বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন: শুক্রবার ১৫ মে থেকে দেশজুড়ে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম লিটার প্রতি ৩ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে সিএনজির দাম কেজি প্রতি ২ টাকা বেড়েছে। ২০২২ সালের এপ্রিলের পর দীর্ঘদিন দাম স্থিতিশীল থাকার পর এই প্রথম বড় বৃদ্ধি হল। এর আগে ২০২৪ সালের মার্চে লোকসভা নির্বাচনের আগে লিটারে ২ টাকা কমানো হয়েছিল।
কোথায় কত হল দাম
কলকাতায় পেট্রোলের নতুন দাম লিটার প্রতি ১০৮ টাকা ৭৪ পয়সা, যা আগে ছিল ১০৫ টাকা ৪৫ পয়সা। ডিজেলের দাম বেড়ে হয়েছে ৯৫ টাকা ১৩ পয়সা। দিল্লিতে পেট্রোল লিটার প্রতি ৯৪ টাকা ৭৭ পয়সা থেকে বেড়ে ৯৭ টাকা ৭৭ পয়সা এবং ডিজেল ৮৭ টাকা ৬৭ পয়সা থেকে বেড়ে ৯০ টাকা ৬৭ পয়সা হয়েছে। মুম্বাইতে পেট্রোল ১০৬ টাকা ৬৮ পয়সা ও ডিজেল ৯৩ টাকা ১৪ পয়সা। চেন্নাইতে পেট্রোল ১০৩ টাকা ৬৭ পয়সা এবং ডিজেল ৯৫ টাকা ২৫ পয়সা লিটার।
কেন বাড়ল দাম
বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধিই মূল কারণ। ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভারত গড়ে ব্যারেল প্রতি ৬৯ ডলার দরে অপরিশোধিত তেল আমদানি করত। পরবর্তী মাসগুলোতে তা বেড়ে ব্যারেল প্রতি ১১৩ থেকে ১১৪ ডলার হয়েছে। পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকায় সরবরাহে টান পড়েছে। সৌদি আরামকোর হিসেবে, ইরান যুদ্ধের পর বিশ্ব মোট ১০০ কোটি ব্যারেল তেল সরবরাহ হারিয়েছে। প্রতি সপ্তাহে আরও ১০ হাজার কোটি ব্যারেল সরবরাহ কমছে।
ভারতের তেল আমদানির চাপ
ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে অপরিশোধিত তেল আমদানিতে খরচ হয়েছে ১৭ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। দেশের মোট আমদানি ব্যয়ের মধ্যে তেলের অংশই সবচেয়ে বেশি। এর পর আছে ইলেকট্রনিক সামগ্রী ১১ হাজার ৬০০ কোটি ডলার ও সোনা ৭ হাজার ২০০ কোটি ডলার।ভারতের প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির দুই তৃতীয়াংশ এবং অপরিশোধিত তেল আমদানির অর্ধেক আসে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে। বর্তমানে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৬৯ হাজার কোটি ডলার। রিজার্ভ ব্যাংকের প্রাক্তন ডেপুটি গভর্নর মাইকেল দেবব্রত পাত্রের মতে, নিরাপদ অবস্থানে যেতে রিজার্ভ অন্তত এক লাখ কোটি ডলারে উন্নীত করা দরকার।
রুপির দরপতন ও সরকারের আহ্বান
উপসাগরীয় যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ভারতীয় রুপি এশিয়ার দুর্বল মুদ্রাগুলোর মধ্যে অন্যতম। সংঘাতের শুরুতে ডলার প্রতি ৯১ রুপি ছিল, এখন হয়েছে ৯৫ রুপি। এই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নাগরিকদের জ্বালানি সাশ্রয়ের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বাড়ি থেকে কাজ করা এবং গণপরিবহন ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন। ১০ মে এক বক্তব্যে তিনি পেট্রোল, ডিজেল, ভোজ্য তেলের ব্যবহার কমানো এবং সোনা কেনা কমানোর আহ্বান জানান।
রাশিয়ার আশ্বাস, কূটনৈতিক প্রশ্ন
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আংশিক শিথিল হওয়ার পর ভারত রাশিয়া থেকে তেল কেনা বাড়িয়েছে। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ জানিয়েছেন, ভারতে তেল সরবরাহের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হবে না। তিনি বলেন, ভারত-রাশিয়া সম্পর্ক দুর্বল করার চেষ্টা সফল হবে না। তবে একাধিক বিশেষজ্ঞ ভারতের কূটনৈতিক নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের মতে, ব্রিকসে ভারত একঘরে হয়ে পড়ছে। রাশিয়া, চীন ও ইরান একজোট, আর ভারত আমেরিকা ও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক রাখছে। ডলারের বিপরীতে রুপির দরপতন ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপের মধ্যে ভারত কারও শত্রু হওয়ার অবস্থায় নেই বলেও মন্তব্য করেছেন অনেকে। বিশ্ববাজারে তেলের দামে অস্থিরতা চলছে। এপ্রিলের শেষে ব্যারেল প্রতি দাম ১২৬ ডলারে উঠলেও পরে তা ১০০ ডলারে নেমে আসে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত দামের চাপ থাকবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।












