শহিদদের রক্তের ঋণ শোধে বাংলা ভাষাকে সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠার ডাক সাংসদ কণাদ পুরকায়স্থের
বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন: উনিশে মে বাঙালির হৃদয়ে রক্তাক্ষরে লেখা এক গৌরবগাথা। সেই গৌরবের ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় শিলচর গান্ধীভবন মুখরিত হলো ‘বর্ণময় ১৯’ অনুষ্ঠানের। শ্রীহট্ট সম্মিলনী শিলচর শাখার এই মহতী আয়োজনে ভাষা শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত হয়েছিলেন শহরের বিশিষ্ট নাগরিক, ভাষাসৈনিক, সমাজসেবী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও অসংখ্য ভাষাপ্রেমী মানুষ। সন্ধ্যা ঠিক ছ’টায় কার্যকরী সভানেত্রী স্বর্ণালি চৌধুরীর পরিচালনায় মঙ্গলপ্রদীপ প্রজ্বলন ও সমবেত শান্তিস্তোত্রের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের শুভারম্ভ ঘটে। গোটা গান্ধীভবন প্রাঙ্গণ তখন আবেগ আর শ্রদ্ধায় থমথমে।
শহিদদের স্মরণে সম্মাননা :
অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বে ‘উনিশের সম্মাননা’ প্রদান করা হয় কিংবদন্তি ভাষাসৈনিক উদয়শঙ্কর গোস্বামীকে। উত্তরীয়, মানপত্র ও স্মারক হাতে তুলে দেন আয়োজক কমিটির কর্মকর্তারা । মরণোত্তর সম্মাননা জানানো হয় প্রাক্তন বিধায়ক নন্দকিশোর সিনহা ও অকুতোভয় ভাষাসৈনিক প্রয়াত সমর কুমার চন্দকে। নন্দকিশোর সিনহার পক্ষে সম্মাননা গ্রহণ করেন পুত্র নগেন্দ্র কিশোর সিনহা ও পুত্রবধূ সুপ্রভা সিনহা। প্রয়াত সমর কুমার চন্দের পক্ষে গ্রহণ করেন ছোটো পুত্র যিশু চন্দ ও নাতি অভিজিৎ দেব।

এছাড়া ভাষা ও সংস্কৃতি চর্চায় বিশেষ অবদানের জন্য ১৯-এর সম্মান স্মারক প্রদান করা হয় সমাজসেবী সুব্রত চক্রবর্তী, অধ্যাপক দীপঙ্কর কর, বিশিষ্ঠ সাংবাদিক দেবাশিস পুরকায়স্থ, আবৃত্তিকার জনান্তিকা দেব ভট্টাচার্য, সাংস্কৃতিক কর্মী বিপ্লব দে, লোকশিল্পী সায়ন রায় কুটন ও দেবরাজ ভট্টাচার্যকে। অনুষ্ঠানে কবি কস্তুরী হোমচৌধুরী উনিশের প্রেক্ষাপটে স্বরচিত কবিতা পাঠ করে সকলকে আবেগাপ্লুত করেন।
বক্তব্যে উঠে এল উনিশের চেতনা:
অতিথির ভাষণে রাজ্যসভার সাংসদ কণাদ পুরকায়স্থ বলেন, “উনিশ আমাদের প্রাত্যহিক যাপনের প্রেরণা। ১৯ মে-র শহিদরা প্রমাণ করেছিলেন মাতৃভাষার জন্য বাঙালি প্রাণ দিতে পারে। শিলচর রেলস্টেশনে পুলিশের গুলিতে যে ১১টি তাজা প্রাণ ঝরে গিয়েছিল, তাঁরা শুধু বরাকের নন, সমগ্র বাঙালি জাতির গর্ব। সেই চেতনা ঘরে ঘরে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। শুধু একদিনের অনুষ্ঠান নয়, বছরের প্রতিটি দিন উনিশের আত্মত্যাগকে স্মরণ করতে হবে। ভাষা শহিদদের রক্তের ঋণ শোধ করতে হলে বাংলা ভাষাকে শিক্ষা, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থার সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।”

