ত্রিমুখী উদ্যোগ

‘মমতার আমলে সম্ভব হয়নি, এবার কাঁটাতারে ঘিরবে বাংলা সীমান্ত’ বিধানসভায় রাজ্যপালের ভাষণ: হিমন্ত ২.০ সরকারের পাঁচ বছরের রোডম্যাপ ২০২৮-এ ১০ লক্ষ কোটির অর্থনীতি, ২ লক্ষ সরকারি চাকরির লক্ষ্য অসমের বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন: পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশের পূর্বাঞ্চলের সীমান্ত সুরক্ষা নীতিতে বড় বদল আসছে। শুক্রবার অসম বিধানসভায় রাজ্যপাল লক্ষ্মণ প্রসাদ আচার্য তাঁর ভাষণে সরকারের…

‘মমতার আমলে সম্ভব হয়নি, এবার কাঁটাতারে ঘিরবে বাংলা সীমান্ত’
বিধানসভায় রাজ্যপালের ভাষণ: হিমন্ত ২.০ সরকারের পাঁচ বছরের রোডম্যাপ
২০২৮-এ ১০ লক্ষ কোটির অর্থনীতি, ২ লক্ষ সরকারি চাকরির লক্ষ্য অসমের

বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন: পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশের পূর্বাঞ্চলের সীমান্ত সুরক্ষা নীতিতে বড় বদল আসছে। শুক্রবার অসম বিধানসভায় রাজ্যপাল লক্ষ্মণ প্রসাদ আচার্য তাঁর ভাষণে সরকারের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা তুলে ধরতে গিয়ে এই ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট জানান, এতদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার ক্ষমতায় থাকায় বাংলাদেশ সীমান্ত সুরক্ষিত করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গেও এখন বিজেপির সরকার। তাই অনুপ্রবেশ রোধ থেকে জাতীয় নিরাপত্তা— সব ক্ষেত্রেই পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবে অসম সরকার।

‘বাংলার উন্মুক্ত সীমান্তই ছিল বড় বাধা’: রাজ্যপাল
অসমে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত সিল করার কাজে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সীমান্তে নজরদারি জোরদার করায় গত কয়েক বছরে প্রচুর সংখ্যক অনুপ্রবেশকারী ধরা পড়েছে। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার সরকার নিয়মিত ‘পুশব্যাক’ প্রক্রিয়াও চালিয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু এতদিন ধরে মুখ্যমন্ত্রীর আক্ষেপ ছিল একটাই। রাজ্যপালের কথায়, ‘অসমের সীমান্তে যতই কড়াকড়ি করা হোক, পশ্চিমবঙ্গের উন্মুক্ত সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশিরা অবাধে ঢুকে পড়তেন। ফলে দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় অসমের একার প্রচেষ্টা পুরোপুরি কাজে আসত না।’

তাঁর দাবি, অসম ও ত্রিপুরার বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকা কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা হলেও পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত আজও অনেকাংশে উন্মুক্ত। ‘মমতার সরকার তাতে গুরুত্ব দেয়নি, কেন্দ্রের সঙ্গে সহযোগিতা করেনি। অথচ বাংলাদেশের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সীমান্ত রয়েছে পশ্চিমবঙ্গেরই,’ ভাষণে উল্লেখ করেন রাজ্যপাল আচার্য।

পালাবদলের পর বদলাচ্ছে চিত্র
পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পালাবদলের পরই ছবিটা পাল্টাতে শুরু করেছে বলে দাবি রাজ্যপালের। তিনি জানান, বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় জমি কেন্দ্রীয় সংস্থার হাতে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

রাজ্যপালের কথায়, ‘জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি দায়বদ্ধ সরকার এখন অসম, পশ্চিমবঙ্গ এবং কেন্দ্রের সমন্বয়ের ভিত্তিতে কাজ করছে। এর ফলে দীর্ঘদিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।’

তিনি আরও যোগ করেন, শিলিগুড়ি করিডোর-সহ স্পর্শকাতর অঞ্চলের সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া বসানোর কাজ সম্পূর্ণ হলে গোটা পূর্বাঞ্চলের সীমান্ত সুরক্ষিত হবে। অনুপ্রবেশ রোধে ফলপ্রসূ ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।

হিমন্ত ২.০ সরকারের পাঁচসালা রোডম্যাপ
সীমান্ত সুরক্ষার পাশাপাশি আগামী পাঁচ বছরে হিমন্ত ২.০ সরকারের লক্ষ্য ও কাজের রূপরেখাও নিজের ভাষণে তুলে ধরেন রাজ্যপাল লক্ষ্মণ প্রসাদ আচার্য।

১. ১০ লক্ষ কোটির অর্থনীতি: রাজ্যপাল জানান, গত পাঁচ বছরে সরকারের নীতির ফলে রাজ্যের ঘরোয়া উৎপাদন বছরে ১৬ শতাংশ চক্রবৃদ্ধি হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বৃদ্ধির হার বজায় থাকলে ২০২৮-২৯ অর্থবর্ষে অসমের অর্থনীতি ১০ লক্ষ কোটি টাকা ছুঁয়ে ফেলবে।

২. অসম গতিশক্তি মাস্টার প্ল্যান: উত্তর-পূর্বের বিকাশের ইঞ্জিন হিসাবে অসমকে রূপান্তর করতে পাঁচ লক্ষ কোটি টাকা বিনিয়োগে ‘অসম গতিশক্তি মাস্টার প্ল্যান’ রূপায়ণ করবে সরকার।

৩. বানমুক্ত অসম: ১৮ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে ‘বানমুক্ত অসম’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রতি বছর বন্যায় বিপর্যস্ত অসমকে স্থায়ীভাবে এই সমস্যা থেকে মুক্ত করাই লক্ষ্য।

৪. কৃষি ও মৎস্য উৎপাদন: উপান্ত কৃষকদের বছরে ১১ হাজার টাকা করে সরাসরি আর্থিক সাহায্য দেওয়া হবে। একইসঙ্গে মাছের উৎপাদন বাড়িয়ে ১০ লক্ষ মেট্রিক টনে নিয়ে যাওয়ার টার্গেট নিয়েছে সরকার।

৫. শিক্ষা ও পরিবেশ: গুয়াহাটিকে ‘শিক্ষার মহানগরী’ হিসেবে গড়ে তোলা হবে। জৈববৈচিত্র্য রক্ষায় ‘বন অসম নীতি’ এবং ‘অরণ্য মিশন’-এর শুভারম্ভ করবে সরকার।

৬. প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থান: প্রশাসনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ানো হবে। পাশাপাশি আগামী পাঁচ বছরে দুই লক্ষ সরকারি চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও ফের মনে করিয়ে দিয়েছেন রাজ্যপাল।

রাজ্যপালের ভাষণ থেকে স্পষ্ট, পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পালাবদলের পর পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তা ও উন্নয়ন নীতিতে কেন্দ্র-রাজ্য সমন্বয়ই এখন বড় হাতিয়ার হতে চলেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *