‘জয়নাব খান’ সেজে ফেসবুক-ইনস্টায় ফাঁদ, ‘অল প্রবলেমস সলিউশনস’ নামে প্রতারণা
প্রেম-বিয়ের সমস্যা মেটানোর নামে হাতানো হল ২.৫১ লক্ষ, উদ্ধার ৫ স্মার্টফোন
নয়াদিল্লি, ২২ মে: দিল্লি পুলিশের সাইবার থানা একটি সর্বভারতীয় সাইবার প্রতারণা চক্রের পর্দাফাঁস করেছে। অভিযোগ, দুই যুবক ভুয়ো নারী সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট খুলে আধ্যাত্মিক নিরাময়কারী সেজে মানসিকভাবে দুর্বল মানুষদের টার্গেট করে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়েছে। শুক্রবার দিল্লি পুলিশ এই তথ্য জানিয়েছে।
ধৃত দুই অভিযুক্ত
ধৃতদের নাম গণেশ ও মনদীপ সিং। দু’জনেরই বয়স ২১ বছর। বাড়ি রাজস্থানের শ্রী গঙ্গানগরে। পাঞ্জাবের মোহালি জেলার খারারের একটি ভাড়া ফ্ল্যাট থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
কীভাবে চলত প্রতারণা
পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্তরা “জয়নাব খান”, “মুসকান খান”, “কবিতা চৌধুরী”, “জারা খান” এবং “ইসলাম ওজিফা” নামে ভুয়ো ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুক অ্যাকাউন্ট চালাত। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সমস্যায় জর্জরিত মানুষদের প্রলুব্ধ করতে তারা সোশ্যাল মিডিয়ায় মনগড়া সাফল্যের গল্প ও মন্তব্য পোস্ট করত। দাবি করা হত, একজন “শক্তিশালী আধ্যাত্মিক চিকিৎসক” তন্ত্র-মন্ত্র ও আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রেম, বিয়ে এবং পারিবারিক বিবাদ মিটিয়ে দিয়েছেন।
ভুক্তভোগীরা এই প্রোফাইলে যোগাযোগ করলেই অভিযুক্তরা হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর দিয়ে নিজেদের আধ্যাত্মিক চিকিৎসক হিসেবে পরিচয় দিত। এরপর আবেগতাড়িত করে ব্যক্তিগত সমস্যা শুনে নিত। তারপর পূজা, তন্ত্র বিদ্যা, আধ্যাত্মিক প্রতিকার ও পূজার সামগ্রী কেনার অজুহাতে কিস্তিতে কিস্তিতে টাকা দাবি করত।
মামলার সূত্রপাত
ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ধারা ৩১৮(৪)-এর অধীনে সাইবার পুলিশ স্টেশন, কেন্দ্রীয় জেলায় একটি ই-এফআইআর দায়ের হওয়ার পর ঘটনাটি সামনে আসে। অভিযোগকারী জানান, তাঁর ব্যক্তিগত সমস্যা সমাধানের জন্য বিশেষ আচার-অনুষ্ঠান ও আধ্যাত্মিক প্রতিকারের নামে তাঁকে বারবার টাকা পাঠাতে প্ররোচিত করা হয়। তিনি ছয়টি পৃথক লেনদেনে অভিযুক্তকে ২.৫১ লক্ষ টাকা পাঠান।
তদন্তে উঠে এল চাঞ্চল্যকর তথ্য
তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, অভিযুক্তরা “অল প্রবলেমস সলিউশনস” নামে কার্যক্রম চালাচ্ছিল। ভুয়ো অনলাইন পরিচয় ব্যবহার করে ভারতজুড়ে ২,০০০ জনেরও বেশি মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল তারা।
সাব-ইন্সপেক্টর গৌরব সিং-এর নেতৃত্বে হেড কনস্টেবল ক্রান্তি, হীরাল লাল ও ভারত সিং-কে নিয়ে গঠিত পুলিশ দল সাইবার পুলিশ স্টেশনের স্টেশন হাউস অফিসার ইন্সপেক্টর যোগরাজ দালাল এবং সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্টের এসিপি অপারেশনস-এর তত্ত্বাবধানে তদন্ত চালায়। দলটি অভিযুক্তদের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর, ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট, লগইন সেশন, আইপি অ্যাড্রেস এবং ডিজিটাল ফুটপ্রিন্টের প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ করে। আর্থিক লেনদেনের সূত্রও খতিয়ে দেখা হয়।
গ্রেপ্তার ও উদ্ধার
প্রযুক্তিগত নজরদারি ও সরেজমিন তদন্তের ভিত্তিতে পুলিশ মোহালিতে অভিযুক্তদের গোপন আস্তানার সন্ধান পায়। সেখানে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। অপরাধে ব্যবহৃত পাঁচটি স্মার্টফোন উদ্ধার হয়েছে। ডিভাইসগুলিতে ভুয়ো সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট, “অল প্রবলেমস সলিউশনস” নামে কনফিগার করা হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট, আপত্তিকর চ্যাট, কিউআর কোড, ছবি এবং অন্যান্য ডিজিটাল প্রমাণ মিলেছে।
অভিযুক্তদের পরিচয়
পুলিশ জানিয়েছে, গণেশ বর্তমানে দূরশিক্ষার মাধ্যমে বিএ করছে। মনদীপ সিং বিএ ডিগ্রির পাশাপাশি ডিজেল ইঞ্জিন মেকানিক বিষয়ে আইটিআই কোর্স সম্পন্ন করেছে।
আরও তদন্ত চলছে
ডেপুটি কমিশনার অফ পুলিশ, সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্ট, রোহিত রাজবীর সিং বলেছেন, সিন্ডিকেটের অন্যান্য সদস্যদের শনাক্ত করতে, অর্থের সম্পূর্ণ উৎস খুঁজে বের করতে এবং দেশজুড়ে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া মোট অর্থের পরিমাণ নিশ্চিত করতে তদন্ত চলছে।












