বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন। ডিব্রুগড় : শিক্ষার আলো ছড়িয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে জ্ঞান, মূল্যবোধ ও মানবিকতার পথে এগিয়ে নিয়ে চলা শিক্ষক-শিক্ষিকাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ডিব্রুগড়ে সফলভাবে অনুষ্ঠিত হলো ব্যতিক্রম গ্রুপের উদ্যোগে ‘গুরু গৌরব সম্মান ২০২৬’-এর দ্বিতীয় সংস্করণ। উজনি অসমের বিভিন্ন প্রান্তের ৫২ জন শিক্ষক-শিক্ষিকাকে তাঁদের দীর্ঘদিনের শিক্ষা, সমাজ গঠন এবং মানবিক মূল্যবোধের ক্ষেত্রে অবদানের জন্য এই সম্মাননা প্রদান করা হয়। ১ অক্টোবর বিকেল ৮টায় ডিব্রুগড়ের ডি.এইচ.এস.কে. কলেজের প্রেক্ষাগৃহে আয়োজিত এই বিশেষ অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানের সূচনা হয় প্রদীপ প্রজ্বলন এবং জেবিন আখতারা বেগমের প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের মধ্য দিয়ে। জেবিন আখতারা বেগমের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ব্যতিক্রম গ্রুপের কর্ণধার ড. সৌমেন ভারতীয়া তাঁর কন্যা সামিম আখতারা আলির হাতে তুলে দেন মরণোত্তর ‘আজীবন জীবনজোড়া সাধনা পুরস্কার’। শিক্ষা, সাহিত্য, অভিনয়, নাট্যচর্চা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে জেবিন আখতারা বেগমের দীর্ঘদিনের অবদান এবং তাঁর জীবনব্যাপী সাধনার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এই বিশেষ পুরস্কার প্রদান করা হয়।
অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডিব্রুগড় মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের মেয়র ড. সৈকত পাত্র, ভবানীপুর গ্লোবাল ক্যাম্পাসের অ্যাসোসিয়েট ভাইস প্রেসিডেন্ট ও হেড, অফিস অব অ্যাডমিশনস অ্যান্ড আউটরিচ জয়ন্ত বাগচী, জেআইএস গ্রুপের ডেপুটি ডিরেক্টর—বিজনেস ডেভেলপমেন্ট বিদ্যুৎ মজুমদার, সমাজকর্মী সামিম আখতারা আলি এবং ব্যতিক্রম গ্রুপের কর্ণধার ড.সৌমেন ভারতীয়া প্রমুখ।
সম্মাননা পর্বে উজনি অসমের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত ৫২ জন শিক্ষক-শিক্ষিকাকে সম্মানিত করা হয়। তাঁদের নিষ্ঠা, জ্ঞান, মূল্যবোধ এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নির্মাণে অবদানের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয় এই আয়োজনের মাধ্যমে। সম্মানপ্রাপ্তদের মধ্যে ছিলেন সারদিন্দু দাস (ডি.আই.ই.টি. চাবুয়া, ডিব্রুগড়), সঞ্জয় জৈন (দিল্লি পাবলিক স্কুল, ডিব্রুগড়), বিকাশ গগৈ (ড. রাধাকৃষ্ণন স্কুল অব আর্টস, কমার্স অ্যান্ড সায়েন্স), শ্রীমতী মামনি বরা মাকরারি (সম্পূর্ণ কেন্দ্রীয় অ্যাকাডেমিক্স প্রাইভেট লিমিটেড), শ্রী লোনাথ চৌখাম (তিসুকিয়া সেশাকোষ মিডল ইংলিশ স্কুল), গন্ধেশ্বর শইকীয়া (বাকপাড়া এম.ই. স্কুল, ডিব্রুগড়), পরিমল মুখার্জি (ডিব্রুগড় বেংগলি হাই স্কুল), সেবন প্রসাদ শর্মা (নন্দেশ্বর চক্রবর্তী হাই স্কুল, ডিব্রুগড়), খগেন্দ্র নাথ চেতিয়া ফুকন (মানকাটা এম.ই. স্কুল, ডিব্রুগড়), সুশান্ত দেব (শান্তিপাড়া বেংগলি হাই স্কুল, ডিব্রুগড়), থানেশ্বর দত্ত (ডিকোম পি.ডি.এম.ই. স্কুল, ডিব্রুগড়), অনিল দেউরাহ (জেউতি মরল এম.ই. স্কুল), ড. দেবা পল্লব রাজখোয়া (ডিব্রুগড় বিশ্ববিদ্যালয়), ড. শশীকান্ত শইকীয়া (ডি.এইচ.এস.