,

জয়ন্ত হাজরিকা: স্বল্প জীবনে সুরের ভেতরে বেঁচে থাকা এক অসমাপ্ত স্বপ্ন

ড. সৌমেন ভারতীয়া কিছু কিছু শিল্পী সময়ের সন্তান হয়েও সময়কে অতিক্রম করে যান। তাঁদের জীবন হয়তো দীর্ঘ নয়, তাঁদের সৃষ্টির সংখ্যাও হয়তো অগণিত নয়; কিন্তু তাঁরা যে সুর রেখে যান, তা প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষের হৃদয়ে অনুরণিত হতে থাকে। জয়ন্ত হাজরিকা তেমনই এক শিল্পী-যাঁর জীবন ছিল অল্প সময়ের, অথচ সুরের পৃথিবীতে তাঁর পদচিহ্ন আজও গভীর…

ড. সৌমেন ভারতীয়া

কিছু কিছু শিল্পী সময়ের সন্তান হয়েও সময়কে অতিক্রম করে যান। তাঁদের জীবন হয়তো দীর্ঘ নয়, তাঁদের সৃষ্টির সংখ্যাও হয়তো অগণিত নয়; কিন্তু তাঁরা যে সুর রেখে যান, তা প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষের হৃদয়ে অনুরণিত হতে থাকে। জয়ন্ত হাজরিকা তেমনই এক শিল্পী-যাঁর জীবন ছিল অল্প সময়ের, অথচ সুরের পৃথিবীতে তাঁর পদচিহ্ন আজও গভীর ও উজ্জ্বল।

১৯৪৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর মঙলদৈয়ে জন্মেছিলেন জয়ন্ত হাজরিকা। সংগীতময় এক পরিবারে বেড়ে ওঠা এই শিল্পী ছিলেন ভারতরত্ন ড° ভূপেন হাজরিকার কনিষ্ঠ ভ্রাতা। পরিবারে সংগীতের আবহ ছিল তাঁর শৈশবের স্বাভাবিক পরিবেশ। কিন্তু সেই পরিবেশ তাঁকে শুধু সংগীতের প্রতি আকৃষ্ট করেনি, বরং নিজের মতো করে সংগীতকে আবিষ্কার করার এক অদম্য কৌতূহলও তৈরি করেছিল। আদরের ‘রানাদা’ মাত্র নয় বছর বয়সেই নিজের প্রথম সুর রচনা করেন। সেই ছোট্ট বয়সে যে সুরের দরজা খুলেছিল, পরবর্তী জীবনে তা হয়ে উঠেছিল অসমীয়া সংগীতের এক নতুন অধ্যায়ের প্রবেশপথ।

জয়ন্ত হাজরিকাকে বুঝতে হলে শুধু তাঁর গান শুনলেই হয় না, শুনতে হয় তাঁর সময়কেও। এমন এক সময়ে তিনি সংগীতচর্চা করছিলেন, যখন অসমীয়া সংগীতের নিজস্ব ঐতিহ্য ছিল গভীর ও সমৃদ্ধ, কিন্তু আধুনিক সংগীতের নানা আন্তর্জাতিক প্রবাহের সঙ্গে তার মেলবন্ধন তখনও খুব বেশি দেখা যায়নি। জয়ন্ত হাজরিকা সেই জায়গাতেই নিজের সৃষ্টিশীলতার স্বাক্ষর রেখেছিলেন।

অসমের লোকজীবন, মাটির গন্ধ, নদীর স্রোত, মানুষের প্রেম-বিরহ, আনন্দ-বেদনা-এসব তাঁর সৃষ্টির অন্তর্গত প্রাণ। কিন্তু সেই শিকড়ের সঙ্গে তিনি মিলিয়েছিলেন রক, জ্যাজ, গসপেল ও ধ্রুপদী সংগীতের নানা উপাদান। ফলে তাঁর সুরে একদিকে যেমন ছিল অসমের নিজস্বতা, অন্যদিকে তেমনই ছিল বিশ্বসংগীতের প্রতি এক উন্মুক্ত জানালা। আজকের দিনে ‘ফিউশন’ শব্দটি আমাদের কাছে অত্যন্ত পরিচিত। কিন্তু সেই শব্দটি জনপ্রিয় হওয়ার বহু আগেই জয়ন্ত হাজরিকা দেখিয়ে দিয়েছিলেন, নিজের ঐতিহ্যকে হারিয়ে না ফেলেও নতুন সংগীতভাষা নির্মাণ করা যায়।