সভাপতির ভাষণে কিশোর কুমার ভট্টাচার্য বলেন, “উনিশে মে বরাকের ইতিহাসে এক অমর দিন। ১৯৬১ সালে এই শিলচরের মাটিতেই মাতৃভাষার জন্য কমলা ভট্টাচার্য, শচীন্দ্র পাল, বীরেন্দ্র সূত্রধর সহ ১১ জন শহিদ হয়েছিলেন। তাঁদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আজ আমরা নিজের ভাষায় কথা বলছি, শিক্ষা নিচ্ছি, সংস্কৃতি চর্চা করছি। শ্রীহট্ট সম্মিলনী দীর্ঘদিন ধরে উনিশের ইতিহাস সংরক্ষণ ও নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করে আসছে। ‘বর্ণময় ১৯’ সেই প্রয়াসেরই একটি ধাপ। আমাদের মনে রাখতে হবে, ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি একটি জাতির আত্মার পরিচয়, অস্তিত্বের শিকড়। উনিশের চেতনাকে বুকে ধারণ করে শহিদদের স্বপ্নের বরাক গড়তে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।”
কার্যকরী সভানেত্রী স্বর্ণালি চৌধুরী তাঁর বক্তব্যে বলেন, “উনিশ শুধু একটি তারিখ নয়, উনিশ বরাকের আত্মপরিচয়ের দলিল। ১৯৬১ সালের ১৯ মে এই মাটির ১১টি তাজা প্রাণ মাতৃভাষার জন্য আত্মাহুতি দিয়েছিল। শ্রীহট্ট সম্মিলনী ‘বর্ণময় ১৯’-এর মাধ্যমে সেই গৌরবগাথাকেই নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে চায়। আমরা প্রতিজ্ঞা করছি, উনিশের চেতনাকে ম্লান হতে দেব না। ঘরে ঘরে, স্কুলে-কলেজে, গানে-কবিতায় উনিশকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।”
সম্মাননা গ্রহণের পর আবেগাপ্লুত কণ্ঠে ভাষাসৈনিক উদয়শঙ্কর গোস্বামী সেদিনের ভয়াবহ স্মৃতিচারণা করেন। তিনি বলেন, “১৯৬১ সালের ১৯ মে আমরা যে রক্ত দিয়েছি, তা শুধু ভাষার জন্য নয়, অস্তিত্বের জন্য। সেদিন শিলচর রেলস্টেশনে নিরস্ত্র, শান্তিপূর্ণ সত্যাগ্রহীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চলেছিল। কমলা ভট্টাচার্য, শচীন্দ্র পাল, বীরেন্দ্র সূত্রধর, সুকোমল পুরকায়স্থ, কানাইলাল নিয়োগী, তরণী দেবনাথ, সুনীল সরকার, সত্যেন্দ্র দেব, হিতেশ বিশ্বাস, কুমুদরঞ্জন দাস, চণ্ডীচরণ সূত্রধর—এই ১১ জন শহিদ হয়েছিলেন। রক্তে ভেসে গিয়েছিল স্টেশন চত্বর। আজকের প্রজন্মকে সেই ইতিহাস ভুললে চলবে না।”
সমাজসেবী ও উনিশে মে উদযাপন কমিটির সভাপতি নিশা শর্মা ভাষাসৈনিক সমর কুমার চন্দের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বলেন, “সমর কুমার চন্দ শুধু একজন ভাষাসৈনিক ছিলেন না, তিনি ছিলেন অকুতোভয় এক যোদ্ধা। ভয় শব্দটা তাঁর অভিধানে ছিল না। শুধু ভাষা আন্দোলনের ডাক নয়, যে কোনো সামাজিক কাজে, মানুষের বিপদে সমর কুমার চন্দ সবার আগে দাঁড়াতেন। নরসিংতোলা, সেন্ট্রাল রোড, শিলংপট্টী—যেখানেই অন্যায়, সেখানেই তিনি ছিলেন প্রতিবাদী কণ্ঠ। ১৯শে মে-র সেই রক্তঝরা দিনে পুলিশের বন্দুকের নলের সামনে যাঁরা বুক পেতে দিয়েছিলেন, সমর কুমার চন্দ তাঁদেরই একজন। গুলির মুখে দাঁড়িয়েও তাঁর কণ্ঠে ছিল মাতৃভাষার জয়গান। অথচ তাঁর ছেলে আমাদের সকলের প্রিয় সন্তোষ চন্দ এতটাই শান্ত, নম্র, বিনয়ী। বাবার তেজ আর ছেলের বিনয়, দুয়ে মিলেই যেন উনিশের প্রকৃত চেতনা।”
শ্রীহট্ট সম্মিলনীর কেন্দ্রীয় কমিটির উপদেষ্টা সাধন পুরকায়স্থ বলেন, “রাধারমণ দত্ত ও হাসন রাজার সৃজনশীলতা আমাদের পরিচয়। ১৯৬১-র ভাষা আন্দোলন ছিল আমাদের সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা দিতে হবে, এই দাবি শুধু বরাকের নয়, সারা বিশ্বের বাঙালির।”
বিশিষ্ট আইনজীবী এবং শ্রীহট্ট সম্মিলনীর সহ-সভাপতি রজত ঘোষ বলেন, “উনিশে মে বরাক উপত্যকার ইতিহাসে এক গৌরবময় অধ্যায়। শহিদদের রক্ত বৃথা যেতে পারে না। নতুন প্রজন্মকে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধ হতে হবে। ইংরেজি শিখব, কিন্তু মাতৃভাষাকে ভুলে নয়।”
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অজিত দেব বলেন, “গান, কবিতা, নাটক, চলচ্চিত্রের মাধ্যমে উনিশের চেতনাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। ১৯৬১ সালের ভাষা শহিদরা শুধু রাজপথে নামেননি, তাঁরা একটি জাতির বিবেককে জাগিয়ে দিয়েছিলেন। আজকের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সেই শহিদদের প্রতিই আমাদের সুরেলা শ্রদ্ধাঞ্জলি।”
যুব প্রতিনিধি অভ্রজিত চক্রবর্তী বলেন, “আমরা যারা উনিশ দেখিনি, বইয়ের পাতায় পড়েছি, তাদের দায়িত্ব অনেক বেশি। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে যেন আমরা বাংলা হরফ ভুলে না যাই। শহিদদের আত্মত্যাগের মূল্য দিতে হলে আমাদের বাংলা ভাষাকে ভালোবাসতে হবে, চর্চা করতে হবে, লিখতে হবে। উনিশের চেতনা হোক আমাদের পথ চলার শক্তি।”