কে. কলেজ, ডিব্রুগড়), দুদুল দেউরা (ড. রাধাকৃষ্ণন স্কুল অব আর্টস, সায়েন্স অ্যান্ড কমার্স), রাজীব প্রসাদ (শ্রী অগ্রসেন অ্যাকাডেমি, ডিব্রুগড়), মনোজ কুমার সাদরানি (কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়, অয়েল, দুলিয়াজান), দেবযানী দে দাস (সেন্ট জুড স্কুল), নীলাদীপ কে. চক্রবর্তী (কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়, অয়েল, দুলিয়াজান), বিনীত কুমার (বিবেকানন্দ কেন্দ্র বিদ্যালয়, তিসুকিয়া), ড. দীপালি ভট্টাচার্য (খোয়াং কলেজ, ডিব্রুগড়), ড. মুকুল আহমেদ (গুরুকুল সঙ্গীত নৃত্য কলাকেন্দ্র, ডিব্রুগড় / মার্গারিটা কলেজ), ড. দীপাশ্রী দাস সরকার (শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের জন্য সম্মানিত), কাঞ্চন মিশ্র (সেন্ট জুড স্কুল, ডিব্রুগড়), নূর মহম্মদ (নিতুল স্যার) (ড. রাধাকৃষ্ণন স্কুল অব আর্টস, সায়েন্স অ্যান্ড কমার্স), ড. রুবাব ফাতেমা নোমানি (ডি.এইচ.এস.কে. কলেজ, ডিব্রুগড়), ড. তারানাথ সোণোৱাল (রামধেনু আর্ট অ্যান্ড ক্রাফট অ্যাকাডেমি, ডিব্রুগড়), পার্থ বিজয় দেবনাথ (এন.কে.ডি. সিনিয়র সেকেন্ডারি স্কুল, তিসুকিয়া), নিরঞ্জন শইকীয়া (গভর্নমেন্ট বয়েজ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল, ডিব্রুগড়), জ্যোতির্ময় যোশী (কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়, ডিব্রুগড়), দ্বিজেন কুমার দাস (নন্দেশ্বর চক্রবর্তী হাই স্কুল, ডিব্রুগড়), মুত্যালা নাইডু বিসেট্টি (সম্পূর্ণ কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়, ডিব্রুগড়), উদয় শংকর গগৈ (নহরতালি টি.ই. মডেল হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল), দীপেশ মণ্ডল (দিগবৈ কলেজ), অ্যাঞ্জেলিনা টোপ্পো (ডন বস্কো হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল, ডিব্রুগড়), ড. রীতা পোদ্দার (ডি.এইচ.এস.কে. কলেজ, ডিব্রুগড়), নন্দিনী শর্মা দত্ত (দুলিয়াজান নবজ্যোতি এম.ই. স্কুল), অজয় গিরি (ডন বস্কো হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল, ডিব্রুগড়), রূপজ্যোতি শইকীয়া (দিল্লি পাবলিক স্কুল, দুলিয়াজান), চয়নিকা বৰুৱা (দিল্লি পাবলিক স্কুল, ডিব্রুগড়), মনিষা বৰদলৈ (দিল্লি পাবলিক স্কুল, দুলিয়াজান), প্রফেসর ড. মন্দিরা দাস (ডুমডুমা কলেজ, তিনচুকিয়া), প্রফেসর ড. শেখর পুরকায়স্থ (মনোহরী দেবী কানৈ গার্লস কলেজ, ডিব্রুগড়), প্রফেসর ড. শেখর চক্রবর্তী (মনোহরী দেবী কানৈ গার্লস কলেজ, ডিব্রুগড়), রিজু কুমার ছুতীয়া (রহমারিয়া হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল, ডিব্রুগড়), রাজা রাম প্রসাদ (বিদ্যা ভারতী ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, তিসুকিয়া), মেরিনা গগৈ (সেন্ট থমাস স্কুল, দুলিয়াজান, ডিব্রুগড়), ময়ূরী দাস (ময়ূরী নৃত্য নিকেতন), ড. অনন্ত কুমার দত্ত (ডিব্রুগড় হনুমানবক্স সুরজমল কানৈ কলেজ), সিস্টার নেলিয়া (লিটল ফ্লাওয়ার হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল) প্রমুখ।
ব্যতিক্রম গ্রুপের কর্ণধার ড.সৌমেন ভারতীয়া বলেন, “একজন শিক্ষক কেবল জ্ঞান বিতরণ করেন না, তিনি একটি প্রজন্মের চিন্তা, মূল্যবোধ ও ভবিষ্যৎ নির্মাণ করেন। সমাজের অগ্রগতির নেপথ্যে শিক্ষকদের এই নীরব অথচ অসামান্য অবদান অনেক সময়ই যথাযথভাবে আলোচিত হয় না। ‘গুরু গৌরব সম্মান’-এর মাধ্যমে আমরা সেই মানুষগুলির প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা নিবেদন করতে চাই, যাঁরা নিজেদের জ্ঞান, নিষ্ঠা ও মানবিকতার মাধ্যমে অসংখ্য শিক্ষার্থীর জীবনকে আলোকিত করে চলেছেন। ‘গুরু গৌরব সম্মান’ অনুষ্ঠানের এটি দ্বিতীয় সংস্করণ। এর আগে আমরা গুয়াহাটিতে এই অনুষ্ঠান আয়োজন করেছিলাম এবং এবার উজনি অসমের ডিব্রুগড়ে এই বিশেষ অনুষ্ঠান আয়োজন করতে পেরে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত। উজনি অসমের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ৫২ জন গুরুকে সম্মান জানাতে পেরে আমরা গর্বিত। শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানানোর এই উদ্যোগ শুধু একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। আগামী দিনে অসমের বিভিন্ন প্রান্তে ‘গুরু গৌরব সম্মান’ আয়োজন করে সমাজের নীরব নির্মাতাদের সম্মান জানানোর এই প্রয়াস আমরা অব্যাহত রাখব।”