জয়ন্ত হাজরিকার কণ্ঠেও ছিল এক অনন্য মায়া। তাঁর গানে আবেগ কখনও উচ্চকণ্ঠে প্রকাশ পায় না; বরং নিঃশব্দে এসে হৃদয়কে ছুঁয়ে যায়। তাঁর গায়কিতে ছিল কোমলতা, বিষণ্ণতা, গভীরতা এবং এক ধরনের অন্তর্গত শক্তি। প্রেমের গান হোক কিংবা মানুষের জীবনকে ঘিরে কোনো অনুভব-তিনি গানের কথাকে শুধু গেয়ে যাননি, তার ভেতরের আবেগকে নিজের কণ্ঠে জীবন্ত করে তুলেছিলেন। তাঁর সৃষ্টির মধ্যে তাই ব্যক্তিগত অনুভূতি ও সামষ্টিক জীবনের এক সুন্দর মেলবন্ধন দেখা যায়। সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, স্বপ্ন, হতাশা, ভালোবাসা-সবকিছুকেই তিনি সংগীতের অংশ করে নিয়েছিলেন। তাঁর কাছে গান ছিল শুধু বিনোদন নয়; গান ছিল মানুষের সঙ্গে কথা বলার একটি মাধ্যম।

এই জায়গাতেই জয়ন্ত হাজরিকার সঙ্গে তাঁর দাদা ভূপেন হাজরিকার এক গভীর আত্মিক সংযোগ খুঁজে পাওয়া যায়। দুই ভাইয়ের সৃষ্টির ধরন এক ছিল না, তাঁদের সংগীতের ভাষাও ছিল আলাদা। কিন্তু দুজনের সৃষ্টির কেন্দ্রে ছিল মানুষ এবং মানুষের জীবন। ভূপেন হাজরিকা যেমন অসমীয়া সংগীতকে বিশ্বমঞ্চে নিয়ে যাওয়ার এক বৃহৎ স্বপ্ন দেখেছিলেন, জয়ন্ত হাজরিকা তেমনি নিজের পরীক্ষামূলক সুরসৃষ্টির মধ্য দিয়ে অসমীয়া সংগীতের ভেতরেই নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলেছিলেন। তাই তাঁকে শুধুমাত্র ‘ভূপেন হাজরিকার ছোট ভাই’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া তাঁর প্রতি সুবিচার নয়। তিনি ছিলেন নিজের আলোয় উজ্জ্বল এক শিল্পী। তাঁর সৃষ্টিশীলতা, সংগীতবোধ এবং নতুন কিছু করার সাহস তাঁকে অসমীয়া সংগীতের ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র আসন দিয়েছে।

সবচেয়ে বেদনাদায়ক সত্য-এই অসাধারণ সৃষ্টিশীল যাত্রা খুব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। জয়ন্ত হাজরিকার অকালপ্রয়াণ অসমীয়া সংগীতকে শুধু একজন শিল্পী থেকে বঞ্চিত করেনি; বঞ্চিত করেছে আরও কত অপ্রকাশিত সুর, কত অসমাপ্ত ভাবনা, কত সম্ভাব্য নতুন সংগীতভাষা থেকে। একজন শিল্পীর চলে যাওয়ার সঙ্গে কখনও কখনও শুধু তাঁর বর্তমান সৃষ্টিই থেমে যায় না-থেমে যায় তাঁর ভবিষ্যতের সমস্ত সম্ভাবনাও। জয়ন্ত হাজরিকার ক্ষেত্রে সেই অপূর্ণতার অনুভূতিটা আরও গভীর। কারণ তাঁর মধ্যে যে সৃষ্টিশীল অস্থিরতা ছিল, যে নতুন কিছু করার তাগিদ ছিল, তা হয়তো তাঁকে আরও বহু দূর নিয়ে যেতে পারত। অসমীয়া সংগীতের ইতিহাস হয়তো আরও অনেক নতুন বাঁক দেখতে পেত তাঁর হাত ধরে। তবু শিল্পীর সবচেয়ে বড় শক্তি এখানেই-তাঁর শরীর থেমে গেলেও তাঁর সুর থামে না।