সম্পাদক সন্তোষ চন্দ বলেন, “শহিদদের স্বপ্ন ছিল মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার, মাতৃভাষায় শিক্ষার অধিকার। আজ আমরা সেই অধিকার ভোগ করছি। কিন্তু ইতিহাস ভুলে গেলে চলবে না। শ্রীহট্ট সম্মিলনী উনিশের ইতিহাস সংরক্ষণে, গবেষণায় ও প্রচারে নিরলস কাজ করে যাবে।”
অধ্যাপক দীপঙ্কর কর একাডেমিক দৃষ্টিকোণ থেকে বলেন, “একাডেমিক স্তরে উনিশের চর্চা বাড়াতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে, কলেজে গবেষণার মাধ্যমে ১৯৬১-র আন্দোলনকে পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। তবেই নতুন প্রজন্ম সঠিক ইতিহাস জানবে, গর্ববোধ করবে।”
সমাজসেবী সুব্রত চক্রবর্তী বলেন, “উনিশ আমাদের রক্তে লেখা অহঙ্কার। ভাষা শহিদরা আমাদের শিখিয়ে গেছেন মাথা উঁচু করে বাঁচতে। তাঁদের সেই আত্মত্যাগকে আমরা যেন শুধু ফুল-মালা আর একদিনের অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ না রাখি। উত্তর প্রজন্মের হৃদয়ে সেই ইতিহাসের প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখাই শহিদদের প্রতি প্রকৃত ঋণ শোধ।”

আলোচনা পর্বের পর দ্বিতীয় পর্বে শুরু হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ভাষা শহিদদের প্রতি গানে-নাচে-আবৃত্তিতে শ্রদ্ধা জানায় নৃত্যকলি একাডেমি, নটরাজ নৃত্যালয়, ছন্দে ছন্দে মিউজিক একাডেমি, সুরমল্লার সাংস্কৃতিক সংস্থা, ত্রিনয়ণী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংস্থা, সাঁই সঙ্গীতালয়ের শিল্পীরা। একক সঙ্গীতে মাতিয়ে তোলেন বাপি রায় ও বিক্রমজিৎ বাউলিয়া।
যন্ত্রসঙ্গীতে ছিলেন তবলায় বিপ্লব দে, কি-বোর্ডে দিবাকর দাস, অক্টোপ্যাডে লুইতেশ দাস, বাঁশিতে সৌমেন পালচৌধুরী। তাঁদের সুরের মূর্ছনায় গোটা প্রেক্ষাগৃহ এক অন্য আবেশে ডুবে যায়। সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন সাংবাদিক দেবাশিস পুরকায়স্থ ও আবৃত্তিকার জনান্তিকা দেব ভট্টাচার্য। সমগ্র অনুষ্ঠানটি সুচারুভাবে পরিচালনা করেন সম্পাদক সন্তোষ চন্দ।

অনুষ্ঠানের শেষ লগ্নে অংশগ্রহণকারী সকল শিল্পী ও দলকে ‘উনিশের সম্মাননা স্মারক’ তুলে দেন অরিন্দম ভট্টাচার্য, উদয়শংকর গোস্বামী, সন্তোষ চন্দ, অজিত দেব ও ইক্সিতা দত্ত। সবশেষে বিপ্লব দে সকলকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে ‘বর্ণময় ১৯’-এর অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।