ডিব্রুগড় মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের মেয়র ড. সৈকত পাত্র বলেন, “গুরু গৌরব সম্মান ২০২৬’ শিক্ষক-শিক্ষিকাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের এক বিশেষ উদ্যোগ। একজন শিক্ষক কেবল পাঠদান করেন না, তিনি শিক্ষার্থীদের জীবন গড়ে তোলার পাশাপাশি সমাজের ভবিষ্যৎ নির্মাণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। গুয়াহাটি থেকে এসে উজনি অসমের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ৫২ জন গুরুকে বেছে নিয়ে ডিব্রুগড়ের মাটিতে তাঁদের এমন একটি বিশেষ সম্মান জানানো সত্যিই গর্বের বিষয়। শিক্ষকসমাজের অবদানকে সামনে এনে তাঁদের সম্মান জানানোর এবং ভবিষ্যতেও সমাজ, শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আরও এমন উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য ব্যতিক্রম গ্রুপকে অনেক আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই।”
জেআইএস গ্রুপের ডেপুটি ডিরেক্টর–বিজনেস ডেভেলপমেন্ট বিদ্যুৎ মজুমদার বলেন, “শিক্ষকতা শুধু একটি পেশা নয়, এটি সমাজ নির্মাণের এক মহৎ দায়িত্ব। একজন শিক্ষকের শেখানো জ্ঞান ও মূল্যবোধ বহু বছর ধরে শিক্ষার্থীদের জীবনে পথ দেখায়। ব্যতিক্রম গ্রুপের ‘গুরু গৌরব সম্মান’ সেই নেপথ্যের মানুষগুলিকে সামনে এনে তাঁদের প্রাপ্য সম্মান জানানোর একটি সুন্দর প্রয়াস। উজনি অসমের বিভিন্ন প্রান্তের ৫২ জন শিক্ষক-শিক্ষিকাকে সম্মান জানানোর এই আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হতে পেরে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত।”
সমাজকর্মী সামিম আখতারা আলি বলেন, “ডিব্রুগড় আমার নিজের শহর, তাই নিজের শহরের মাটিতে দাঁড়িয়ে শিক্ষকদের সম্মান জানানোর এই আয়োজনে অংশ নেওয়া আমার কাছে বিশেষ আবেগের। ব্যতিক্রম গ্রুপের এই উদ্যোগের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো—এখানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সেই মানুষগুলি, যাঁরা নিঃশব্দে অন্যের ভবিষ্যৎ তৈরি করে চলেছেন। ‘গুরু গৌরব সম্মান’ তাঁদের প্রতি সমাজের কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এক আন্তরিক প্রয়াস।”
অনুষ্ঠানের বিশেষ আকর্ষণ ছিল মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক পর্ব। একশ জন শিল্পী একসঙ্গে এক মঞ্চে সংগীত পরিবেশন করে অনুষ্ঠানে এক অনন্য আবহ তৈরি করেন। সম্মিলিত এই সংগীত পরিবেশনা উপস্থিত দর্শকদের বিশেষভাবে মুগ্ধ করে। পাশাপাশি সত্রীয়া নৃত্য, ক্লাসিক্যাল ডান্স ও বিহু নৃত্যের মনোমুগ্ধকর পরিবেশনা অসমের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে অনুষ্ঠানের মঞ্চে তুলে ধরে। নৃত্য ও সংগীতের এই বৈচিত্র্যময় পরিবেশনা সম্মাননা অনুষ্ঠানকে আরও প্রাণবন্ত ও স্মরণীয় করে তোলে।
‘গুরু গৌরব সম্মান ২০২৬’-এর দ্বিতীয় সংস্করণ আয়োজনে সহযোগিতায় ছিল জেআইএস গ্রুপ এডুকেশনাল ইনিশিয়েটিভস, ভবানীপুর গ্লোবাল ক্যাম্পাস (পূর্বতন এনএসএইচএম কলকাতা), নেরিম, রেংগনি—আ রে অব হোপ এবং জেট উইংস।
অনুষ্ঠানটি শিক্ষকতার প্রতি শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার এক সুন্দর বার্তা বহন করে।