কিন্তু জয়ন্ত হাজরিকার ক্ষেত্রে সেই শূন্যতার মধ্যেও তাঁর সুর আজও জীবন্ত। আর সেই সুরকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েই নানা সাংস্কৃতিক উদ্যোগের মাধ্যমে তাঁকে স্মরণ করে চলেছে ব্যতিক্রম।

জয়ন্ত হাজরিকা ও ব্যতিক্রমের সম্পর্ক তাই শুধুমাত্র একটি অনুষ্ঠান বা একটি পুরস্কারকে কেন্দ্র করে নয়। তাঁর শিল্পীসত্তা, তাঁর সংগীতচিন্তা এবং অসমীয়া সংস্কৃতিতে তাঁর অবদানের প্রতি শ্রদ্ধা থেকেই ব্যতিক্রম দীর্ঘদিন ধরে তাঁর স্মৃতিকে নিজেদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করে রেখেছে। জয়ন্ত হাজরিকার জন্মবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে গত পাঁচ বছর ধরে ব্যতিক্রমের পক্ষ থেকে প্রদান করা হয়ে আসছে ‘জয়ন্ত হাজরিকা ব্যতিক্রম জীবনজোড়া সাধনা বঁটা’। সংগীতের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের সাধনা, অবদান ও স্বতন্ত্র শিল্পীসত্তার স্বীকৃতি হিসেবে বিশিষ্ট সংগীতশিল্পীদের হাতে এই সম্মান তুলে দেওয়া হয়।

পাঁচ বছর ধরে চলা এই সম্মাননার ধারাবাহিকতায় এবারও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না। জয়ন্ত হাজরিকার জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আবারও তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সংগীতজগতের এক বিশিষ্ট সাধককে প্রদান করা হবে ‘জয়ন্ত হাজরিকা ব্যতিক্রম জীবনজোড়া সাধনা বঁটা ২০২৬’। এর মধ্য দিয়ে ব্যতিক্রম আরও একবার মনে করিয়ে দিতে চায়-সময়ের সঙ্গে শিল্পীর উপস্থিতি বদলাতে পারে, কিন্তু তাঁর সৃষ্টির প্রতি শ্রদ্ধা কখনও পুরোনো হয় না।

জয়ন্ত হাজরিকা ও ব্যতিক্রমের সম্পর্ক তাই শুধুমাত্র একটি অনুষ্ঠান বা একটি পুরস্কারকে কেন্দ্র করে নয়। এই সম্পর্কের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দীর্ঘদিনের আন্তরিকতা, শ্রদ্ধা ও সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতা। প্রথম থেকেই ব্যতিক্রমের পাশে ছিলেন জয়ন্ত হাজরিকার পত্নী মনীষা হাজরিকা এবং তাঁর পুত্র ময়ুখ হাজরিকা। তাঁদের আন্তরিক সহযোগিতা ও উপস্থিতি ব্যতিক্রমের জয়ন্ত হাজরিকা-স্মরণকে প্রতিবারই আরও অর্থবহ করে তুলেছে।

তাঁর শিল্পীসত্তা, সংগীতচিন্তা এবং অসমীয়া সংস্কৃতিতে তাঁর অনন্য অবদানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা থেকেই ব্যতিক্রম দীর্ঘদিন ধরে তাঁর স্মৃতিকে নিজেদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত করে রেখেছে। জয়ন্ত হাজরিকার জন্মবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে গত পাঁচ বছর ধরে ব্যতিক্রমের পক্ষ থেকে প্রদান করা হয়ে আসছে ‘জয়ন্ত হাজরিকা ব্যতিক্রম জীবনজোড়া সাধনা সম্মান’। সংগীতের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের সাধনা, সৃজনশীল অবদান এবং স্বতন্ত্র শিল্পীসত্তার স্বীকৃতি হিসেবে এই সম্মান তুলে দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন প্রজন্ম ও অঞ্চলের বিশিষ্ট সংগীতশিল্পীদের হাতে। এই সম্মাননার প্রথম পর্বে ২০২১ সালে অসমের বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী জেপি দাস, ২০২২ সালে কলকাতার প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী লোপামুদ্রা মিত্র, ২০২৩ সালে বড়োল্যান্ডের প্রখ্যাত শিল্পী সুলেখা বসুমতারী, ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক সংগীতশিল্পী লু মাজাউ এবং ২০২৫ সালে অসমের প্রখ্যাত কার্বি লোকসংগীতশিল্পী পখিলা লেখথেপি এই সম্মানে ভূষিত হন। এই ধারাবাহিকতা শুধু বিশিষ্ট শিল্পীদের সম্মানিত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর মধ্য দিয়ে জয়ন্ত হাজরিকার সংগীতচেতনা, বহুমাত্রিকতা এবং শিল্পসাধনার উত্তরাধিকারকেও নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এক সাংস্কৃতিক প্রয়াস অব্যাহত রয়েছে। আর সেই পরম্পরারই ষষ্ঠ অধ্যায়ে, ২০২৬ সালে অরুণাচলের লোকসংগীত ও লোকঐতিহ্যের অন্যতম বিশিষ্ট সাধক রেরিক কার্লো দিগবাককে প্রদান করা হচ্ছে ‘জয়ন্ত হাজরিকা ব্যতিক্রম জীবনজোড়া সাধনা সম্মান ২০২৬’। পাঁচ বছরের এই সম্মাননা-যাত্রা পেরিয়ে ষষ্ঠ বছরে এসেও ব্যতিক্রমের এই শ্রদ্ধার্ঘ্যে কোনও ছেদ পড়েনি; বরং জয়ন্ত হাজরিকার স্মৃতিকে আরও বিস্তৃত সাংস্কৃতিক পরিসরে ধারণ করে এই সম্মাননা হয়ে উঠছে তাঁর শিল্পীসত্তার প্রতি এক নিরন্তর শ্রদ্ধার প্রতীক। সময়ের সঙ্গে শিল্পীর উপস্থিতি বদলে যেতে পারে, কিন্তু সত্যিকারের সৃষ্টির প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা কখনও পুরোনো হয় না-জয়ন্ত হাজরিকার অমর সুরের মতোই সেই শ্রদ্ধাও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহমান।

‘রানাদা’ আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তাঁর সুরের মধ্যে তিনি এখনও ফিরে আসেন। কোনো পরিচিত সুরের বাঁকে, কোনো পুরোনো গানের আবেগে, কোনো তরুণ শিল্পীর নতুন পরীক্ষায় কিংবা কোনো নিঃশব্দ শ্রোতার স্মৃতিতে। স্বল্প জীবনে তিনি হয়তো অনেক কিছু অসমাপ্ত রেখে গেছেন। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া সুরই যেন সেই অসমাপ্ত গল্পের শেষ পৃষ্ঠা হয়ে আজও কথা বলে।

জয়ন্ত হাজরিকা তাই শুধু অতীতের একজন শিল্পী নন। তিনি অসমীয়া সংগীতের এমন এক সুর, যার প্রতিধ্বনি সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যায় না-বরং আরও দূরে ছড়িয়ে পড়ে।

আর সেই কারণেই, রানাদার গান শেষ হয় না।

তিনি সুরের ভেতরেই বেঁচে থাকেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *